দেশজুড়ে সড়ক দুর্ঘটনার ভয়াবহতার তালিকায় রাজধানীর পরেই অবস্থান করছে ঐতিহ্যবাহী চট্টগ্রাম বিভাগ। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের সর্বশেষ সেপ্টেম্বর মাসের প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, সারাদেশের মোট প্রাণহানির প্রায় সাড়ে ১৭ শতাংশই ঘটেছে এই বিভাগে।
রোববার (৪ অক্টোবর) প্রকাশিত রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের মাসভিত্তিক সড়ক দুর্ঘটনাবিষয়ক প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে সারাদেশে ৪৪২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪২৩ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ৭৩ জন নারী ও ৬১ জন শিশু রয়েছেন।
চট্টগ্রামে মৃত্যুর সাড়ে ১৭ শতাংশ: বিভাগভিত্তিক প্রাণহানি ও দুর্ঘটনার হিসেবে সারাদেশের শীর্ষে রয়েছে ঢাকা বিভাগ (২৯.৮৬% দুর্ঘটনা, ৩১.৬৭% মৃত্যু)। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, তালিকার ঠিক দ্বিতীয় স্থানেই অবস্থান করছে চট্টগ্রাম বিভাগ।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে সারাদেশে ঘটে যাওয়া মোট দুর্ঘটনার ১৭.৮৭ শতাংশই ঘটেছে চট্টগ্রাম বিভাগে। এতে সারাদেশে মোট প্রাণহানির ১৭.৭৩ শতাংশই (যা সংখ্যায় প্রায় ৭৫ জনেরও বেশি) চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন সড়ক, মহাসড়ক ও আঞ্চলিক রাস্তায় ঘটেছে।
অন্যদিকে খুলনায় ১৭.৪২%, রাজশাহীতে ১২.২১%, ময়মনসিংহে ৭.২৩%, রংপুরে ৫.৬৫%, বরিশালে ৫.২০% এবং সিলেটে সবচেয়ে কম ৪.৫২% দুর্ঘটনা ঘটেছে।
কীভাবে ঘটছে এসব দুর্ঘটনা? পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশজুড়ে দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে আঞ্চলিক সড়ক ও জাতীয় মহাসড়কগুলো। মোট দুর্ঘটনার ৪০.২৭ শতাংশ আঞ্চলিক সড়কে এবং ৩২.৮০ শতাংশ জাতীয় মহাসড়কে সংঘটিত হয়েছে।
দুর্ঘটনার মূল কারণ হিসেবে দেখা গেছে বেপরোয়া গতি ও যানবাহনের নিয়ন্ত্রণ হারানো। মোট দুর্ঘটনার ৩৮ শতাংশ ঘটেছে কেবল নিয়ন্ত্রণ হারানোর কারণে।
এছাড়া পথচারীকে চাপা বা ধাক্কা দেওয়া (২৪.৬৬%), মুখোমুখি সংঘর্ষ (২২.১৭%) এবং পেছনে আঘাত করার (১৩.৮০%) কারণে অধিকাংশ প্রাণহানি ঘটেছে।
বাইক ও পথচারীদের ওপর সবচেয়ে বড় আঘাত: নিহতদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৩২.৮৬ শতাংশ (১৩৯ জন) মোটরসাইকেল চালক ও আরোহী। এ ছাড়া ১০৬ জন পথচারী নিহত হয়েছেন, যা মোট মৃত্যুর ২৫.৫ শতাংশ। থ্রি-হুইলার যাত্রী ৮৮ জন, বাস যাত্রী ২৬ জন, প্রাইভেটকার-মাইক্রোবাসের ২১ জন এবং অন্যান্য যানবাহনের যাত্রী ও চালক প্রাণ হারিয়েছেন।
পেশাগত পরিচয়ে নিহতদের তালিকায় ৫৮ জন শিক্ষার্থী, ২৫ জন ব্যবসায়ী, ২৪ জন রাজনৈতিক নেতাকর্মী, ২১ জন পণ্য বিক্রয় প্রতিনিধি, ১৮ জন এনজিও কর্মী, ১৩ জন শিক্ষকসহ বিভিন্ন শ্রেণীর পেশাজীবী ও সাধারণ মানুষ রয়েছেন।
সড়কের পাশাপাশি নৌ ও রেলপথেও মৃত্যু:
সেপ্টেম্বর মাসে সড়কের পাশাপাশি অন্যান্য রূপান্তরের মাধ্যমেও প্রাণহানি বেড়েছে। সারাদেশে ১১টি নৌ-দুর্ঘটনায় ১৬ জন নিহত ও ৪ জন নিখোঁজ রয়েছেন। একই সময়ে ২৩টি রেল ট্র্যাকিং দুর্ঘটনায় ১৯ জন প্রাণ হারিয়েছেন।
সমাধানের পথ ও সুপারিশ:
প্রতিটি দিন গড়ে ১৪ জন মানুষের জীবন কেড়ে নেওয়া এই অকাল মৃত্যু রোধে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন জরুরি কিছু পদক্ষেপের সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে।
যেমন, গতি নিয়ন্ত্রণে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার ও নজরদারি। জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিল পুনর্গঠন এবং বিআরটিএ ও বিআরটিসির কাঠামোগত সংস্কার। মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহনের জন্য আলাদা সার্ভিস রোড তৈরি। মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন রাস্তা থেকে প্রত্যাহার করা। চালকদের জন্য নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা, মানসম্মত বেতন ও নিয়মিত শারীরিক পরীক্ষা নিশ্চিত করা।
নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সঠিক সময়োপযোগী নীতি, প্রযুক্তির প্রয়োগ এবং সর্বোপরি সরকারের শক্তিশালী রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর জোর দিয়েছে সংস্থাটি।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি


