সেবার আড়ালে ‘নকশাবহির্ভূত’ বাণিজ্য, অভিযানে উন্মোচিত ৪ হাসপাতালের ভয়াল চিত্র!

অনিয়ম চউকের নজরে-চেয়ারম্যানের কড়া আল্টিমেটাম!

প্রকাশিত: ২০ জুলাই, ২০২৬ ১৮:৩২

বন্দরনগরী চট্টগ্রামের প্রাণকেন্দ্র জিইসি মোড়। প্রতিদিন এই মোড় ও সংলগ্ন সড়কগুলোতে হাজার হাজার যানবাহন স্তব্ধ হয়ে থাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা।

কিন্তু চরম এই যানজট কি কেবল যানবাহনের আধিক্যের ফল, নাকি পরিকল্পিত অনিয়ম ও লোভের পরিণতি?

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (চউক/সিডিএ) সাম্প্রতিক এক উচ্চপর্যায়ের অভিযানে মিলেছে এর চাঞ্চল্যকর উত্তর।

চিকিৎসা সেবার মহৎ ব্যানার টাঙিয়ে চট্টগ্রামের একাধিক নামীদামি বেসরকারি হাসপাতাল মূলত ভবন নির্মাণ বিধিমালা তুচ্ছ করে পরিচালনা করছে বাণিজ্যিক ব্যবসা।

সড়ক দখল ও অপর্যাপ্ত পার্কিংয়ের মাধ্যমে নগরবাসীকে প্রতিদিন ঠেলে দিচ্ছে অবর্ণনীয় দুর্ভোগে।

যানজটের মূল উৎস চিহ্নিত করতে সোমবার চউকের একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন টিম নগরের জিইসি মোড় এলাকার চার প্রধান বেসরকারি হাসপাতালে আকস্মিক পরিদর্শনে যায়।

সরেজমিন তল্লাশিতেই উন্মোচিত হয় তাদের বাইরের চাকচিক্যের ভেতরের উদ্বেগজনক চিত্র।

সরেজমিনে চার হাসপাতালের থলের বেড়াল

চউকের পরিদর্শক দলের অনুসন্ধানে চারটি খ্যাতনামা হাসপাতালের চরম বিধি লঙ্ঘনের প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে।

মেডিকেল সেন্টার: বাণিজ্যিক ভবনের অনুমোদন নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে এই হাসপাতালটি। মূল ভবনে পার্কিং সুবিধা অপর্যাপ্ত।

তার চেয়েও ভয়ংকর দৃশ্য দেখা গেছে পার্কিংয়ের নির্ধারিত স্থানে। যেখানে পার্কিং হওয়ার কথা, সেটিকে রূপ দেওয়া হয়েছে ডাস্টবিনে!হাসপাতাল

আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, সে স্থানে স্তূপ করে রাখা হয়েছে রান্নার ও চিকিৎসার চরম দাহ্য গ্যাস সিলিন্ডার, যা যেকোনো মুহূর্তে পুরো এলাকায় বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড ও বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে।

রয়েল হাসপাতাল: এই প্রতিষ্ঠানটিও বাণিজ্যিক ভবনের অনুমোদন বাগিয়ে নিয়ে পরবর্তীতে গড়ে তুলেছে পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল।হাসপাতাল

হাসপাতালের বহিরাগত গাড়ি ও অ্যাম্বুলেন্স ধারণের মতো ন্যূনতম পার্কিং স্পেস এখানে রাখা হয়নি।

মেট্রোপলিটন হাসপাতাল: হাসপাতালটিতে কাগজে-কলমে পার্কিংয়ের জায়গা থাকলেও বাস্তবে নিজস্ব গাড়ি পার্কিং স্পেসে পাঠানো হচ্ছে না।হাসপাতাল

ফলে রোগী ও স্বজনদের যানবাহনগুলো সরাসরি প্রধান সড়কে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে অবরুদ্ধ করে রাখছে ব্যস্ততম রাস্তা।

সিএসসিআর (CSCR) হাসপাতাল: পরিদর্শনকারী দল ভবনটির অনুমোদিত নকশা ও ব্যবহারের শর্তাবলি দেখতে চাইলে কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে সিডিএ’র নকশা উপস্থাপন করতে সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়।

এতে ভবনটির সম্পূর্ণ কাঠামোগত বৈধতা নিয়েই বড় ধরনের সংশয় দেখা দিয়েছে।

পরিদর্শন শেষে চউকের প্রধান প্রকৌশলী আহমেদ আনোয়ারুল নজরুল বলেন, আমরা বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করছি এবং প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের নকশা ও বাস্তব অবস্থা যাচাই করছি।হাসপাতাল

হুট করে কোনো কঠোর সিদ্ধান্ত নিলে এসব হাসপাতালে ভর্তি থাকা রোগীরা তাৎক্ষণিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হতে পারেন।

মানবিক দিক বিবেচনা করে আপাতত সংশ্লিষ্ট হাসপাতালগুলোকে সতর্ক করা হয়েছে। শিগগিরই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বসে আলোচনার মাধ্যমে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

আইওয়াশ পার্কিং বন্ধে চউক চেয়ারম্যানের কড়া আল্টিমেটাম

অভিযান শেষে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেন বেসরকারি হাসপাতালগুলোর এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেন।

তিনি কঠোর ভাষায় হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, বেসরকারি হাসপাতালগুলোর প্রায় কোনোটিই পর্যাপ্ত পার্কিং ব্যবস্থা গড়ে তোলেনি। তারা সিডিএ’র নকশা বহির্ভূতভাবে এবং পার্কিং ব্যবস্থা না রেখেই বাণিজ্যিকভাবে ব্যবসা পরিচালনা করছে।

তারা নিজেরাও খুব ভালো করে জানে যে তারা সিডিএ’র কোন কোন আইন ভঙ্গ করেছে।

আমি তাদের স্পষ্ট করে বলতে চাই-তারা যেন অবিলম্বে নিজস্ব উদ্যোগে পর্যাপ্ত পার্কিং ব্যবস্থা গড়ে তোলে। কেননা আংশিক পার্কিং ব্যবস্থা একটি ‘আইওয়াশ’।

সেটি করা চলবে না। অন্যথায় তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

সিডিএ চেয়ারম্যান আরও জানান, নগরের ট্রাফিক ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের লক্ষ্যে সিডিএ, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক), চট্টগ্রাম ওয়াসা এবং চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) এখন এক টেবিলে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে।

নগরের অচল অবস্থা দূর করতে এবং জঞ্জালমুক্ত চট্টগ্রাম গড়তে কোনো প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানকেও ছাড় দেওয়া হবে না।

তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, আজকের পরিদর্শনে যেসব হাসপাতাল পার্কিং ব্যবস্থা রাখেনি, তাদের শেষবারের মতো সতর্ক করা হলো।

পরবর্তীতে নিবিড় পর্যবেক্ষণের সময় যদি হাসপাতালের আকার অনুসারে পার্কিং ব্যবস্থা দৃশ্যমান না হয়, তবে কোনো অজুহাত বা সুপারিশ না শুনে সরাসরি কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

সোমবারের এই আকস্মিক অভিযানে চউকের প্রধান প্রকৌশলী আহমেদ আনোয়ারুল নজরুলের নেতৃত্বে উপস্থিত ছিলেন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও ইমারত নির্মাণ কমিটি ২ এর চেয়ারম্যান এ.জি.এম. সেলিম, নির্বাহী প্রকৌশলী ও প্রকল্প পরিচালক মো. মাহফুজুর রহমান, অথোরাইজড অফিসার ১ কাজী কাদের নেওয়াজ এবং অথোরাইজড অফিসার ২ তানজীব হোসেনসহ সিডিএ’র সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ।

নগর বিশেষজ্ঞদের মতে, হাসপাতালগুলোকে এতদিন কোনো জবাবদিহিতার আওতায় না আনার ফলেই তারা আইন অমান্য করার সাহস পেয়েছে।

একদিকে পার্কিংয়ের জায়গায় ময়লার স্তূপ ও বোমার মতো গ্যাস সিলিন্ডার সংরক্ষণ, অন্যদিকে সড়ক দখল করে ব্যবসা-সব মিলিয়ে চউকের এই কঠোর অভিযান ও আল্টিমেটামকে নগরবাসী অত্যন্ত ইতিবাচক হিসেবে দেখছে।

এখন দেখার বিষয়, চউকের এই অন্তর্বর্তী সতর্কবার্তার পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আইন মেনে শোধরায়, নাকি নগরবাসীকে রক্ষা করতে চউকের বুলডোজার ও আইনি পদক্ষেপের মুখে পড়ে।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি