কর্ণফুলী টানেলের অন্দরমহলের অজানা হিসাব: জনগণের টাকায় বিলাস, ব্যবহারে শূন্য

প্রকাশিত: ০৯ জুলাই, ২০২৬ ১৬:২৪

চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিত দেশের প্রথম টানেলটি এখন যেন এক মহাবিপত্তি ও রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়ের জীবন্ত স্মারক।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বন্দরনগরীকে চীনের সাংহাইয়ের মতো ‘ওয়ান সিটি, টু টাউন’ মডেলে রূপান্তরের যে রঙিন স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল, বাস্তবতার মাটিতে তা এখন চরম এক দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে।

১০ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই টানেলটি এখন লাভের মুখ দেখা তো দূরের কথা, দৈনিক রক্ষণাবেক্ষণ খরচ তুলতেই হিমশিম খাচ্ছে।

আর এই বিশাল লোকসানের বোঝা হালকা করতে এবার প্রকল্পের আওতাধীন সাড়ে চার শ কোটি টাকার বিলাসবহুল ‘সার্ভিস এরিয়া’ ও অতিথিশালাটি ২৯ বছরের জন্য ইজারা দেওয়ার মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে সেতু বিভাগ।

তবে এই চরম সংকটের মাঝেও কিছুটা আশার আলো দেখা যাচ্ছে সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের নতুন এক মহাপরিকল্পনায়।

এই প্রকল্পটি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে কর্ণফুলী টানেল হয়ে দক্ষিণ চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার ও মহেশখালীর মাতারবাড়ী পর্যন্ত একটি নতুন অর্থনৈতিক করিডর তৈরি হবে।

এতে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার সড়কপথের দূরত্ব প্রায় ৪০ কিলোমিটার কমে আসবে এবং ভ্রমণ সময় সাশ্রয় হবে প্রায় এক ঘণ্টা।

এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে, গত ৯ জুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় আঞ্চলিক মহাসড়ক উন্নয়নে ১ হাজার ১৮৩ কোটি টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, এই মহাসড়ক প্রকল্পটি পাস ও কার্যকর হলে টানেলটির স্থবিরতায় কিছুটা গতি ফিরবে।

একজনের জন্য সাড়ে চার শ কোটির বিলাসিতা!

সেতু বিভাগ সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যে উঠে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর ও ক্ষমতার অপচয়ের চিত্র। টানেলের দক্ষিণ প্রান্তে আনোয়ারা উপজেলার পারকি খালের পাশে প্রায় ৭২ একর জায়গাজুড়ে তৈরি করা হয় ‘সার্ভিস এরিয়া’।

শুরুতে এই সার্ভিস এরিয়া মূল প্রকল্পে ছিল না, মাঝপথে এটি যুক্ত করা হয়। সেতু বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, মূলত ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সফরের কথা মাথায় রেখেই এই রাজকীয় অতিথিশালা নির্মাণ করা হয়েছিল।

তিনি চট্টগ্রামে গেলে যেন সেখানে রাজকীয়ভাবে থাকতে পারেন। এমন চাটুকারিতার চিন্তাই ছিল প্রকল্পের কর্মকর্তাদের মাথায়।

এখানে তৈরি করা হয়েছে প্রায় পাঁচ হাজার বর্গফুট আয়তনের আধুনিক সুসজ্জিত একটি বাংলো, যাতে রয়েছে ছয়টি কক্ষ এবং সামনে একটি চোখ ধাঁধানো সুইমিংপুল।

এ ছাড়া রয়েছে ৩০টি রেস্টহাউস বা বিশ্রামাগার, সম্মেলনকেন্দ্র, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, হেলিপ্যাড, মসজিদ, পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন, একটি জাদুঘর এবং টানেলের একটি রেপ্লিকা।

জনমানবহীন এই বিশাল সাম্রাজ্যকে ঠাণ্ডা রাখতে বসানো হয়েছে ১ হাজার ১৮২ টন ক্ষমতার শীতাতপনিয়ন্ত্রণ-ব্যবস্থা (এসি)!

অথচ নির্মাণের পর থেকে জনবলের অভাবে এই অতিথিশালাটি একদিনের জন্যও চালু করা সম্ভব হয়নি।

সমীক্ষার শুভঙ্করের ফাঁকি: আয়ের চেয়ে ব্যয় চার গুণ

প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় দেখানো হয়েছিল, ২০২৫ সালে টানেলটি দিয়ে দিনে গড়ে ২৮ হাজার ৩৫০টি যানবাহন চলাচল করবে এবং দৈনিক ১৭ হাজার ৩৭৫টি যানবাহন চললেই এটি লাভজনক হবে। কিন্তু বাস্তবে বর্তমানে গাড়ি চলছে দৈনিক মাত্র ৪ হাজারের কাছাকাছি, যা ধারণার মাত্র ১৪ শতাংশ!

বর্তমানে টানেল থেকে মাসে টোল আদায় হচ্ছে গড়ে মাত্র ৩ কোটি টাকা। বিপরীতে রক্ষণাবেক্ষণে নিযুক্ত ঠিকাদারের পেছনেই প্রতি মাসে সরকারের খরচ হচ্ছে সাড়ে ১১ কোটি টাকা।

অর্থাৎ প্রতি মাসে কোনো আয় ছাড়াই স্রেফ রক্ষণাবেক্ষণ করতেই সরকারের পকেট থেকে হাওয়া হয়ে যাচ্ছে গড়ে ৮ কোটি টাকা।

সম্প্রতি সরকারের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন অধিদপ্তরের (আইএমইডি) এক প্রভাব মূল্যায়ন প্রতিবেদনে স্পষ্ট বলা হয়েছে, টানেলে টোলের হার বাড়িয়ে এই লোকসান কমানো যাবে না।

টানেলটিকে অর্থনৈতিকভাবে টেকসই করতে হলে আনোয়ারা প্রান্তে বন্দরভিত্তিক শিল্প দ্রুত গড়ে তোলা এবং কর্ণফুলী ড্রাই ডক, চায়না ইপিজেড ও কোরিয়ান ইপিজেডসহ শিল্পাঞ্চল উন্নয়নে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে।

টানেলের আর্থিক খতিয়ান (মাসিক)
+----------------------------+-----------------------+
| খাত                        | টাকার পরিমাণ          |
+----------------------------+-----------------------+
| গড় টোল আদায়                | ৩ কোটি টাকা           |
| রক্ষণাবেক্ষণ খরচ            | সাড়ে ১১ কোটি টাকা     |
| মাসিক নিট ঘাটতি/লোকসান      | ৮ কোটি টাকা           |
+----------------------------+-----------------------+

ব্যয় বৃদ্ধির নেপথ্যে বিলাসবহুল তৈজসপত্র

২০১৫ সালের নভেম্বরে যখন প্রকল্পটি অনুমোদন পায়, তখন এর ব্যয় ধরা হয়েছিল ৮ হাজার ৪৪৬ কোটি টাকা। চীনের ঋণচুক্তি সম্পাদনে দেরি হওয়ায় কাজ শুরু হয় দুই বছর পর।

এরপর জমি অধিগ্রহণ, শুল্ক-কর ও পরিষেবা লাইন স্থানান্তরের দোহাই দিয়ে ২০২০ সালে ব্যয় বাড়িয়ে করা হয় ৯ হাজার ৮৮০ কোটি টাকা। ২০২১ সালে সার্ভিস এরিয়া ও অতিথিশালা নির্মাণের জন্য জরুরি ভিত্তিতে আরও ৪৯৪ কোটি টাকা বাড়ানো হয়।

সর্বশেষ গত বছরের জানুয়ারিতে আবারও ৩১৫ কোটি টাকা ব্যয় বৃদ্ধি করা হয়।

কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, শেষ মেয়াদের এই বিপুল অর্থ টানেলের জন্য নয়, বরং অতিথিশালার রাজকীয় তৈজসপত্র, দামি ইলেকট্রনিক সামগ্রী, আসবাব ও গৃহসজ্জাসামগ্রী কেনার পেছনে ওড়ানো হয়েছে।

ফলে প্রকল্পের চূড়ান্ত ব্যয় গিয়ে ঠেকেছে ১০ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকায়।

ইজারা দিতেও বিপত্তি: সাড়া নেই বিদেশি প্রতিষ্ঠানের

২০২৪ সালে গণ–অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়ে এই শ্বেতহস্তী মার্কা স্থাপনাগুলো ইজারা দিয়ে আয় বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়।

গত বছরের জুলাই ও সেপ্টেম্বরের মধ্যে ২৯ বছরের মেয়াদে আন্তর্জাতিক দরপত্র ডাকা হলেও কোনো বিদেশি প্রতিষ্ঠান সাড়া দেয়নি।

স্থানীয় ২-৩টি প্রতিষ্ঠান আগ্রহ দেখালেও তারা যে দর প্রস্তাব করেছিল, তা সেতু কর্তৃপক্ষের প্রাক্কলিত দরের চেয়ে অনেক কম হওয়ায় তা বাতিল করা হয়।

সেতু বিভাগের সচিব মোহাম্মদ আবদুর রউফ এ প্রসঙ্গে বলেন, “টানেল প্রকল্প থেকে আয় বাড়ানোর লক্ষ্যেই অতিথিশালা ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এগুলো নির্মাণে যে ব্যয় হয়েছে, তা বিবেচনায় নিয়ে একটা আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছে। সে অনুযায়ী দর পাওয়া গেলে ২৯ বছরের জন্য ইজারা দেওয়া হবে।” সূত্র-প্রথম আলো

১৩ জুলাই শেষ দিন: ভরসা এবার ১৩ দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠান

চলতি বছরে তৃতীয় দফায় আবার দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে, যার জমা ও প্রকাশের শেষ দিন আগামী ১৩ জুলাই।

সেতু বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, এই দফায় এখন পর্যন্ত ১৩টি দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠান আগ্রহ দেখিয়ে দরপত্র কিনেছে।

প্রতিষ্ঠানগুলো হলো: জে এস ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, চিটাগং এশিয়ান অ্যাপারেলস, এলভি স্ট্রাকচার, এটিএন হোমস, দি কক্স টুডে, সুইট ড্রিম ম্যানেজমেন্ট, রিচমন্ড হোটেল অ্যান্ড সুইট, খান প্রোপার্টিজ (যুক্তরাষ্ট্র), ইউনিক হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টস, আরভিং হোটেল অ্যান্ড হসপিটালিটি এবং বেস্ট হোল্ডিং।

শর্ত অনুযায়ী, নির্বাচিত ইজারাদারকে সব স্থাপনা ‘যেমন আছে’ ভিত্তিতে বুঝিয়ে দেওয়া হবে।

তারা রুম সার্ভিস, স্পা, কনফারেন্স ও রেস্তোরাঁ ব্যবসা করে আয় করতে পারবেন এবং সেবার মূল্য নির্ধারণের পূর্ণ স্বাধীনতা পাবেন।

তবে কাঠামোগত কোনো পরিবর্তন করতে চাইলে সেতু কর্তৃপক্ষের অনুমতি লাগবে।

সেতু বিভাগ ও পর্যটন করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, এই অতিথিশালা থেকে মাত্র দেড় কিলোমিটার দূরে আনোয়ারায় পারকি সৈকতের পাশে পর্যটন করপোরেশন নিজেই ৭৯ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৩ একরের বেশি জমিতে একটি অত্যাধুনিক পর্যটন কমপ্লেক্স নির্মাণ করছে।

তাছাড়া টানেলের আশপাশে এখনো অন্য কোনো বড় বাণিজ্যিক বা বিনোদন অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি।

ফলে সরকারি এই পর্যটন কমপ্লেক্সের সাথে প্রতিযোগিতা করে প্রাইভেট ইজারাদারেরা বিপুল বিনিয়োগের পর কতটুকু লাভ করতে পারবেন, তা নিয়ে বড় ধরনের সংশয় রয়েছে। আর এই ভয়েই বড় বড় ব্যবসায়ীরা এখানে মোটা অঙ্কের টাকা বিনিয়োগ করতে সাহস পাচ্ছেন না।

১৩ জুলাইয়ের দরপত্র খোলার পরই ভাগ্য নির্ধারিত হবে এই বিলাসবহুল ‘ভুল প্রাক্কলনের’ অতিথিশালাটির।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরিকল্পিতভাবে রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য নেওয়া প্রকল্প যে একটি দেশের অর্থনীতির জন্য কতটা বড় বোঝা হতে পারে, কর্ণফুলী টানেল ও তার এই জনমানবহীন সার্ভিস এরিয়াই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি