লোহাগাড়া প্রতিনিধি: বনের ভেতরে খাদ্যশৃঙ্খল ধ্বংস হলে ক্ষুধার্ত হাতির পাল লোকালয়ে হানা দিতে বাধ্য হয়, যা মানুষের জন্য চরম জীবন ও স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে।
এই প্রাণঘাতী সংঘাত ঠেকাতে এবং বনের স্বাভাবিক ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে এবার লোহাগাড়ায় কঠোর আইনি পদক্ষেপ ও পুনর্বাসন প্রক্রিয়া শুরু করেছে বন বিভাগ।
সোমবার (২৭ জুলাই) সকালে লোহাগাড়ার চুনতি রেঞ্জের আওতাধীন সাতগড় বিটের ‘সাতের আগা’ নামক স্থানে এক বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হয়।
২০০২-০৩ সালে সৃজিত বাঁশ বাগানের প্রায় এক একর বনভূমি দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ জবরদখলে ছিল। বন বিভাগের এই অভিযানে দখলদারদের উচ্ছেদ করে উচ্ছেদকৃত ভূমিতে বাঁশসহ হরেক রকমের দেশীয় প্রজাতির গাছের চারা রোপণ করা হয়েছে।
অভিযানে উপস্থিত ছিলেন চুনতি রেঞ্জ কর্মকর্তা আবির হাসান, সাতগড় বিট কর্মকর্তা বজলুর রশিদ, বন বিভাগের কর্মচারীবৃন্দ, বাঁশ বাগানের অংশীদার এবং অনিয়মিত শ্রমিকরা।
হাতি-মানুষের স্নায়ুযুদ্ধ ও মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি
উপকূলীয় ও পাহাড়ি অঞ্চলে বনভূমি কমে যাওয়ায় বন্যপ্রাণী ও মানুষের রক্তক্ষয়ী সংঘাত এখন তুঙ্গে। বন উজাড়ের ফলে খাদ্যাভাবে থাকা হাতির ক্ষিপ্ত আচরণ কেবল কৃষকের ফসলই ধ্বংস করে না, বরং লোকালয়ে ছড়িয়ে দেয় আতঙ্ক ও শারীরিক ক্ষতির মারাত্মক ঝুঁকি।
হাতি তাড়াতে গিয়ে প্রায়শই প্রাণ হারাচ্ছেন অগণিত মানুষ। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, চুনতির এই অঞ্চলে জবরদখল হওয়া বাঁশবন উদ্ধার না করা গেলে এই সহিংসতা আরও ভয়াবহ রূপ নিত।
অভিযান ও চারা রোপণ শেষে চুনতি রেঞ্জ কর্মকর্তা আবির হাসান বলেন, বিদেশি প্রজাতির উদ্ভিদের পরিবর্তে দেশীয় গাছ রোপণের মাধ্যমেই কেবল পরিবেশের প্রকৃত ভারসাম্য রক্ষা, পাখি ও অন্যান্য প্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থল সংরক্ষণ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সবুজ বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।
বন্যহাতির জীবনযাত্রা ও লোকালয়ের নিরাপত্তার মধ্যকার সরাসরি সম্পর্কের কথা তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, বন্যহাতির অন্যতম প্রধান ও প্রিয় খাদ্য হলো বাঁশ। বন এলাকায় হাতির খাদ্যাভাব দূর করে এদের বনের ভেতরে ধরে রাখার লক্ষ্যেই বাঁশ বাগান ও উপযোগী বুনো গাছের চারা রোপণ করা হচ্ছে।
এটি প্রত্যক্ষভাবে হাতি-মানুষের দীর্ঘদিনের রক্তক্ষয়ী সংঘাত কমাতে সাহায্য করবে।
চুনতি সাতগড় বিটের সাতের আগায় জবরদখল হওয়া ২০০২-০৩ সালের বাঁশ বাগান উদ্ধার করে নতুন করে চারা রোপণের মাধ্যমে এ প্রক্রিয়ার সূত্রপাত হলো, যা ভবিষ্যতে আরও কঠোরভাবে চলমান থাকবে।
স্থানীয়দের স্বস্তি ও অনুসন্ধানের দাবি
উদ্ধারকৃত বনভূমিতে বাঁশ ও দেশীয় গাছের চারা রোপণের এই পদক্ষেপকে সাধুবাদ জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন নাগরিক সমাজ।
তাঁদের মতে, এটি কেবল একটি আইনি বা প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম নয়, বরং চুনতির মাটি, বাস্তুতন্ত্র ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার ক্ষেত্রে একটি সময়োপযোগী দূরদর্শী উদ্যোগ। এর ফলে মাটির স্বাস্থ্য অক্ষুণ্ন থাকবে এবং বন্যপ্রাণী তাদের স্বাভাবিক খাদ্য খুঁজে পাবে।
তবে সুশীল সমাজের দাবি, কেবল এক একর জায়গা উচ্ছেদ করেই বন বিভাগের দায়িত্ব শেষ হওয়া উচিত নয়।
২০০২-০৩ সালের একটি সরকারি বাঁশ বাগান কীভাবে এবং কাদের ছত্রছায়ায় এতদিন জবরদখল হয়ে রইল, তার নেপথ্যে থাকা প্রভাবশালী বনখেকোদের চিহ্নিত করতে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত প্রয়োজন।
অন্যথায়, পুনর্বাসিত এই নতুন চারাগুলো আবারও দখলদারদের অশুভ গ্রাসে পড়ার ঝুঁকিতে থাকবে।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি

