চট্টগ্রামে বসছে এআই ট্রাফিক-৩৮ ফুটওভারব্রিজ নির্মাণের উদ্যোগ, ২১টির কাজ চলছে

সামান্য সচেতনতা আর সতর্কতাই বাঁচাবে বহু জীবন

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ০২ নভেম্বর, ২০২৬ ১৬:১০

নগরের বুক চিরে চলে গেছে ব্যস্ত সড়ক। প্রতিদিন হাজারো পথচারী ও যানবাহনের চলাচলে চট্টগ্রাম এক সচল কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ নগরী। বিশেষ করে মইজ্জ্যারটেকের মতো এলাকাগুলোতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি দৈনন্দিন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) প্রশাসক ডা. শাহাদাত হোসেন একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর কিন্তু পরম সত্য তুলে ধরেছেন-‘সামান্য সচেতনতা আর সতর্কতাই বাঁচাবে বহু জীবন।’

একটি নিরাপদ শহর কেবল আধুনিক অবকাঠামোর ওপর গড়ে ওঠে না, গড়ে ওঠে নাগরিকদের দায়িত্বশীল অভ্যাসের ওপর। সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চসিকের অবকাঠামোগত নানা উদ্যোগের পাশাপাশি সবচেয়ে গুরুত্ব পাচ্ছে নাগরিক সচেতনতা ও নৈতিক আচরণ।

সোমবার (২ নভেম্বর) নগরের আইয়ুব বিবি সিটি করপোরেশন স্কুল অ্যান্ড কলেজ অডিটোরিয়ামে ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ চট্টগ্রাম মহানগর কমিটি আয়োজিত শিক্ষার্থীদের রচনা প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণ ও সমাবেশ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডা. শাহাদাত হোসেন এসব কথা বলেন।

ডায়মন্ড সিমেন্ট লিমিটেডের চেয়ারম্যান আজিম আলীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে চসিকের প্রধান শিক্ষা কর্মকর্তা ড. কিসিঞ্জার চাকমা, কর্ণফুলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রিদুয়ানুল ইসলাম, কর্ণফুলী থানার ওসি নুর মোহাম্মদ, আইয়ুব বিবি সিটি করপোরেশন স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ মোহাম্মদ মাহফুজুল রহমান এবং ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ চট্টগ্রাম মহানগর কমিটির সাধারণ সম্পাদক শফিক আহমেদ সাজীব উপস্থিত ছিলেন।

অবকাঠামোর আধুনিকায়ন: এআই ট্রাফিক ও ফুটওভারব্রিজ

অনুষ্ঠানে চসিক প্রশাসকের বক্তব্য সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রামকে একটি নিরাপদ ও প্রযুক্তিনির্ভর শহর হিসেবে গড়ে তুলতে চসিক এবং চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) বেশ কিছু সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে-

এআইভিত্তিক ট্রাফিক ব্যবস্থা: নগরের সড়ক ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফেরাতে ২৮টি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) চালিত ট্রাফিক ব্যবস্থা প্রবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগামী এক মাসের মধ্যেই পরীক্ষামূলকভাবে দুটি পয়েন্টে এই আধুনিক প্রযুক্তি চালু হতে যাচ্ছে।

ফুটওভারব্রিজ ও পথচারী নিরাপত্তা: পথচারীদের নিরাপদে রাস্তা পারাপারের জন্য ৩৮টি ফুটওভারব্রিজ নির্মাণের উদ্যোগ চূড়ান্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ইতোমধ্যে ২১টি ব্রিজের নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়েছে এবং বাকিগুলোর বাস্তবায়ন কার্যক্রম চলমান।

জেব্রা ক্রসিং ও ওভারপাস: গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে স্পষ্ট জেব্রা ক্রসিং চিহ্ন আঁকা এবং রেলক্রসিং এলাকার জটলা ও দুর্ঘটনা এড়াতে বিশেষ ওভারপাস নির্মাণের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পর্যায়ে রয়েছে।

চট্টগ্রামের সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থার আধুনিকায়নে চসিকের পরিকল্পনার কথা জানান প্রশাসক।

তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের নিরাপদ চলাচলে ফুটওভারব্রিজ ও জেব্রা ক্রসিং অত্যন্ত জরুরি। সিএমপির সমন্বয়ে নগরের প্রায় ২৮টি পয়েন্টে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যার দুটি এক মাসের মধ্যেই চালু হবে।

এছাড়া ৩৮টি ফুটওভারব্রিজের মধ্যে ২১টির কাজ শেষ হয়েছে ও বাকিগুলোর কাজ চলছে। রেলক্রসিং এলাকায় দুর্ঘটনা কমাতে ওভারপাস নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে চসিকের।

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের মইজ্জ্যারটেক এলাকার দুর্ঘটনাপ্রবণ অবস্থানের কথা উল্লেখ করে চসিক প্রশাসক শিক্ষার্থীদের সতর্ক করে বলেন, রাস্তা পারাপারের সময় ডান-বাম ভালোভাবে দেখে এবং যানবাহনের গতিবিধি বুঝে তবেই এগোতে হবে। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ফুটপাত পথচারীর জন্য, তা দখল হলে প্রতিবাদ করতে হবে এবং রাস্তায় থাকা বিপজ্জনক বস্তু সরিয়ে ফেলাও নাগরিক কর্তব্যের অংশ।

শিক্ষার্থীদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানিয়ে ডা. শাহাদাত বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে শিক্ষার্থীরা রাজপথে নেমে অন্যায়ের বিরুদ্ধে যে সাহস ও দায়িত্ববোধ দেখিয়েছিল, তা সামাজিক ক্ষেত্রেও কাজে লাগাতে হবে। ইভটিজিং, কিশোর গ্যাং, চাঁদাবাজি বা সমাজবিরোধী কর্মকাণ্ড দেখলে আইনসম্মত উপায়ে প্রতিবাদ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহযোগিতা করতে হবে।

নগরের পরিচ্ছন্নতা ও ডেঙ্গু প্রতিরোধে সজাগ থাকার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, ডাবের খোসায় জমে থাকা পানি থেকে এডিস মশার বংশবৃদ্ধি ঘটতে পারে, আবার কলার খোসায় পিছলে বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। নগরকে ক্লিন, গ্রিন, সেফ ও স্মার্ট সিটি হিসেবে গড়ে তুলতে যত্রতত্র ময়লা ফেলা বন্ধের বিকল্প নেই।

সড়কে অসতর্কতার বিষয়টি তুলে ধরে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন, অনেকে মোবাইল ফোনে কথা বলতে বলতে বা দলবেঁধে গল্প করতে করতে রাস্তা পার হয়, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। একই সঙ্গে চালকদেরও পূর্ণ দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেওয়ার তাগিদ দেন তিনি।

পাঠ্যবইয়ের গণ্ডি পেরিয়ে মানবিক ও নৈতিক শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ হওয়ার পরামর্শ দিয়ে তিনি যোগ করেন, বিবেক-বুদ্ধি প্রয়োগ করে দায়িত্বশীল আচরণ করলেই শিক্ষার্থীরা আলোকিত মানুষ হিসেবে গড়ে উঠবে।

অনুষ্ঠান শেষে রচনা প্রতিযোগিতার বিজয়ী শিক্ষার্থীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়। বক্তারা নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে শিক্ষক, অভিভাবক, চালকসহ সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি