দক্ষিণ চট্টগ্রামের পাহাড় ও নদীবেষ্টিত দুর্গম জনপদ চন্দনাইশের ধোপাছড়ি ইউনিয়ন যেন অপরাধের এক মুক্তাঞ্চল। পুলিশ তদন্তকেন্দ্র ও বন বিভাগের বিট অফিস থাকলেও তিন পাশে পাহাড় আর এক পাশে নদীঘেরা এই এলাকায় অবৈধ বালু উত্তোলন, পাহাড়ের মাটি কাটা, গাছ-বাঁশ পাচার এবং চাঁদাবাজি থামার কোনো লক্ষণ নেই।
দীর্ঘদিনের এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা অসহায়ত্ব প্রকাশ করলেও প্রশাসনের একেক দপ্তরের একেক রকম দায়সারা মন্তব্য পরিস্থিতিকে আরও প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রভাব এবং স্থানীয় ও অস্থানীয় অপরাধীদের নিয়ে তৈরি হয়েছে একাধিক শক্তিশালী সিন্ডিকেট। এখানে ব্যক্তির মুখ বদলালেও অপরাধের ধরন ও স্থান অপরিবর্তিত থাকে।
গত ২ নভেম্বর ধোপাছড়ি ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডে সাবেক ইউপি সদস্য রফিকের বাড়ির পাশে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের তথ্য সংগ্রহ করতে গেলে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন বর্তমান ইউপি সদস্য মোজাম্মেল হক।
তাঁর সাফ কথা, এই দুর্গম জনপদ দেখে মনে হয় চন্দনাইশ প্রশাসনের কোনো নিয়ন্ত্রণই এখানে নেই।
মোজাম্মেল মেম্বার জানান, তিনি নিজে কোনো অবৈধ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত নন, অথচ তাঁর চোখের সামনেই এসব অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে।
স্থানীয় সংসদ সদস্য, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং পুলিশ তদন্তকেন্দ্রকে বারবার জানিয়েও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা মিলছে না বলে অভিযোগ মোজাম্মেল মেম্বারের।
উল্টো জনপ্রতিনিধি হিসেবে অপরাধের প্রতিবাদ করতে গিয়ে তাঁকে শত্রু বানাতে হচ্ছে। জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়েও প্রশাসনের সহযোগিতা না পাওয়ায় অনেক সময় বাধ্য হয়েই তাঁদের নীরব থাকতে হয় বলে আক্ষেপ করেন তিনি।
তিনি প্রশ্ন রাখেন, এলাকায় মাদক, মাটি, বালু, বাঁশ ও গাছকেন্দ্রিক অবৈধ কারবারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হলে জনপ্রতিনিধিদেরই কেন অপরাধীদের ধরে প্রশাসনের হাতে তুলে দিতে হবে?
এসব অপরাধ দমন কি শুধু জনপ্রতিনিধিদেরই দায়িত্ব, নাকি প্রশাসনেরও সুনির্দিষ্ট ভূমিকা রয়েছে?
জানা গেছে, ধোপাছড়িতে প্রচুর সরকারি খাসজমি ও বনভূমি রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব জমি দখল করে চলছে প্রভাবশালী মহলের চাঁদাবাজি।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, রাতভর ড্রেজার বসিয়ে বালু উত্তোলন চললেও প্রশাসনের সামান্য নজরদারি থাকলেই তা বন্ধ হওয়া সম্ভব ছিল। এ সময় তিনি আমিন ও মোক্তার নামের দুই ব্যক্তির বিরুদ্ধে সরাসরি বালু উত্তোলনের অভিযোগ তোলেন।
আরেক ইউপি সদস্য খোকা মেম্বারও একই সুর গেয়ে জানান, দোহাজারীর মোক্তার নামের এক ব্যক্তি সেখানে বালু উত্তোলন করছেন এবং প্রশাসনের নীরব সহযোগিতা ছাড়া এমন কর্মকাণ্ড চালানো অসম্ভব।
অভিযোগের বিষয়ে দোহাজারীর মোক্তারের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রথমে একে ‘ভুল নম্বর’ দাবি করে বালু ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেন।
তবে পরবর্তীতে তাঁকে চেনেন কি না-এমন প্রশ্ন করা মাত্রই তিনি ফোনের সংযোগ কেটে দেন, ফলে তাঁর বিস্তারিত বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
এদিকে ধোপাছড়ি পুলিশ তদন্তকেন্দ্রের ইনচার্জ (আইসি) কাঞ্চন কুমার সিংহ সম্পূর্ণ দায় এড়িয়ে জানান, বিষয়টি আমাদের কেউ জানায়নি। এটি সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর দায়িত্ব।
অন্যদিকে চন্দনাইশের সহকারী কমিশনার (ভূমি) ঝন্টু বিকাশ চাকমা গণমাধ্যমকে বলেছেন, নিউজ করে দিলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রশাসনের এমন পাল্টাপাল্টি ও দায়সারা বক্তব্যে ক্ষুব্ধ স্থানীয়রা।
স্থানীয়দের মনে এখন একটাই প্রশ্ন-সংসদ সদস্যের পরিবারের নাম ব্যবহার করে কেউ অবৈধ বালু উত্তোলন করলে তার দায়ভার কার ওপর বর্তাবে? এতে কি সংসদ সদস্য ও তাঁর পরিবারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে না?
ধোপাছড়িবাসী এখন জোরালো দাবি তুলেছেন, সংসদ সদস্যের প্রতি বিনীত আহ্বান জানিয়ে তাঁরা চান-বালু উত্তোলনের অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা হোক।
একই সঙ্গে অবৈধ বালু উত্তোলন, বনভূমি দখল, পাহাড় কাটা ও চাঁদাবাজি বন্ধে প্রশাসনের দৃশ্যমান ও কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি


