বিএডিসির সেই নুরুল ইসলাম-প্রকৌশলী নাকি দুর্নীতির আড়তদার! বেপরোয়া রাজত্ব থামবে কবে?

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ০৩ নভেম্বর, ২০২৬ ১৫:৫১

বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের (বিএডিসি) চট্টগ্রাম অঞ্চলের তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও সেচ উন্নয়ন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক মো. নুরুল ইসলামের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ বাণিজ্য, টেন্ডার সিন্ডিকেট এবং নামে-বেনামে বিপুল অবৈধ সম্পদ অর্জনের চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে।

সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের নামে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ ও নানা অনিয়মের অভিযোগে জর্জরিত এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে একাধিক দপ্তরে বিভাগীয় তদন্ত চলমান থাকলেও তাঁর দাপট কমেনি বললেই চলে।

সর্বশেষ একটি চাঁদাবাজি ও প্রাণনাশের হুমকির মামলা এবং এর নেপথ্যে ৫০ লাখ টাকা লেনদেনের অভিযোগ গোটা সংস্থাকে এক অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে ফেলে দিয়েছে।

৫ কোটির কাজ ও ৫০ লাখ টাকার লেনদেন বিতর্ক

জানা গেছে, গত ৬ জানুয়ারি নগরীর চান্দগাঁও থানায় চট্টগ্রামের বিশিষ্ট আবাসন ব্যবসায়ী ও ঠিকাদার মোহাম্মদ আলমগীর, তাঁর সহযোগী মো. মনির হোসেন এবং অজ্ঞাতনামা আরও ৬-৭ জনের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করেন বিএডিসির সহকারী প্রকৌশলী তমাল দাস।

এজাহারে অভিযোগ করা হয়, গত ৪ জানুয়ারি বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের (বিএডিসি) চট্টগ্রাম অঞ্চলের অফিসে প্রবেশ করে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. নুরুল ইসলামকে হত্যার উদ্দেশ্যে ভয়ভীতি দেখান ওই ঠিকাদাররা।

তবে এই মামলার নেপথ্য কাহিনী ভিন্ন মোড় নিয়েছে। এজাহারে ঘটনাস্থল পাঁচলাইশ থানাধীন উল্লেখ করা হলেও মামলা দায়ের করা হয়েছে চান্দগাঁও থানায়। অপরাধ সংঘটিত হওয়ার নির্দিষ্ট এলাকার থানা বাদ দিয়ে অন্য থানায় মামলা করার এই প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও এখতিয়ার নিয়ে তীব্র প্রশ্ন উঠেছে।

মামলায় অভিযুক্ত ঠিকাদার মোহাম্মদ আলমগীরের দাবি, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে প্রায় পাঁচ কোটি টাকার উন্নয়নকাজের ঠিকাদারি কার্যাদেশ পাওয়ার প্রত্যাশায় তিনি তৎকালীন প্রকল্প পরিচালক মো. নুরুল ইসলামকে তিন কিস্তিতে মোট ৫০ লাখ টাকা প্রদান করেন।

তাঁর দেওয়া তথ্যমতে, প্রথম কিস্তিতে একজন ঠিকাদারের মাধ্যমে পাঁচ লাখ টাকা, পরবর্তী সময়ে সরাসরি ৩৫ লাখ টাকা এবং সর্বশেষ আরও ১০ লাখ টাকা প্রদান করা হয়। টাকা প্রদানের সময় দুজন ঠিকাদার উপস্থিত ছিলেন বলে জানান তিনি।

আলমগীরের অভিযোগ, কথিত অর্থ প্রদানের পরও নির্ধারিত সময়ে কোনো কার্যাদেশ না পাওয়ায় তিনি একাধিকবার সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীর কাছে বিষয়টি জানতে চান। এ নিয়ে অসন্তোষ ও বিরোধের সৃষ্টি হয়। দীর্ঘ দিনেও কার্যাদেশ না পেয়ে তিনি প্রতিবাদ করায় তাঁকে ফাঁসানোর উদ্দেশ্যে এই মিথ্যা মামলা সাজানো হয়।

এদিকে মামলার বাদী সহকারী প্রকৌশলী তমাল দাস ব্যক্তিগত আলাপে স্বীকার করেছেন যে, নিজ ইচ্ছায় নয়, বরং তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী নুরুল ইসলামের প্রত্যক্ষ চাপে তিনি ওই মামলা দায়ের করতে বাধ্য হয়েছেন।

গণমাধ্যমকে মুঠোফোনে তিনি দাবি করেন, এ ধরনের মামলা দায়ের করার বিষয়ে তাঁর ব্যক্তিগত আগ্রহ ছিল না, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. নুরুল ইসলামের চাপের মুখেই তিনি মামলাটি করেছেন।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে মামলার স্থান নির্বাচন নিয়ে। এজাহারে ঘটনার স্থান পাঁচলাইশ থানাধীন বিএডিসি কার্যালয় উল্লেখ করা হলেও মামলা রেকর্ড করা হয় চান্দগাঁও থানায়।

অপরাধ সংঘটিত হওয়ার নির্দিষ্ট এলাকার থানা বাদ দিয়ে অন্য থানায় মামলা করার এই প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও এখতিয়ার নিয়ে তীব্র প্রশ্ন উঠেছে।

মামলার নেপথ্যের আর্থিক অভিযোগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধানী সূত্র হিসেবে সামনে এসেছে চট্টগ্রাম শহরের দুটি ব্যাংক শাখা।

অভিযোগ অনুযায়ী, তৎকালীন প্রকল্প পরিচালক মো. নুরুল ইসলাম তাঁর দুই থেকে তিনজন ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের নামে থাকা ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করে কথিত অর্থ লেনদেন ও জমার ব্যবস্থা করতেন। অভিযোগে চট্টগ্রামের এনসিসি ব্যাংকের কামাল বাজার শাখা এবং ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের মুরাদপুর শাখার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

এদিকে মামলার আসামি মোহাম্মদ আলমগীর আদালত থেকে জামিন পাওয়ার পর বাদীপক্ষের সঙ্গে তাঁর বিষয়টি সমঝোতার মাধ্যমে নিষ্পত্তির চেষ্টা চলছে বলেও তথ্য পাওয়া গেছে।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা চান্দগাঁও থানার উপপরিদর্শক মোহাম্মদ ফয়সলের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি গণমাধ্যমকে জানান, সরকারের প্রচলিত বিধিবিধান ও আইন অনুসরণ করে নিরপেক্ষভাবে মামলাটি তদন্ত করা হচ্ছে এবং তদন্তের ফলাফল নির্ধারিত সময়ে আদালতে দাখিল করা হবে।

অব্যাহতির পরও তদবির ও প্রকল্পজুড়ে অনিয়মের জাল

গত ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে স্মারক নম্বর ১২.০০.০০০০.০৮৩.০১১.০০১৯.২৬.২৪৬-এর মাধ্যমে বিএডিসির চট্টগ্রাম-কক্সবাজার সেচ উন্নয়ন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক নুরুল ইসলামকে পদ থেকে অব্যাহতি দিয়ে দায়িত্ব হস্তান্তরের নির্দেশ দেওয়া হয়।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মো. মনিরুজ্জামানের স্বাক্ষরিত ওই আদেশে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হলেও তিনি তা আমলে নেননি। ২২ সেপ্টেম্বর জারি করা বিএডিসির অন্য এক আদেশে নুরুল ইসলামকে ২৪ সেপ্টেম্বরের মধ্যে মো. সাহেদের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তরের নির্দেশ দেওয়া হয়।

বিএডিসির চট্টগ্রাম অফিস সূত্রে জানা যায়, ২৪ সেপ্টেম্বর আদেশটি হাতে পাওয়ার পর বিকেল ৫টার দিকে নুরুল ইসলাম তড়িঘড়ি করে অফিস ত্যাগ করেন। ওই দিন দায়িত্ব গ্রহণের জন্য মো. সাহেদ চট্টগ্রাম অফিসে উপস্থিত হলেও নুরুল ইসলামের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করে সাড়া পাননি। তিনি পদ ও বদলি ঠেকাতে বিভিন্ন মহলে তদবির চালিয়ে যাচ্ছেন বলে জানা গেছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলায় ভূ-উপরিস্থ পানির মাধ্যমে সেচ উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় গত ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রায় দুই শতাধিক গ্রুপের কাজ নিয়মবহির্ভূতভাবে বিলবণ্টন করা হয়েছে। মাঠপর্যায়ে কাজের কোনো বাস্তব অস্তিত্ব না থাকলেও খাতা-কলমে কাজ শেষ দেখিয়ে সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।

এছাড়া সহকারী প্রকৌশলী তমাল দাশের বিরুদ্ধেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। চট্টগ্রামের রাউজান, মিরসরাই, হাটহাজারী ও দোহাজারী জোনে সহকারী প্রকৌশলী তমাল দাশের আওতায় প্রায় ৩৫টি গ্রুপের কাজ কোটেশনের মাধ্যমে বিল নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

একাধিক সূত্রের দাবি, তিনি নুরুল ইসলামের ঘনিষ্ঠ হিসেবে কাজ করছেন এবং নিজেও সাব-ঠিকাদারি কাজের সঙ্গে যুক্ত। তার দায়িত্বাধীন এলাকায় কোনো ঠিকাদার কাজ পেলে তাকে বিভিন্নভাবে অর্থ দিতে হয়।

নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানকে একতরফাভাবে কাজ পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন আদায় করা হতো বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় ঠিকাদাররা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ঠিকাদার অভিযোগ করেন, প্রকল্প পরিচালক নুরুল ইসলাম দীর্ঘদিন ধরে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ঠিকাদারি কাজের সঙ্গে জড়িত। এসব অভিযোগের বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগও দেওয়া হয়েছে।

তবে নুরুল ইসলামের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে তিনি বক্তব্য দিলে তা প্রতিবেদনে সংযুক্ত করা হবে।

দুর্নীতির আখড়া,নাকি আলাদিনের চেরাগ!

নুরুল ইসলামের বিরুদ্ধে অতীতেও নানা অনিয়মের প্রমাণ মিলেছে। ২০২১ সালে মুজিবনগর সেচ উন্নয়ন প্রকল্পের দায়িত্বে থাকাকালীন দুর্নীতির দায়ে মাত্র চার মাসের মাথায় তিনি অপসারিত হন।

কাজ দেওয়ার জন্য মোটা অঙ্কের উৎকোচ গ্রহণ ও প্রকল্প পরিচালক নিজেই প্রকল্পে গাড়ি সরবরাহ কাজে জড়িত থাকার অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাকে হবিগঞ্জ অঞ্চলে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়।

তবে সেখানে হবিগঞ্জ অফিস ভবন নির্মাণকাজে ৩৬ খাতে অনিয়ম ধরা পড়ার পরও অদৃশ্য প্রভাবে তিনি রক্ষা পান। সূত্র জানায়, তৎকালীন কৃষিমন্ত্রী ডা. আব্দুর রাজ্জাকের সহায়তায় তিনি সেই যাত্রা রক্ষা পান এবং পরবর্তীতে ৫০ লাখ টাকা ঘুষ দিয়ে চট্টগ্রাম অঞ্চলে বদলি হন।

চট্টগ্রামে আসার পর তৎকালীন রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় বেপরোয়া হয়ে ওঠেন নুরুল ইসলাম। প্রতিটি কাজে ১০ শতাংশ হারে কমিশন নিয়ে ঠিকাদারদের কাজ দিতেন। পাইপ ক্রয়ের টেন্ডারের জন্য নিতেন ১৫ শতাংশ কমিশন এবং বিনা অভিজ্ঞতাসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানকে কাজ দিতেন।

এর মধ্যে চট্টগ্রামের ‘এন. এম. প্লাস্টিক’ কোম্পানিটি এস আলম গ্রুপের মালিকের এক আত্মীয়ের এবং এর সিইও আসাদুজ্জামান মাসুদকে দিয়ে নুরুল ইসলাম তার সমস্ত অনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করতেন।

চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলায় সেচ উন্নয়ন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক নুরুল ইসলাম রাতারাতি শত শত কোটি টাকার মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

সরকারি চাকরির আড়ালে চট্টগ্রাম ও ঢাকায় তাঁর এবং তাঁর আত্মীয়-স্বজনের নামে-বেনামে মিরপুর, উত্তরা, বনানী ও বসুন্ধরায় একাধিক ফ্ল্যাট, প্লট ও এগ্রো ফার্ম গড়ে উঠেছে। আত্মীয়দের নামে ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করে ঠিকাদারদের কাছ থেকে ঘুষের অর্থ গ্রহণের অভিযোগও রয়েছে।

অনুসন্ধান করতে গেলে ভুক্তভোগী একাধিক ঠিকাদার প্রতিবেদককে অভিযোগ করে বলেন, বিএডিসির প্রকল্প পরিচালক নুরুল ইসলামের হাতে এখনও আলাদিনের চেরাগ। আওয়ামী সরকারের আমলে দাপটে এই কর্মকর্তা রাতারাতি বিএনপি হয়ে গেছেন।

সরকার পরিবর্তন হলেও নুরুল ইসলামের দাপট কমেনি। বরং সে প্রকাশ্যে বিএডিসিতে দুর্নীতির রাজ্য গড়ে তুলেছেন। প্রতিষ্ঠানটি কর্মীদের প্রশ্ন, নুরুল ইসলামের ক্ষমতার উৎস্য কি।

অভিযোগ উঠেছে, ঠিকাদারদের কাছ থেকে ঘুষের বদলে ফ্ল্যাটও লিখে নেন তিনি। এছাড়াও ঠিকাদাররা বিলের টাকা নিতে গেলে সেখানেও ১০ পার্সেন্ট কমিশন নিতেন নুরুল ইসলাম। কমিশনের টাকা দিতে না চাইলে বিল আটকে দিতেন তিনি।

২৫০ কাজের দরপত্র, গোপন কোড ফাঁস ও ঘনিষ্ঠদের ‘লাইসেন্সহীন’ কাজ বণ্টন

প্রকল্পজুড়ে সিন্ডিকেটপ্রথা বজায় রাখতে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলের ভূ-উপরিস্থ সেচ প্রকল্পে একসঙ্গে প্রায় ২৫০টি কাজের নজিরবিহীন দরপত্র আহ্বান করা হয়, যাকে কেন্দ্র করে বিএডিসির অভ্যন্তরীণ কর্মকর্তা ও নিবন্ধিত ঠিকাদারদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।

নিয়ম অনুযায়ী ধাপে ধাপে দরপত্র ডাকার কথা থাকলেও, নুরুল ইসলাম তাঁর পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দিতেই তড়িঘড়ি করে এই বিপুলসংখ্যক টেন্ডার একসঙ্গে আহ্বান করেন।

অভিযোগে বলা হয়, নির্দিষ্ট সিন্ডিকেটের বাইরে যাতে সাধারণ ঠিকাদাররা অংশগ্রহণ করতে না পারেন, সে জন্য তিনি টেন্ডারের গোপন ‘অফার কোড’ আগেই নিজ বলয়ের ঠিকাদারদের কাছে ফাঁস করে দিতেন।

রাজনৈতিক প্রভাব ও অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার উদ্দেশ্যে যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতাহীন প্রতিষ্ঠানকেও জাল সনদপত্রের ওপর ভিত্তি করে ১৫ শতাংশ কমিশন বা উৎকোচের বিনিময়ে কার্যাদেশ দেওয়া হতো।

এর মধ্যে গোপালগঞ্জ যুবলীগ নেতার মালিকানাধীন ‘জি. কে. পলিমার’ এবং সাবেক ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস সংশ্লিষ্ট ‘এ. ওয়ান প্লাস্টিক’-কে কাজ পাইয়ে দিতে ক্ষমতার অপব্যবহার করা হয়। এসব সরবরাহ করা নিম্নমানের পাইপ মাঠপর্যায়ে ব্যবহারের কিছুদিন পরেই ফেটে নষ্ট হয়ে যায়।

এ ছাড়া, শ্যালক বিপ্লবের মালিকানাধীন ‘এম.আর.এস বিপ্লব’ নামক প্রতিষ্ঠানে প্রকৌশলী নুরুল ইসলামের নিজস্ব বিনিয়োগ রয়েছে এবং ওই প্রতিষ্ঠানকেও নিয়মবহির্ভূতভাবে প্রকল্পের একাধিক কাজ পাইয়ে দেওয়া হয়।

প্রতিবাদ করায় গর্ভবতী প্রকৌশলীকে বদলি ও তদন্ত ঢাকা-চাপা

বিএডিসির ভেতরে নুরুলের অপকর্মের বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুললে তাকে প্রশাসনিক নির্যাতনের শিকার হতে হতো। বিএডিসির তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী (এক্সএন) ফাতেমা আক্তার জেনি এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে সোচ্চার হলে, গর্ভবতী হওয়া সত্ত্বেও তাঁকেও অন্যায্যভাবে ঢাকায় বদলি করা হয়।

ঘটনাটি সে সময় গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে তীব্র সমালোচনার মুখে বিএডিসি একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। তবে দীর্ঘ সময় পার হলেও সেই তদন্ত প্রতিবেদন ও সুপারিশ আলোর মুখ দেখেনি।

অন্যদিকে, বিএডিসির শীর্ষ পর্যায় ও চেয়ারম্যান দপ্তরের স্বজনদের কাজ পাইয়ে দিয়ে সব ধরনের তদন্ত ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ থেকে নুরুল নিজেকে সুরক্ষা দিতেন বলেও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগের বিষয়ে অফিসে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, নূরুল ইসলাম স্যার অধিকাংশ সময় অফিসেই উপস্থিত থাকেন না।

তবে অপর এক গণমাধ্যমকে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. নুরুল ইসলাম তাঁর বিরুদ্ধে উত্থাপিত সমস্ত অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করেছেন।

বিএডিসির প্রধান প্রকৌশলী বদিউল আলম সরকার গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, নুরুল ইসলামের বিরুদ্ধে দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট প্রমাণ রয়েছে এবং তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত চলছে।

একই সঙ্গে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)-এর মাধ্যমে তাঁর অবৈধ সম্পদ ও ব্যাংক হিসাবের লেনদেন পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তদন্ত করার জোর দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

সরকারি প্রকল্পের নামে এই নজিরবিহীন হরিলুট এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের নেপথ্যে থাকা প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটিত হবে কি না, এখন সেটাই দেখার বিষয়।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি