চট্টগ্রামের কর্ণফুলী থানা এলাকা দিয়ে চলাচলকারী একটি বাস বাইরে থেকে দেখতে একেবারেই সাধারণ। কিন্তু গোয়েন্দা নজরদারিতে ধরা পড়ে ভেতরের ভিন্ন চিত্র।
বাসটিকে ব্যবহার করা হচ্ছিল মাদক পরিবহনের আড়াল হিসেবে। গোয়েন্দা পুলিশের বিশেষ অভিযানে বাসটি থেকে উদ্ধার হয় ৮ কেজি হেরোইন ও ১৪ হাজার পিস ইয়াবা। আটক করা হয় তিনজনকে।
মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) দিবাগত রাত ৩টার দিকে উপজেলার শিকলবাহা ক্রসিং পেট্রোল পাম্পের সামনে থেকে ৮ কোটি টাকার হেরোইন-ইয়াবাসহ তাদের আটক করা হয়।
আটকৃতরা হলেন-মো. আলী হোসাইন প্রকাশ আলী হোসেন (৪২), মো. আজিম (৪০) এবং মুহাম্মদ রাশেল (৪৯)। জব্দ করা হয় মাদক পরিবহনে ব্যবহৃত হানিফ পরিবহনের ঢাকা মেট্রো -ব -১১-২৩৮০ বাসটি।
এই অভিযানের মাধ্যমে নতুন করে সামনে এসেছে নগরজুড়ে সক্রিয় মাদক নেটওয়ার্কের একটি অংশ—যার বিস্তার নিয়ে এখন অনুসন্ধান শুরু করেছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ–এর গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি-পশ্চিম)।
মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) পরিচালিত এ অভিযানের তথ্য নিশ্চিত করেন সিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপপরিদর্শক (এসআই) মো. ইমরান হোসেন।
কীভাবে ধরা পড়ল চালান
গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়,হানিফ পরিবহনের যাত্রীবাহী বাস কক্সবাজার থেকে বিপুল হিরোইন ও ইয়াবা নিয়ে চট্টগ্রামের দিকে আসছে। এমন তথ্যের ভিত্তিতে কর্ণফুলীর ক্রসিং এলাকায় সন্দেহ জনক বাসটি দেখে থামার সংকেত দিলেও না থামায় ধাওয়া করে বাসটি আটক করা হয়।
পরে বাসটি তল্লাশি চালিয়ে বাসটির পেছনে লোহার তৈরি বাক্সে লুকানো হলুদ রঙের ৮টি প্যাকেটে মোড়ানো প্রতিটি প্যাকেটে ১ কেজি করে মোট ৮ কেজি হেরোইন যার আনুমানিক মূল্য ৮ কোটি টাকা।
এবং ৭০টি নীল রঙের জিপারের ভেতরে লুকানো প্রতিটি প্যাকেটে ২০০ পিস করে মোট ১৪ হাজার ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। যার আনুমানিক মূল্য ৩৫ লাখ টাকা।
পুলিশ আরও জানায়, আটকৃতরা জব্দকৃত ওই বাসের চালক, সুপারভাইজার এবং হেলপার। এছাড়াও তারা পেশাদার মাদক ব্যবসায়ী।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আসামিরা মাদকের বড় চালানটি কক্সবাজারের অজ্ঞাত ২-৩ জনের কাছ থেকে নিয়ে বিশেষ কায়দায় লুকিয়ে ঢাকায় অজ্ঞাত ২ জনের কাছে বিক্রয়ের উদ্দেশ্য নিয়ে যাচ্ছিল স্বীকার করে।
তবে এই মাদক পরিবহন চক্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল বলে ধারণা করছেন পুলিশ।
রুট হিসেবে কর্ণফুলী: কেন গুরুত্বপূর্ণ
চট্টগ্রামের কর্ণফুলী এলাকাটি দীর্ঘদিন ধরেই মাদক পরিবহনের একটি কৌশলগত রুট হিসেবে পরিচিত।
বন্দর, শিল্পাঞ্চল এবং মহাসড়কের সংযোগস্থল হওয়ায় এই এলাকা ব্যবহার করে সহজেই মাদক দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যাত্রীবাহী বাস বা পণ্যবাহী যানবাহন ব্যবহার করলে সন্দেহ কম হয়, ফলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দেওয়া তুলনামূলক সহজ হয়ে পড়ে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্র জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে এ রুটে মাদক পরিবহনে বাস ব্যবহারের প্রবণতা বেড়েছে। চালক, সহকারী বা তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে গোপনে বিশেষ কুঠুরি তৈরি করে এসব মাদক বহন করা হয়।
সাম্প্রতিক কয়েকটি অভিযানে একই ধরনের কৌশল ধরা পড়েছে, যা ইঙ্গিত দিচ্ছে—এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং একটি সুসংগঠিত চক্রের অংশ।
চক্র কত বড়?
উদ্ধার হওয়া মাদকের পরিমাণই ইঙ্গিত দিচ্ছে—এর পেছনে রয়েছে শক্তিশালী সরবরাহ ও বিতরণ নেটওয়ার্ক। ৮ কেজি হেরোইন এবং ১৪ হাজার ইয়াবা সাধারণত খুচরা পর্যায়ের নয়, বরং পাইকারি পর্যায়ের চালান হিসেবে বিবেচিত।
তদন্তসংশ্লিষ্টরা ধারণা করছেন, এই চক্রের সঙ্গে আন্তঃজেলা এমনকি সীমান্তঘেঁষা নেটওয়ার্কও যুক্ত থাকতে পারে। এখন খতিয়ে দেখা হচ্ছে—মাদকগুলো কোথা থেকে এসেছে, কারা গ্রহণ করার কথা ছিল, পরিবহনে কারা যুক্ত এবং এই রুট কতদিন ধরে ব্যবহৃত হচ্ছে।
আটক ও তদন্তের অগ্রগতি
কর্ণফুলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শাহীনূর আলম বলেন, এ ঘটনায় থানায় মাদক আইনে মামলা রজু করা হয়েছে। পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন। বড় চক্র শনাক্তে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে বলে জানা গেছে।


