চারিদিকে শুধু থইথই পানি। বানের জলের তীব্র স্রোত আর ডলু নদের ভয়াল গর্জন। ঘরের ঠিক বাইরেই গলাসমান জল।
এমন এক অবরুদ্ধ, অন্ধকারচ্ছন্ন পরিস্থিতিতে যখন পুরো গ্রাম লড়ছে বেঁচে থাকার লড়াইয়ে, ঠিক তখনই প্রকৃতির আরেক তীব্র ডাক-সৃজনের ডাক।
গত বুধবার দিবাগত রাত দুইটায় যখন চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার পশ্চিম আমিরাবাদ ইউনিয়নের খৈয়ারকুল গ্রামে দুর্যোগের আঁধার নেমে এসেছে, তখনই শুরু হলো ২২ বছর বয়সী গৃহবধূ মিজবাহুল জান্নাতের তীব্র প্রসব বেদনা।
একদিকে বন্যার গ্রাস, অন্যদিকে ফুটফুটে এক আগামীর আগমনী বার্তা। সৌদি আরবপ্রবাসী স্বামী রিয়াজ উদ্দিন দূর পরবাসে, আর দেশে তাঁর পরিবার তখন দিশেহারা।
বাড়ি থেকে উপজেলা সদরের হাসপাতালের দূরত্ব মাত্র দুই কিলোমিটার। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর সেই সড়ক তখন রূপ নিয়েছে এক উত্তাল নদীতে।
কয়েক ঘণ্টার অসহ্য যন্ত্রণা আর বুকের ভেতর জমাট বাঁধা একরাশ আতঙ্ক নিয়ে ভোরের আলো ফোটার অপেক্ষা করছিল পরিবারটি।
কোনো উপায় না দেখে, শেষ ভরসা হিসেবে তাঁরা খবর দেন ফায়ার সার্ভিসকে। আর ঠিক তখনই শুরু হয় মানবতা ও পেশাদারিত্বের এক অনন্য রূপকথা।
দেবদূতের বেশে ফায়ার সার্ভিস
ভোর ছয়টা। খবর পেয়েই লোহাগাড়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশনের একদল অকুতোভয় কর্মী ছুটে যান সেই জলমগ্ন খৈয়ারকুল গ্রামে।
স্টেশন থেকে গৃহবধূর শ্বশুরবাড়ির দূরত্ব প্রায় ৬০০ মিটার। কিন্তু এই সামান্য পথটুকুর কোথাও বুক সমান, কোথাও গলাসমান পানি। কোনো গাড়ি চলার উপায় নেই।
ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা কালবিলম্ব না করে স্ট্রেচার কাঁধে নামলেন সেই বানের জলে। পরম মমতায় ও সতর্কতায় অন্তঃসত্ত্বা মিজবাহুলকে স্ট্রেচারে তুলে নিলেন তাঁরা।
নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে, পানির তীব্র স্রোতকে উপেক্ষা করে, কাঁধে করে সেই ৬০০ মিটার পথ পাড়ি দিলেন এই সম্মুখযোদ্ধারা।
এরপর আগে থেকেই অপেক্ষমাণ অ্যাম্বুলেন্সে তুলে দেওয়া হয় তাঁকে। প্রায় দেড় ঘণ্টার এক শ্বাসরুদ্ধকর ও মানবিক অভিযান শেষে মিজবাহুল জান্নাতকে পৌঁছানো হয় হাসপাতালে।
লোহাগাড়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশনের কর্মকর্তা রাখাল চন্দ্র রুদ্র জানান,“খবর পাওয়ার পর আমাদের একটি দল ঘটনাস্থলে যায়। পুরো পথই পানির নিচে ছিল। আমরা তাঁকে স্ট্রেচারে কাঁধে বহন করে নিরাপদে উদ্ধার করি।”
অবশেষে হাসল মা, হাসল মানবতা
সব শঙ্কা আর দুর্যোগের মেঘ তাড়িয়ে অবশেষে লোহাগাড়ার এক হাসপাতালে ফুটফুটে এক পুত্রসন্তানের জন্ম দিয়েছেন মিজবাহুল জান্নাত।
চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, বর্তমানে মা ও নবজাতক-দুজনই সম্পূর্ণ সুস্থ ও নিরাপদ আছেন।
বানের জলের ধ্বংসলীলার মাঝে এই যেন এক স্বর্গীয় আশীর্বাদ। একটি নতুন প্রাণের আগমন যেন পুরো জনপদের বুক থেকে এক নিমেষেই মুছে দিল বন্যার সমস্ত ক্লান্তি আর হাহাকার।
প্রকৃতির এই রুদ্ররূপের মাঝেও খৈয়ারকুল গ্রামের এই গল্পটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়-দুর্যোগ যত বড়ই হোক না কেন, মানুষের সহমর্মিতা, কর্তব্যবোধ আর জীবনের অদম্য স্পৃহার কাছে তাকে হার মানতেই হয়।
বন্যার করাল গ্রাস থেকে ছিনিয়ে আনা এই নতুন শিশুই এখন লোহাগাড়ার বুকে বেঁচে থাকার এক নতুন প্রেরণা।
ভয়াল বন্যায় ডুবছে দক্ষিণ চট্টগ্রাম: পানিবন্দী লাখো মানুষ
এই আনন্দের খবরের সমান্তরালে দক্ষিণ চট্টগ্রামের বাস্তবতা এখনো ভীষণ নির্মম। টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সাতকানিয়া ও লোহাগাড়া উপজেলার বন্যা পরিস্থিতি ক্রমেই অবনতির দিকে যাচ্ছে। ডলু, সাঙ্গু ও টঙ্কাবতীর উপচে পড়া পানিতে প্লাবিত হয়েছে বিস্তীর্ণ এলাকা।
সাঙ্গু নদের পানি চিত্র (বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টা):
┌───────────────────────────┬───────────────────────────┐
│ পরিমাপের স্থান │ পানির অবস্থা │
├───────────────────────────┼───────────────────────────┤
│ সাতকানিয়া অংশ │ বিপৎসীমার ২২ সেমি ওপরে │
└───────────────────────────┴───────────────────────────┘
উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, গ্রামীণ ও প্রধান সড়কগুলো পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন।
প্রায় কয়েক লাখ মানুষ বর্তমানে পানিবন্দী অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
সামনে আরও দুর্যোগের পূর্বাভাস
পাউবোর চট্টগ্রাম উপবিভাগীয় প্রকৌশলী প্রশান্ত তালুকদার জানিয়েছেন, বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী আগামী ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টায় এই অঞ্চলে আরও ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণের আশঙ্কা রয়েছে।
প্রশাসন থেকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি

