চট্টগ্রামের পটিয়ায় শনিবারের দুপুরটা যেন মুহূর্তেই বদলে গেল এক বুক হাহাকারে। যে দুই কিশোর সকালে ঘর থেকে বের হয়েছিল কোরবানির পশুর হাটে গরু দেখতে, বিকেলের আগেই তাদের ফিরতে হলো নিথর দেহ হয়ে।
বই-খাতা, স্কুলব্যাগ আর কিশোর বয়সের স্বপ্ন ফেলে তারা চলে গেল এমন এক ঠিকানায়, যেখান থেকে আর কোনোদিন ফিরে আসা হয় না।
শনিবার দুপুর পৌনে একটার দিকে উপজেলার আনসার ক্যাম্পের সামনে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে একটি বাসের সঙ্গে মোটরসাইকেলের ভয়াবহ সংঘর্ষে প্রাণ হারায় দুই কিশোর।
আরও পড়ুন
নিহতরা হলো কচুয়াই ইউনিয়নের শেখ মোহাম্মদ পাড়ার আখতার হোসেনের ছেলে মোহাম্মদ শাহাদাত হোসেন (১৫) এবং একই এলাকার জাহেদুল ইসলামের ছেলে মোহাম্মদ তাসনিম (১৫)।
শাহাদাত ছিল উপজেলার চক্রশালা কৃষি উচ্চবিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী। আর তাসনিম পড়ত আব্দুস সোবাহান রাহাত আলী উচ্চবিদ্যালয়ের নবম শ্রেণিতে।
দুজনই ছিল প্রাণচঞ্চল, স্বপ্নবাজ কিশোর। পরিবার আর বন্ধুদের কাছে তারা ছিল অগাধ ভালোবাসার নাম।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, একটি মোটরসাইকেলে করে শাহাদাত, তাসনিম ও তানভির হোসেন (১৮) স্থানীয় একটি কোরবানির পশুর হাটে গরু দেখতে যাচ্ছিল। মোটরসাইকেলটি চালাচ্ছিল শাহাদাত।
হয়তো পথজুড়ে ছিল তাদের হাসি, গল্প আর ঈদকে ঘিরে ছোট ছোট আনন্দের পরিকল্পনা। কিন্তু কয়েক মুহূর্তের ব্যবধানে সবকিছু শেষ হয়ে যায় নির্মম এক সড়ক দুর্ঘটনায়।
আনসার ক্যাম্প এলাকায় পৌঁছালে বিপরীত দিক থেকে আসা একটি বাসের সঙ্গে মোটরসাইকেলটির সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষের তীব্রতায় তিনজনই ছিটকে পড়ে সড়কে। ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারায় শাহাদাত।
গুরুতর আহত অবস্থায় তাসনিম ও তানভিরকে উদ্ধার করে পটিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাসনিমকে মৃত ঘোষণা করেন। আহত তানভিরকে পরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
দুর্ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও কচুয়াই ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি মোহাম্মদ ইসহাক জানান, দুর্ঘটনার পর বাসটির চালক পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। তবে স্থানীয়দের সহায়তায় ধাওয়া দিয়ে বাসটি আটক করা হয় এবং পরে পুলিশে সোপর্দ করা হয়।
পটিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্তব্যরত চিকিৎসক সুচিতা দেব বলেন, হতাহত তিনজনই মাথায় গুরুতর আঘাত পেয়েছিলেন। আহত একজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
পটিয়া হাইওয়ে পুলিশের উপপরিদর্শক মোস্তাফিজুর রহমান জানান, স্থানীয় লোকজন বাসটি আটক করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছেন।
নিহত দুই কিশোরের মরদেহ পটিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রাখা হয়েছে। এ ঘটনায় প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ দুর্ঘটনার পর কচুয়াই ইউনিয়নের শেখ মোহাম্মদ পাড়াজুড়ে এখন শুধু কান্না আর শোকের মাতম।
যে দুই কিশোর কিছুদিন আগেও স্কুলের বেঞ্চে বসে ভবিষ্যতের স্বপ্ন আঁকছিল, তাদের বাড়িতে এখন শোকাহত স্বজনদের আহাজারি।
স্কুলব্যাগ কাঁধে নেওয়ার বয়সে তাদের কাঁধে উঠল কফিন—এ দৃশ্য যেন পুরো এলাকাকে স্তব্ধ করে দিয়েছে।
একটি বিকেল, একটি মোটরসাইকেল আর কয়েক সেকেন্ডের ভয়াবহতা কেড়ে নিল দুটি তাজা প্রাণ।
রেখে গেল দুই পরিবারের বুকভাঙা কান্না, অপূর্ণ স্বপ্ন আর এক গভীর শূন্যতা।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি



