গণপূর্ত অধিদপ্তরে সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজ ঘিরে বছরের পর বছর ধরে সরকারি অর্থ ব্যয়ের আড়ালে গড়ে উঠেছে শক্তিশালী এক সিন্ডিকেট।
রাষ্ট্রের বরাদ্দ যেন জনস্বার্থে নয়, বরং ভাগ-বাটোয়ারার অলিখিত বন্দোবস্তে গিলে খাচ্ছে একদল কর্মকর্তা-ঠিকাদার।
চট্টগ্রাম গণপূর্ত বিভাগ-১ এর বিরুদ্ধে ওঠা সাম্প্রতিক অভিযোগ সেই পুরোনো দুর্নীতির চিত্রকেই আরও নগ্নভাবে সামনে এনেছে।
অভিযোগ রয়েছে, কার্যকর মনিটরিং ও জবাবদিহির অভাবে চট্টগ্রাম গণপূর্ত বিভাগ-১ এখন কার্যত নির্বাহী প্রকৌশলী ও ঠিকাদারদের নিয়ন্ত্রিত একটি দুর্নীতির ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছে।
সরকারি আবাসিক ভবন, হাসপাতাল, আদালত ভবন, অগ্নিনির্বাপন কেন্দ্রসহ বিভিন্ন সরকারি স্থাপনার সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজে চলছে লাগামহীন অনিয়ম।
কাগজে-কলমে কোটি কোটি টাকার কাজ দেখানো হলেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই তার অস্তিত্ব মেলে না।
প্রাপ্ত অভিযোগ ও সরেজমিন তথ্যানুসন্ধানে অনিয়মের একাধিক নমুনা পাওয়া গেছে। তবে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করেছেন চট্টগ্রাম গণপূর্ত বিভাগ-১ এর নির্বাহী প্রকৌশলী মীর রাসেদুল করিম।
তিনি প্রতিবেদকের সঙ্গেও অসৌজন্যমূলক আচরণও করেন। একপর্যায়ে তিনি বলেন, “সংস্কার কাজ ঠিকমতো হচ্ছে কি না, তা আপনাকে কেন বলব? এসব নিয়ে নিউজ করা যাবে না।”
একাধিক সূত্রের দাবি, মীর রাসেদুল করিমের বিরুদ্ধে ভয়াবহ অনিয়ম-দুর্নীতি, কমিশন বাণিজ্য এবং কাজ ভাগাভাগির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। কুমিল্লায় কর্মরত থাকাকালেও তাঁর বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ উঠেছিল।
চট্টগ্রামে যোগদানের পর তিনি প্রভাবশালী ঠিকাদারদের নিয়ে গড়ে তুলেছেন শক্তিশালী বলয়।
অভিযোগ রয়েছে, নির্দিষ্ট কমিশন ছাড়া কোনো ফাইল সই করেন না তিনি। ঠিকাদারদের কাছ থেকে বাধ্যতামূলকভাবে আদায় করা হয় কমিশন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ঠিকাদার বলেন, “সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজের নামে লাখ লাখ টাকার বিল হয়। কিন্তু বাস্তবে সেই কাজ চোখে পড়ে না।
অনেক প্রকল্পে প্রাক্কলিত দর ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়ে বড় ধরনের দুর্নীতি করা হচ্ছে।”
তথ্য অনুসন্ধানে জানা গেছে, সরকারি আবাসিক ভবনের দরজা-জানালা, স্যানিটারি লাইন, বৈদ্যুতিক কাজ, ছাদ মেরামত, পানির ট্যাংক, রং করা, পার্ক ও উদ্যান রক্ষণাবেক্ষণসহ প্রায় সব ধরনের কাজেই রয়েছে অনিয়মের অভিযোগ।
অনেক ক্ষেত্রেই একই ভবনে এক অর্থবছরে দুই থেকে তিনবার সংস্কার কাজ দেখিয়ে বিল তুলে নেওয়া হয়। অথচ নিয়ম অনুযায়ী একবার সংস্কার কাজ হওয়ার পর পরবর্তী বছর একই ভবনে আবার বড় ধরনের সংস্কারের সুযোগ নেই।
চট্টগ্রাম আদালত ভবন, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এলাকা, নাসিরাবাদ আবাসিক এলাকা ও রহমতগঞ্জের বিভিন্ন সরকারি বাংলোতে প্রতিবছর বিপুল অঙ্কের সংস্কার কাজ দেখানো হয়। কোনো কোনো ভবনে সংস্কার ব্যয়ের পরিমাণ কোটি টাকার কাছাকাছি পৌঁছে যায়।
অভিযোগ রয়েছে, এসব কাজ ঘুরেফিরে নির্বাহী প্রকৌশলীর ঘনিষ্ঠ ঠিকাদাররাই পান। কাগজে ভুয়া কাজ দেখিয়ে বিল তুলে নেওয়া হয় সংঘবদ্ধভাবে।
সূত্রগুলো বলছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ঠিকাদারের কাছ থেকে আগাম ৫০ শতাংশ অর্থ নেওয়া হয়।
পরে প্রকল্পের মাত্র ৩০ শতাংশ কাজ করে বাকি অংশ ভাগাভাগি করে নেওয়া হয়। ফলে বাস্তবে সংস্কার কাজের মান যেমন নিম্নমানের, তেমনি অনেক কাজ আদৌ সম্পন্ন হয় না।
সরেজমিন অনুসন্ধানে প্রতিবেদক তিন দিন ধরে কয়েকটি সরকারি বাংলো ও আবাসিক ভবনে ঘুরে অনিয়মের নমুনা দেখেছেন।
এক আবাসিক ভবনের কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “কিছুদিন আগে কয়েকজন এসে দেয়ালে একটু ঘষামাজা করে চলে গেছে। এরপর আর কাউকে দেখিনি। কিন্তু শুনেছি বড় অঙ্কের বিল হয়েছে। আমাদের থাকার ঘরে অনেক সমস্যা থাকলেও মেরামত করা হয়নি।”
আরও অভিযোগ রয়েছে, বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনার আওতায় স্যানিটারি ফিটিংস, রং, হার্ডওয়্যার ও অন্যান্য মালামাল সরবরাহের নামে লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হচ্ছে। অনেক সময় ১০ হাজার টাকার পণ্য কিনে বিল দেখানো হচ্ছে ৩০ হাজার টাকা।
এসব বিষয়ে বক্তব্য নিতে নির্বাহী প্রকৌশলী মীর রাসেদুল করিমের কার্যালয়ে গেলে তিনি উত্তেজিত হয়ে বলেন, “এখন বিল সরাসরি ঠিকাদারের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে যায়।
মিষ্টি খাওয়ার টাকা চাইতে পারি না।” তাঁর পাশেই থাকা অবসরপ্রাপ্ত এক কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “এই সিস্টেম ভালো হয়নি।”সূত্র-এস সময়
গণপূর্তের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “গণপূর্ত বিভাগে অনিয়ম-দুর্নীতি এখন অনেকটা স্বাভাবিক চিত্র হয়ে গেছে।
তবে সরাসরি সাইট ভিজিট করলে কোথায় দুর্নীতি হয়েছে, তা সহজেই বোঝা যায়।”
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী কোনো ভবনে সংস্কার কাজ শেষ হওয়ার পর নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত নতুন করে সরকারি অর্থে বড় ধরনের সংস্কার করার সুযোগ নেই।
কিন্তু বাস্তবে বছরের পর বছর একই ভবনে সংস্কার দেখিয়ে ব্যয় করা হচ্ছে কোটি কোটি টাকা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক কর্মকর্তা বলেন, “কোনো কর্মকর্তা বাসা ছাড়ার পর নতুন কেউ এলে আবার সংস্কার শুরু হয়। প্রয়োজন না থাকলেও রং করা হয়, ফিটিংস বদলানো হয়। আর এই সুযোগে বিল কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়।”
সংশ্লিষ্টদের দাবি, চট্টগ্রাম গণপূর্ত বিভাগ-১ এর আওতায় গত কয়েক বছরে সংস্কার খাতে বরাদ্দ হওয়া অর্থের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হলে ভয়াবহ অনিয়ম বেরিয়ে আসবে।
বিশেষ করে যেসব ভবনে কাজ দেখিয়ে বিল তোলা হয়েছে, সেগুলোতে সরেজমিন তদন্ত চালালে কাগজে-কলমের কাজ আর বাস্তবতার বিস্তর ফারাক ধরা পড়বে।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মাধ্যমে পুরো বরাদ্দ ও ব্যয়ের হিসাব তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
তাঁদের ভাষ্য, দায়সারা মনিটরিং নয়—প্রতিটি প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি, ব্যয় ও বিল যাচাই করা হলে গণপূর্তের বহু বছরের জমে থাকা অনিয়মের মুখোশ খুলে যাবে।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি



