বিশ্বাস আর ভালোবাসার সওদা একসময় যেখানে হয়েছিল, আজ সেখানেই নেমে এসেছে অন্ধ প্রতিহিংসার কালো ছায়া।
চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার ধোপাছড়ি ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের মাটি যেন আজ এক নির্মম নাটকের সাক্ষী।
দাম্পত্য জীবনের একান্ত গোপন মুহূর্তগুলো যখন প্রতিশোধের অস্ত্র হয়ে ওঠে, তখন একজন নারীর জীবন কীভাবে তছনছ হয়ে যেতে পারে, তার এক বাস্তব চিত্র ফুটিয়ে তুলেছে শাহরিয়া মিম কলির এই দুঃসহ পরিণতি।
ঘটনার মূল চরিত্র তাঁর সাবেক স্বামী, প্রবাসী আব্দুস সাত্তার। প্রায় ১৫ মাস আগের কথা। একই এলাকার বাসিন্দা জাহেদুল হাসান আসিফকে সুদিনের আশায় প্রবাসে নিয়ে গিয়েছিলেন সাত্তার।
কিন্তু প্রবাসের মাটিতে পা রাখার পর প্রলোভনের সেই বেলুন ফুটতে সময় লাগেনি। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী চাকরি বা নির্দিষ্ট বেতন-কোনোটিই পাননি আসিফ। ফলশ্রুতিতে শুরু হয় দুজনের মধ্যকার বিরোধ।
আর এই বিরোধের সূত্র ধরেই সাত্তারের মাথায় খেলে যায় এক ঠান্ডা মাথার কুটিল বুদ্ধি। আসিফকে চিরতরে ফাঁসানোর জন্য তিনি বেছে নেন নিজের ঘরের মানুষ, নিজেরই সাবেক স্ত্রী মিম কলিকে।
পরিকল্পনা ছিল, মিমের মুখ থেকে আসিফের সঙ্গে পরকীয়ার মিথ্যা স্বীকারোক্তি আদায় করা।
শুরুতে আত্মসম্মানবোধে আঘাত লাগায় মিম কলি এই নোংরা প্রস্তাবে পরিষ্কার অস্বীকৃতি জানান। কিন্তু ক্ষমতার মোহে অন্ধ সাত্তার তখন ব্যবহার করেন ধর্মীয় বিশ্বাসের সবচেয়ে পবিত্র অনুভূতিকে।
পবিত্র কাবা শরিফের নামে মিথ্যা শপথ করে মিমকে আশ্বস্ত করা হয় যে, এটি নিছক একটি কৌশল, এতে তাঁর ব্যক্তিগত বা সামাজিক জীবনে বিন্দুমাত্র আঁচড় লাগবে না বা কোনো সমস্যা হবে না।
ধর্মের পবিত্রতার চাদরে মোড়ানো সেই আশ্বাসের ফাঁদে পা দেন মিম কলি। বিশ্বাস করেন প্রবাসীর সেই মিথ্যা শপথ।
কিন্তু ঘুণাক্ষরেও তিনি টের পাননি যে এই স্বীকারোক্তিই তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় কাল হয়ে দাঁড়াবে। কাঙ্ক্ষিত সেই স্বীকারোক্তি আদায়ের পরপরই শুরু হয় আসল নাটক।
পরকীয়ার মনগড়া অভিযোগ তুলে মুহূর্তেই মিম কলিকে তালাক দেন আব্দুস সাত্তার। আর আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই তালাক কার্যকর হওয়ার মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে সাত্তার নতুন করে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।
স্পষ্ট হয়ে যায়-পুরো ঘটনাটি ছিল আসিফকে ফাঁসানোর পাশাপাশি সাবেক স্ত্রীকে জীবন থেকে ছুড়ে ফেলে দেওয়ার এক সুদূরপ্রসারী প্রতিশোধের ছক।
তবে এখানেই শেষ নয়। বিচ্ছেদের পরই শুরু হয় আসল ব্ল্যাকমেইল। দাম্পত্য জীবনের একান্ত গোপন ও অন্তরঙ্গ কিছু মুহূর্তের ছবি এবং ভিডিও সংরক্ষিত ছিল প্রবাসী সাত্তারের কাছে।
সেই ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকেই প্রতিহিংসার আগুন উসকে দিতে একে একে সেই ছবি ও ভিডিওগুলো ছড়িয়ে দেওয়া হয় বিভিন্ন ব্যক্তির মুঠোফোনে ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।
নিজের পবিত্রতাকে পুঁজি করে সাজানো নাটক এবং পরবর্তী সময়ে ব্যক্তিগত মুহূর্তকে পেমেন্ট হিসেবে ব্যবহার করে ব্ল্যাকমেইলের শিকার হয়ে অবশেষে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন শাহরিয়া মিম কলি।
লোকলজ্জার ভয়কে জয় করে তিনি সাবেক স্বামী আব্দুস সাত্তারের বিরুদ্ধে পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা দায়ের করেছেন।
একটি সাজানো মিথ্যাচারের ফাঁদ, ধর্মীয় বিশ্বাসের নির্মম অপব্যবহার এবং সাইবার অপরাধের মাধ্যমে এক নারীর জীবন ধ্বংসের এই লোমহর্ষক ঘটনায় এখন পুরো এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
ভুক্তভোগী মিম কলির একটাই আকুতি-ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত হোক, নেপথ্যের কুশীলবরা চিহ্নিত হোক এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মাধ্যমে যেন আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়।


