নিরীহ প্রতিবেশীকে ফাঁসাতে ভুয়া ইনজুরি রিপোর্টে জামিন অযোগ্য ধারায় সাজানো মামলা

চমেকের বেড দখল ও ভুয়া রিপোর্টে প্রতিপক্ষকে জেলে পাঠানোর চক্রান্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ০৫ অক্টোবর, ২০২৬ ০১:২৪

সীমানা প্রাচীর ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিতে গিয়ে হাতে পান সামান্য আঘাত। অথচ সেই সামান্য ইনজুরিকেই পুঁজি করে হাসপাতাল ও চিকিৎসকদের ‘ম্যানেজ’ করে সাজানো হলো গুরুতর শারীরিক নির্যাতনের এক ভয়াবহ চিত্রনাট্য।

শুধু তা-ই নয়, তৈরি করা হয়েছে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের ইনজুরি রিপোর্টের ভুয়া নথি ও জাল ছবি।

পরবর্তীতে সেই কাল্পনিক জখমের কাগজপত্র আদালতে দাখিল করে প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে দায়ের করা হলো জামিন অযোগ্য ধারার ফৌজদারী মামলা।

সীতাকুণ্ডের উত্তর কেদারখীল গ্রামে ঘটে যাওয়া এই চাঞ্চল্যকর ঘটনায় বাদী মো. আনোয়ার হোসেন ও তার স্ত্রী নাজমা আকতারের বিরুদ্ধে বিচারব্যবস্থা ও আদালতকে বিভ্রান্ত করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।

সরেজমিনে তদন্ত ও হাসপাতালের প্রাথমিক নথিপত্র এবং হাসপাতাল বেডে ধারণকৃত একাধিক ভিডিও ফুটেজ পর্যালোচনায় বেরিয়ে এসেছে পুরো ঘটনাটির ভয়াবহ জালিয়াতির চিত্র।

প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, গত ২২ সেপ্টেম্বর বিবাদীর সীমানা প্রাচীর জোরপূর্বক ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়ার সময় নিজের হাতে আঘাত পান মামলার বাদী মো. আনোয়ার হোসেনের স্ত্রী নাজমা আকতার (৪৫)। দেয়াল ও ইটের চাপে তার হাতে সামান্য ছিলে যাওয়া বা ব্যথাজনিত আঘাত প্রাপ্তি ঘটে।

অভিযোগ রয়েছে, পরবর্তীতে সীতাকুণ্ড উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ইমাজেন্সিতে কর্তব্যরত চিকিৎসককে অসাধু উপায়ে প্রভাবিত করে চমেক হাসপাতালে স্থানান্তরিত (রেফার) হওয়ার প্রেসক্রিপশন জোগাড় করা হয়।

এরপর চমেক হাসপাতালের ২৬ নম্বর ওয়ার্ডের ৭৬-এ (জি-১) নম্বর বেডে ভর্তি হয়ে সামান্য হাতের ব্যথাকে ‘গুরুতর প্রাণঘাতী আঘাত’ হিসেবে চালিয়ে দেওয়া হয়।

দীর্ঘদিন হাসপাতালের বেড দখল করে রাখা এবং ওয়ার্ড ইনচার্জের সহায়তায় অবস্থান নিশ্চিত করার মূল উদ্দেশ্য ছিল আদালতে জখমের গুরুত্ব প্রমাণ করা।

এই ভুয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই পরবর্তীতে সীতাকুণ্ড মডেল থানার সি.আর. মামলা নম্বর-০২/২০২৬ (ধারা: ৩২৫/৩২৬/৩০৭/৫০৬(২)/৩৪ পেনাল কোড) দায়ের করে নিরীহ প্রতিবেশীদের গ্রেপ্তার ও হয়রানি করার ষড়যন্ত্র চালানো হচ্ছে।

সরেজমিনে অনুসন্ধান করতে গিয়ে দেখা যায়, মামলার মূল আরজি এবং প্রাথমিক চিকিৎসা সনদের মধ্যে একাধিক গুরুতর অসঙ্গতি ফুটে উঠে।

মামলার অভিযোগে ৬ ও ১২ নম্বর অনুচ্ছেদে দাবি করা হয়েছে, ১নং আসামি কিরিচ দিয়ে মাথায় কোপ দেয় এবং ২নং আসামি ইট দিয়ে আঘাত করে ‘Scalp Lacerated Wound’ তৈরি করে।

তবে সীতাকুণ্ড উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও চমেক হাসপাতালের ইমার্জেন্সি প্রাথমিক চিকিৎসা খাতায় মাথায় কোনো আঘাত বা রক্তপাতের ন্যূনতম আলামত ছিল না। যা প্রতিবেদকের হাতে আসা বেশ কয়েকটি ভিডিও ফুটেজে অনেকটাই স্পস্ট। মূলত আদালতের সহানুভূতি পেতে একটি ভুয়া এক্সরে-ছবি ও ম্যানিপুলেট করা জখম সংক্রান্ত কাগজ তৈরি করে দাখিল করা হয়।

অভিযোগে আরও উল্লেখ রয়েছে কিরিচের কোপ ঠেকাতে গিয়ে আঙুল প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। অথচ প্রকৃত পক্ষে ঘটনাটি ঘটেছিল দেয়াল ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়ার সময় ইটের চাপে। সামান্য ছিলে যাওয়া আঘাতকে রামদার কোপ হিসেবে রঞ্জিত করা হয়েছে। ধাক্কা দিয়ে দেয়াল ফেলে দেওয়ার প্রকৃত ভিডিও ফুটেজও রয়েছে প্রতিবেদকের কাছে।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে আসামিদের কারাবন্দী এবং দ্রুত জামিন রোধ করতে পেনাল কোডের ৩০৭ (হত্যার চেষ্টা) এবং ৩২৬ (মারাত্মক অস্ত্র দিয়ে গুরুতর জখম) ধারা যুক্ত করতে ধারালো অস্ত্রের কোপ ও মাথায় আঘাতের ভিত্তিহীন গল্প সাজানো হয়েছে।

অথচ অনুসন্ধান বলছে, ঘটনার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে (২১ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায়) থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা এবং তার পরপরই হুবহু একই ধারায় আক্রমণের দাবি করা প্রমাণ করে এটি প্রতিপক্ষকে আইনি ফাঁদে ফেলার এক সুসংগঠিত ব্লু-প্রিন্ট।

ঘটনা সম্পর্কে মামলার বাদী মো. আনোয়ার হোসেনের মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও সংযোগ পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে তার বক্তব্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনে সংযুক্ত করা হবে।

তবে এ বিষয়ে চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সহ-সভাপতি ও চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট আব্দুস সাত্তার বলেন, বাদী প্রাথমিক চিকিৎসা নিতে সীতাকুণ্ড হাসপাতালে গেলে সেখানকার ইমার্জেন্সি প্রেসক্রিপশনে ‘হেড ইনজুরি’ বা মাথায় আঘাতের কোনো উল্লেখ ছিল না।

এমনকি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের ইমার্জেন্সি অ্যাসেসমেন্টেও কোনো হেড ইনজুরির আলামত পাওয়া যায়নি। অথচ আদালতে একটি সম্পূর্ণ ভুয়া ‘মাথায় গুরুতর জখমের’ ছবি দাখিল করে বিচারককে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে। যা অত্যন্ত নজিরবিহীন ও বিচারব্যবস্থার ওপর আঘাত।

এদিকে বিষয়টি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দিনকে অবগত করলে তিনি ঘটনাটির গুরুত্ব ও ভয়াবহতা অনুধাবন করে প্রতিবেদককে বলেছেন, বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে দেখা হবে। ভুয়া মেডিকেল রিপোর্ট তৈরি বা বেড দখলের মতো কোনো অনিয়ম বা অসদুপায় অবলম্বনের প্রমাণ পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ঘটনার বিষয়ে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সীতাকুণ্ড মডেল থানার এসআই (নিরস্ত্র) মো. নজরুল ইসলাম বলেন, আদালতের নির্দেশে থানায় মামলা রুজু করা হয়। পরবর্তীতে এক নম্বর আসামিকে গ্রেপ্তার করে আদালতে প্রেরণ করা হয়। মেডিকেল রিপোর্ট এর জন্য আবেদন করা হয়েছে এবং ঘটনাটি তদন্ত অব্যাহত রয়েছে বলে জানান এসআই নজরুল।

পারিবারিক সীমানা বিরোধ ও যাতায়াতের রাস্তা নিয়ে দীর্ঘদিনের শত্রুতাকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার এই প্রবণতা আইন ও বিচার ব্যবস্থার জন্য চরম হুমকি।

স্থানীয় সুশীল সমাজ ও আইনজীবীদের মতে, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে এই ভুয়া মেডিকেল সার্টিফিকেট তৈরি চক্রের মূল উৎপাটন করা জরুরি।

একইসঙ্গে আদালতকে বিভ্রান্ত করে নিরীহ পরিবারকে হয়রানির দায়ে মিথ্যা মামলাকারীদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির সংশ্লিষ্ট ধারায় আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী পরিবার।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি