পাঁচ দশক ধরে ভাড়ার ব্যয়ের অবসান, চট্টগ্রামের নিজস্ব ভবনে বিপিসি!

চট্টগ্রামকে বঞ্চিত করার চক্রান্তের ছায়া, ঢাকার ষড়যন্ত্র ভেস্তে দেওয়ার আহ্বান

প্রকাশিত: ২৮ আগস্ট, ২০২৬ ১৭:৪৮

প্রতিষ্ঠার প্রায় অর্ধশতক পর অবশেষে নিজস্ব স্থায়ী কার্যালয় পেতে যাচ্ছে জাতীয় জ্বালানি খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি)।

চট্টগ্রাম নগরের সার্সন রোডের জয়পাহাড় এলাকায় বিপিসির নিজস্ব প্রায় ৩০ একর জায়গার ওপর নির্মিত হয়েছে বহুল কাঙ্ক্ষিত এই আধুনিক স্টিল স্ট্রাকচার ভবন।

তবে একই সঙ্গে ভবনটির নির্মাণগত কিছু সাময়িক ত্রুটিকে ঢাল বানিয়ে সংস্থাটির প্রধান কার্যালয় চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় স্থানান্তরের একটি সূক্ষ্ম প্রক্রিয়ার অভিযোগ উঠেছে, যা নিয়ে স্থানীয় সুশীল সমাজ ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।

দীর্ঘদিনের ভাড়ার বোঝা ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
১৯৭৭ সালে প্রতিষ্ঠার পর ১৯৯০ সালে প্রশাসনিক স্বার্থে বিপিসির প্রধান কার্যালয় ঢাকা থেকে বন্দরনগরী চট্টগ্রামে স্থানান্তর করা হয়। তবে দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে স্থায়ী ভবনের অভাবে বিএসসি ভবনে ভাড়ায় পরিচালিত হয়ে আসছিল এর কার্যক্রম।

বিপিসি সূত্রে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, ২০০১ থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত দীর্ঘ ২৫ বছরে বিএসসি ভবনকে কেবল ভাড়া বাবদ দিতে হয়েছে প্রায় ৫০ কোটি টাকা (বছরে গড়ে প্রায় দুই কোটি টাকা)।

এছাড়া অতিরিক্ত জ্বালানি ও লজিস্টিক ব্যয়ের কারণে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ বজায় ছিল। ২০০৫ সালের পর নিজস্ব জায়গায় স্থায়ী ভবনের পরিকল্পনা হলেও সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা আকতারুজ্জামান চৌধুরী ও সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের রাজনৈতিক প্রভাব ও স্থানীয় স্বার্থান্বেষী মহলের বাধার মুখে প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়।

সম্প্রতি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জ্বালানি উপদেষ্টার বিশেষ হস্তক্ষেপে প্রকল্পটিতে গতি আসে। বিএসসি ভবনের ভাড়ার মেয়াদ শেষ হওয়া ও সেখানে সংস্কারকাজ চলায় বর্তমানে নির্মাণাধীন ভবনের দ্বিতীয় থেকে পঞ্চম তলা পর্যন্ত বিপিসির দাপ্তরিক কার্যক্রম স্থানান্তর করা হয়েছে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বর্তমানে নির্মাণাধীন ভবনের দ্বিতীয় থেকে পঞ্চম তলা পর্যন্ত বিপিসির দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। বিপিসির আশা, আগামী এক মাসের মধ্যে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম ড্রাইডক কতৃপক্ষ নির্মাণকাজ শেষ করে ভবনটি আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা সম্ভব হবে।

আধুনিক প্রযুক্তির অবকাঠামো ও নির্মাণগত তদারকি

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) ও পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নিয়ে বাস্তবায়ন করা এই স্টিল স্ট্রাকচার ভবনে থাকছে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও সুযোগ-সুবিধা:

সুবিধার খাত বিবরণ
নির্মাণকারী ও তদারক প্রতিষ্ঠান নৌবাহিনীর অধীনস্থ চট্টগ্রাম ড্রাই ডক লিমিটেড (ঠিকাদার) এবং মডার্ন ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন (পরামর্শক)।
প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্য তুলনামূলক দ্রুত নির্মাণযোগ্য স্টিল স্ট্রাকচার, যার নির্মাণব্যয় সাধারণ আরসিসির চেয়ে ১.৫ থেকে ১.৭ গুণ বেশি।
আধুনিক সুবিধাদি ৩-৪ শত ধারণক্ষমতার হলরুম, সেন্ট্রাল এসি, অগ্নিনিরাপত্তা, সোলার প্যানেল, অ্যাক্সেস কন্ট্রোল ও পৃথক বোর্ডরুম।
পরিদর্শন ব্যবস্থা বিপিসির নিজস্ব উচ্চপর্যায়ের মনিটরিং টিম ও পরিকল্পনা-উন্নয়ন বিভাগের কর্মকর্তাদের রোস্টারভিত্তিক নিয়মিত তদারকি।

সাময়িক ত্রুটি ও কারিগরি বাস্তবতা

ষষ্ঠ তলার নির্মাণকাজ চলমান থাকায় বৃষ্টির পানি পড়া ও প্লাস্টার-স্টিলের সংযোগস্থলে সূক্ষ্ম ফাটল (হেয়ারলাইন ক্র্যাক) নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, সে বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ও প্রকৌশলীদের মতামত স্পষ্ট।

বিপিসির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ভবনের কাজ শেষ হওয়ার আগে সব ধরনের ত্রুটি চিহ্নিত করে সংশোধনের সুযোগ রয়েছে। ফলে হস্তান্তরের আগে নির্মাণকাজের সব ত্রুটি ড্রাইডক কতৃক যথাযথভাবে সংশোধন ও পরীক্ষা করে নেওয়া হবে।

প্রকৌশলীদের মতে, নির্মাণাধীন ভবনে পানি পড়া বা ইটের গাঁথুনি, প্লাস্টার ও স্টিলের সংযোগস্থলে সূক্ষ্ম ফাটল দেখা দিতে পারে। এসব ক্ষেত্রে প্রকৃত কারণ নির্ধারণ করে প্রয়োজনীয় মেরামত করা জরুরি।

তাদের মতে, ভবন হস্তান্তরের আগে ত্রুটি সংশোধন করে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। অন্যথায় পরবর্তীতে ত্রুটির দায়-দায়িত্ব নির্ধারণ ও ডিফেক্ট লায়াবিলিটি পিরিয়ড নিয়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে।

বিপিসির কর্মকর্তাদের দাবি, নতুন ভবনটি আধুনিক স্টিল স্ট্রাকচার প্রযুক্তিতে নির্মিত হচ্ছে। এতে থাকবে লিফট, কেন্দ্রীয় শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা, সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা, নিরাপত্তা ও এক্সেস কন্ট্রোল।

এ ছাড়া বোর্ডরুম, পৃথক সভাকক্ষ, কর্মকর্তা-কর্মচারী সংগঠনের জন্য কক্ষ এবং ৩০০ থেকে ৪০০ মানুষের ধারণক্ষমতার হলরুমসহ বিভিন্ন আধুনিক সুবিধা থাকবে।

প্রকৌশল সংশ্লিষ্টদের মতে, স্টিল স্ট্রাকচারের অন্যতম সুবিধা হলো তুলনামূলক কম সময়ে নির্মাণ করা যায়। ভবিষ্যতে নকশায় পরিবর্তন এনে সম্প্রসারণের সুযোগও থাকে। তবে সাধারণ আরসিসি ভবনের তুলনায় এর নির্মাণ ব্যয় প্রায় ১ দশমিক ৫ থেকে ১ দশমিক ৭ গুণ বেশি হতে পারে।

অর্থাৎ সরকারি অর্থে নির্মিত এই ভবনের ক্ষেত্রে শুধু দ্রুত নির্মাণ নয়, দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব, নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

প্রশ্ন উঠছে-বিপিসির প্রধান কার্যালয় কি চট্টগ্রামেই থাকবে?

ভবন নির্মাণের পাশাপাশি এখন চট্টগ্রামে বিপিসির প্রধান কার্যালয়ের ভবিষ্যৎ অবস্থান নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে।

চট্টগ্রামের কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি ও সংশ্লিষ্টদের দাবি, একটি মহল বিভিন্ন অজুহাতে বিপিসির প্রধান কার্যালয় ঢাকায় স্থানান্তরের চেষ্টা করছে। তাদের বক্তব্য, বিপিসির অধীন আটটি তেল বিপণন ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা চট্টগ্রামে রয়েছে।

দেশে আমদানি করা জ্বালানি তেলের বড় অংশ চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে খালাস হয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হয়। ফলে জ্বালানি খাতের নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিপিসির প্রধান কার্যালয় চট্টগ্রামে থাকা প্রশাসনিক ও কার্যকরী-দুই দিক থেকেই যৌক্তিক বলে মনে করেন তারা।

তাদের আরও যুক্তি, সরকার যদি প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিকেন্দ্রীকরণকে গুরুত্ব দেয়, তাহলে চট্টগ্রামে থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয় ঢাকায় সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ সেই নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে।

বিশিষ্টজনদের মতে, ভবনের ছোটখাটো নির্মাণ ত্রুটিকে বড় করে দেখিয়ে অবকাঠামোটিকে প্রশ্নবিদ্ধ করার পেছনের মূল উদ্দেশ্য-বিপিসিকে ঢাকা নিয়ে যাওয়া।

তারা মনে করেন, প্রশাসনিক কাজের স্বার্থে ও রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের অপচয় রুখতে চিহ্নিত ত্রুটিগুলো দ্রুত দূর করে তড়িঘড়ি না করে শতভাগ মান নিশ্চিত পূর্বক ভবনটি বুঝে নেওয়াই এখন কর্তৃপক্ষের প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি