আমি ডিভোর্স দেবই: পরিবারের বাঁধা পেরিয়ে আদালতের দরজায় তরুণী

আদালত প্রাঙ্গণে নাটকীয় টানাহেঁচড়া-তুমুল হট্টগোল, ভিডিও ভাইরাল

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৭:৩৪

সামাজিক রীতিনীতি, পরিবারের তীব্র মানসিক চাপ আর চারপাশের অদৃশ্য শিকল-সবকিছু কাটিয়ে নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নিজের হাতে নেওয়ার সাহস কজন দেখাতে পারেন?

বনিবনা না হওয়া একটি সম্পর্কের বিষাক্ত চ্যাপ্টার বন্ধ করতে চেয়েছিলেন তানজিনা (ছদ্মনাম)। সিদ্ধান্ত ছিল পরিষ্কার ও সুনির্দিষ্ট-স্বামীর সঙ্গে আইনি পথে ছাড়াছাড়ি।

কিন্তু স্বাধীন সিদ্ধান্তের আইনি বাস্তবায়নে আদালত চত্বরে পা রাখতেই তরুণীকে মুখোমুখি হতে হলো নিজের পরিবারেরই হিংস্র ও মারমুখী রূপের।

যে পরিবারকে পাশে পাওয়ার কথা ছিল, সেই পরিবারই হয়ে উঠল আইনি অধিকার প্রয়োগের মূল বাধা।

যেকোনো মূল্যে স্বামীর সাথে সুখে-শান্তিতে ঘর করতে হবে-পরিবারের এই চাপিয়ে দেওয়া দর্শনে সায় দেননি তানজিনা।

নিজের সিদ্ধান্তে অটল থেকে সব বাধা ঠেলে রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) দুপুরে তিনি পৌঁছান চট্টগ্রাম আদালত প্রাঙ্গণে। তবে সেখানেই অপেক্ষা করছিল এক শ্বাসরুদ্ধকর ও অনাকাঙ্ক্ষিত নাটকীয়তা।

ঘটনার সূত্রপাত রবিবার (২৭ সেপ্টেম্বর) সকালে। আইনি প্রক্রিয়ায় স্বামীকে ডিভোর্স দেওয়ার উদ্দেশ্যে তানজিনা আদালতে হাজির হলে সেখানে উপস্থিত হয় তাঁর নিজের পরিবারসহ উভয়পক্ষের সদস্যরা। উদ্দেশ্য একটাই-যেকোনো মূল্যে এই ডিভোর্স আটকানো।

শুরুতে চাপ সৃষ্টিকারী বাক্যবিনিময় ও তুমুল কথাকাটাকাটি হলেও তরুণীকে সিদ্ধান্ত থেকে চুল পরিমাণ নড়ানো যায়নি।

একপর্যায়ে মেজাজ হারিয়ে তাহমিদার ওপর চড়াও হন তাঁর বাবা, ভাই ও মা। যুক্তি যখন হেরে যায়, তখন সেখানে স্থান পায় বলপ্রয়োগ।

আইনি বিচারালয়ের দ্বারপ্রান্তেই নিজের মেয়েকে চড়াও হয়ে জোরপূর্বক একটি সাদা মাইক্রোবাসে তুলে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চালান স্বজনরা।

আর্তচিৎকার, ‘অপহরণ’ গুজব ও জনরোষ
একজন তরুণীকে প্রকাশ্যে বেশ কয়েকজন মিলে জোর করে গাড়িতে তোলার দৃশ্য দেখে মুহূর্তে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে আদালতপাড়ায়। তানজিনার তীব্র আর্তচিৎকারে কেঁপে ওঠে চারপাশ। উপস্থিত সাধারণ পথচারী ও আইনজীবী সহকারী অনেকেই তখন ধরে নেন এটি কোনো সংগঠিত ‘অপহণের’ ঘটনা।

মেয়েটির বাঁচাও আকুতি শুনেই তৎক্ষণাৎ সাধারণ জনতা এগিয়ে এসে গাড়ি ঘেরাও করে এবং পরিবারকে বাধা দেয়। মুহূর্তে আদালত চত্বর রূপ নেয় এক অরাজক পরিস্থিতি ও তুমুল হট্টগোলে।

পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে, অনাকাঙ্ক্ষিত কাজে জড়িত থাকার অভিযোগে ক্ষুব্ধ জনতা ঘটনাস্থল থেকেই দুজনকে আটকে রাখে। পরবর্তীতে জনরোষ প্রশমিত করে দুই পক্ষকেই থানার মাধ্যমে বিষয়টির সুরাহা করার পরামর্শ দেন উপস্থিত প্রবীণরা।

সোশ্যাল মিডিয়ায় ভিডিও ভাইরাল: সমাজব্যবস্থার এক প্রতিচ্ছবি
ঘটনার আকস্মিকতায় সেখানে থাকা উপস্থিত অনেকেই পুরো টানাহেঁচড়ার ভিডিও ধারণ করেন মোবাইল ফোনে। মুহূর্তের মধ্যেই সেই ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে ভাইরাল রূপ নেয়।

নেটিজেনদের বড় অংশই তরুণীর সাহসী পদক্ষেপের প্রশংসার পাশাপাশি প্রকাশ্যে এমন বলপ্রয়োগের ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছেন।

অনেকের মতে, এই ভিডিওটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং নারী স্বাধীনতা ও নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে আমাদের সমাজ কাঠামোর চরম মনস্তাত্ত্বিক বাধারই এক নগ্ন প্রতিচ্ছবি।

পুরো ঘটনা নিয়ে আলোড়ন সৃষ্টি হলে বিষয়টি নজর এড়ায়নি কোতোয়ালী থানা পুলিশের। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জাহেদুল কবির ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, এটি মূলত ডিভোর্স সংক্রান্ত পারিবারিক দ্বন্দ্বের জেরে ঘটে যাওয়া ঘটনা।

মেয়েটি স্বামীকে আইনি প্রক্রিয়ায় ডিভোর্স দিতে চাইলেও তাঁর পরিবার এতে অনৈতিকভাবে বাধা দিচ্ছিল। কথা না শুনে মেয়েটি আজ কোর্টে এলে তাঁর পরিবার তাঁকে বলপ্রয়োগ করে গাড়িতে তুলে বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে।

তবে মেয়েটি চিৎকার-চেঁচামেচি করলে উপস্থিত জনসাধারণ তাতে বাধা প্রদান করে এবং বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়।

তিনি আরও স্পষ্ট করেন, খবর পাওয়ার পরপরই পরিস্থিতি পর্যালোচনার জন্য আদালত এলাকায় পুলিশি পর্যবেক্ষণ দল পাঠানো হয়েছে।

তবে দুজনকে আনুষ্ঠানিকভাবে আটকের যে তথ্য ছড়ানো হয়েছে, তা পুরোপুরি সঠিক নয়। ভুক্তভোগী তরুণী, তাঁর স্বামী কিংবা পরিবারের পূর্ণাঙ্গ পরিচয় পাওয়া সাপেক্ষে আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

আইনের আশ্রয় নিতে গিয়ে খোদ নিজের পরিবারের হাতে আক্রান্ত হওয়ার এই ঘটনা আদালত প্রাঙ্গণে চরম চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।

জোর করে সুখে রাখার এই অদ্ভুত সামাজিক প্রয়াস আদৌ কোনো যৌক্তিক পথ দিতে পারে কি না-চট্টগ্রামের আদালত চত্বরের আজকের এই ঘটনা নতুন করে সেই প্রশ্নই তুলে দিল।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি