জিপিএইচ ইস্পাতের ‘সিআইপি’ মুখোশের আড়ালে বিশাল খেলাপি কাণ্ড

জরিমানা জমা হচ্ছে জুলাই যোদ্ধাদের চিকিৎসায়

প্রকাশিত: ২৯ জুলাই, ২০২৬ ২২:৫৮

উচ্চ আদালত থেকে শুরু করে বিচারিক আদালত-আইনের চোখকে ফাঁকি দিতে একের পর এক তথ্য গোপনের এক দুঃসাহস দেখিয়েছে দেশের অন্যতম ইস্পাত প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ‘জিপিএইচ ইস্পাত’।

একদিকে দেশের ২৯টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রায় ২ হাজার ১০০ কোটি টাকার পর্বতপ্রমাণ ঋণখেলাপির দাগ, অন্যদিকে সরকারি খাতায় জ্বলজ্বল করছে ‘সিআইপি’ (বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি) খেতাব।

এই প্রভাব ও আইনি ফাঁকফোকরকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরোর (সিআইবি) রিপোর্ট থেকে নিজেদের নাম মুছে ফেলার এক চতুর আইনি ফাঁদ পেতেছিল প্রতিষ্ঠানটি।

তবে শেষ রক্ষা হয়নি। আদালতের চোখে ধুলো দেওয়ার এই অপচেষ্টা উন্মোচিত হওয়ায় জিপিএইচ ইস্পাতকে ৫ কোটি টাকা জরিমানা করেছেন হাইকোর্ট।

বুধবার (২৯ জুলাই) হাইকোর্টের বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি মাহমুদ হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত দ্বৈত বেঞ্চ রাষ্ট্রপক্ষের তথ্য উপস্থাপনের পর এই তাৎপর্যপূর্ণ ও নজিরবিহীন আদেশ দেন।

আদেশে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, আগামী এক মাসের মধ্যে জরিমানার এই টাকা সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ে জমা দিতে হবে।

আদালত এই অর্থ কোনো সাধারণ তহবিলে না পাঠিয়ে, সাম্প্রতিক গণ-অভ্যুত্থানে আহত ‘জুলাই যোদ্ধাদের’ চিকিৎসার খরচে ব্যয় করার সুনির্দিষ্ট ও মানবিক নির্দেশ দিয়েছেন।

আদালতের নথি ও রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজলের দেওয়া তথ্য পর্যালোচনা করলে জিপিএইচ ইস্পাতের আইনি কৌশলের আড়ালে থাকা জালিয়াতির এক ভয়াবহ চিত্র উঠে আসে।

ঘটনার সূচনা চলতি মাসের ৭ জুলাই। ঋণখেলাপি হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সিআইবি তালিকায় জিপিএইচ ইস্পাতের নাম অন্তর্ভুক্ত থাকায় তারা হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করে।

হাইকোর্ট প্রাথমিক শুনানি শেষে একটি রুল জারি করেন এবং সিআইবি তালিকায় নাম না রাখার বিষয়ে ‘স্থিতাবস্থা’ (স্টে) দেন।

বিষয়টি জানতে পেরে রাষ্ট্রপক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতে আবেদন জানায়। গত ৯ জুলাই চেম্বার আদালত হাইকোর্টের দেওয়া ওই আদেশ স্থগিত করে দেন।

ফলে আইনি দৃষ্টিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সিআইবি প্রতিবেদনে জিপিএইচ ইস্পাতের নাম ঋণখেলাপি হিসেবে বহাল রাখার পথ উন্মুক্ত হয়।

ঠিক এই জায়গাটিতেই শুরু হয় মূল জালিয়াতি। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ও হাইকোর্টে মামলা বিচারাধীন এবং চেম্বার জজের স্থগিতাদেশ বলবৎ থাকা সত্ত্বেও, সেই চরম সত্য গোপন রেখে জিপিএইচ ইস্পাত নিম্ন আদালতে একটি ‘টাইটেল সকাট’ বা সত্যঘোষণার মামলা করে।

সেখানে তারা অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার (ইনজাংশন) আবেদন জানায়, যাতে ২৯টি ব্যাংকের প্রায় ২ হাজার ১০০ কোটি টাকার খেলাপি হিসেবে তাদের নাম প্রদর্শন করা না হয়। কিন্তু নিম্ন আদালতে তথ্য গোপনের সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয় এবং আদালত আবেদনটি নাকচ করে দেন।

নিচু আদালতে হেরে গিয়ে তারা পুনরায় একই তথ্য গোপন করে হাইকোর্টের অপর একটি বেঞ্চে একই আবেদন নিয়ে হাজির হয়। অর্থাৎ, আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতের স্থগিতাদেশের অস্তিত্বকেই তারা নথিপত্র থেকে ছেঁটে ফেলে।

‘এটি নিখাদ প্রতারণা’: অ্যাটর্নি জেনারেল

শুনানিতে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, একদিকে প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার বিশাল অঙ্কের ঋণখেলাপি, অন্যদিকে তিনি সিআইপি সুবিধা ভোগ করছেন।

নিম্ন আদালত ও হাইকোর্ট-উভয় জায়গাতেই সুপ্রিম কোর্টের চেম্বার আদালতের আদেশের তথ্য গোপন করা হয়েছে। এটি ভুল নয়, এটি সুস্পষ্ট ও সুপরিকল্পিত জালিয়াতি ও প্রতারণার শামিল।

অবস্থা বেগতিক দেখে বাদীপক্ষের আইনজীবী আদালতে নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করে দাবি করেন, তারা আগের আদেশের বিষয়টি সম্পর্কে ‘অবগত ছিলেন না’।

তবে বিচারালয়ের ভাবমূর্তি রক্ষা এবং অসদুপায়ে আইনি সুবিধা নেওয়ার প্রবণতা বন্ধে আদালত কঠোর অবস্থান নেন এবং ৫ কোটি টাকার জরিমানার আদেশ বহাল রাখেন।

গভীরে যাওয়ার সময় এসেছে

জিপিএইচ ইস্পাতের এই আইনি জালিয়াতির ঘটনা কেবল একটি মামলার নথির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি বাংলাদেশের ব্যাংকিং ও বিচার ব্যবস্থার জন্য একটি বড় বিপ সংকেত।

প্রথমত, একজন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান ২৯টি ব্যাংক থেকে ২১০০ কোটি টাকা ঋণখেলাপি হওয়ার পরও কীভাবে রাষ্ট্রের ‘সিআইপি’ মর্যাদা ধরে রাখে? অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তদারকি ব্যবস্থা কি কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ?

দ্বিতীয়ত, বিচারালয়কে বিভ্রান্ত করতে যেভাবে তথ্য গোপন করে এক আদালত থেকে অন্য আদালতে ছোটাছুটি করা হয়েছে, তার পেছনে কেবল আইনজীবীর ‘অজ্ঞতা’ দায়ী, নাকি একটি সুসংগঠিত আইনি সিন্ডিকেট কাজ করছে-তা খতিয়ে দেখা জরুরি।

আদালত জরিমানা করে যে বার্তা দিয়েছেন, তা অত্যন্ত স্পষ্ট-আইনের হাত থেকে বাঁচতে জালিয়াতির আশ্রয় নিলে তার পরিণতি হবে কঠিন।

এখন দেখার বিষয়, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এই প্রতিষ্ঠানের ২১০০ কোটি টাকার ঋণখেলাপির উৎস এবং সিআইপি মর্যাদার অপব্যবহার নিয়ে নতুন করে কোনো পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত শুরু করে কি না।

দেশের আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা ফেরাতে এই বকেয়া ও প্রতারণার ঘটনার পেছনের কুশীলবদের মুখোশ উন্মোচন করা সময়ের দাবি।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি