সড়কে মৃত্যুর মিছিল: জুনে ঝরল ৪৩৮ প্রাণ, এক-তৃতীয়াংশই মোটরসাইকেলে

প্রকাশিত: ০৫ জুলাই, ২০২৬ ১৩:৫৪

গত জুন মাসজুড়ে দেশের সড়কগুলো যেন হয়ে উঠেছিল এক একটি প্রকাশ্য মৃত্যুর ফাঁদ। সাধারণ পথচারী থেকে শুরু করে শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, এমনকি ভিনদেশি নাগরিক-কেউ রেহাই পাননি সড়কের এই নির্মমতা থেকে।

সদ্য সমাপ্ত জুন মাসে দেশজুড়ে ৪৭২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ঝরে গেছে ৪৩৮টি তাজা প্রাণ। আর পঙ্গুত্ব কিংবা ক্ষত নিয়ে হাসপাতালের বিছানায় দিন কাটছে ৫৬১ জনের।

রোববার রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের প্রকাশিত মাসিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে সড়ক নামক এই ‘নীরব মহামারি’র ভয়াবহ চিত্র।

দেশের ৯টি জাতীয় দৈনিক, ১৭টি অনলাইন নিউজ পোর্টাল, ইলেকট্রনিক গণমাধ্যম এবং সংস্থার নিজস্ব তথ্যের ভিত্তিতে এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে।

প্রতিবেদনের সবচেয়ে মর্মস্পর্শী দিক হলো, নিহতদের মধ্যে ৪৪ জন নারী ও ৫৬ জন অবুঝ শিশু। যে মায়েরা সংসারের হাল ধরেছিলেন কিংবা যে শিশুরা বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে কেবল বড় হতে শুরু করেছিল, তাদের যাত্রা থেমে গেছে মাঝপথেই।

এছাড়া জীবিকার তাগিদে রাস্তায় নামা ৫৭ জন চালক ও চালকের সহকারীও প্রাণ হারিয়েছেন এই এক মাসে।

পরিসংখ্যান বলছে, জুনে মোট নিহতের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার শিকার। মাসটিতে ১৪৫টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১৩৪ জন, যা মোট নিহতের ৩০ দশমিক ৫৯ শতাংশ।

তরুণদের বেপরোয়া গতি আর ট্রাফিক আইনকে বুড়ো আঙুল দেখানোর চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে পরিবারগুলোকে।

যানবাহনভিত্তিক অন্যান্য তথ্যে দেখা যায়, থ্রি-হুইলারের যাত্রী ১১২ জন, ট্রাক-পিকআপ-ট্রলির আরোহী ৩৭ জন, বাসযাত্রী ২৭ জন এবং প্রাইভেটকার-মাইক্রোবাসের ১৪ জন যাত্রী নিহতের তালিকায় রয়েছেন।

এমনকি বাদ যায়নি রিকশা বা বাইসাইকেলের মতো ধীরগতির বাহনও, যেখানে প্রাণ গেছে ৮ জনের।

সবচেয়ে চমকপ্রদ ও আশঙ্কাজনক তথ্য মিলেছে সময়ভিত্তিক বিশ্লেষণে। সাধারণত ভাবা হয় রাতে দুর্ঘটনা বেশি ঘটে, কিন্তু জুনে দেখা গেছে উল্টো চিত্র।

সবচেয়ে বেশি-৩১ দশমিক ৩৫ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটেছে সকালে। কর্মব্যস্ততা শুরুর এই সময়েই যেন সড়কে লুকিয়ে থাকে সবচেয়ে বড় বিপদ।

এছাড়া রাতে ১৯ দশমিক ২৭ শতাংশ এবং দুপুরে ১৭ দশমিক ৫৮ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটেছে।

আঞ্চলিক সড়কগুলো এখন মহাসড়কের চেয়েও বেশি বিপজ্জনক হয়ে উঠছে।

জুন মাসে সর্বোচ্চ ১৯৪টি দুর্ঘটনা ঘটেছে আঞ্চলিক সড়কে, যেখানে জাতীয় মহাসড়কে ঘটেছে ১৫১টি। এর বাইরে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুর্ঘটনার সংখ্যা সবচেয়ে বেশি-২০৬টি।

বিভাগীয় চিত্রে শীর্ষে ঢাকা ভৌগোলিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি রক্তক্ষরণ হয়েছে ঢাকা বিভাগে। এখানে ১১৬টি দুর্ঘটনায় ১১৮ জন নিহত হয়েছেন।

দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা চট্টগ্রাম বিভাগে প্রাণ হারিয়েছেন ১১৩ জন। অন্যদিকে সবচেয়ে কম প্রাণহানি ঘটেছে ময়মনসিংহ বিভাগে (১৬ জন)। খোদ রাজধানী ঢাকাতেই ৩২টি দুর্ঘটনায় ২৪ জন মানুষ চিরতরে হারিয়ে গেছেন।

নিহতদের পেশাগত পরিচয় বিশ্লেষণ করলে এক বুক হাহাকার জাগে। বিদ্যাপীঠে ফেরার তাগিদ থাকা ৫৮ জন শিক্ষার্থী জুনে লাশ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন।

এছাড়া ২৪ জন ব্যবসায়ী, ২১ জন রাজনৈতিক কর্মী, ১৩ জন ব্যাংক-বীমা কর্মকর্তা এবং ৪ জন শিক্ষক ও মসজিদের ইমাম রয়েছেন এই তালিকায়। এমনকি ১ জন চীনা নাগরিকও বাংলাদেশের সড়কে প্রাণ হারিয়েছেন।

কেবল সড়কেই নয়, জুনে মৃত্যু থাবা বসিয়েছে জল ও রেথপথেও। ৯টি নৌ-দুর্ঘটনায় ৭ জন এবং ২১টি রেলপথ দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১৮ জন।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশন তাদের বিশ্লেষণে কোনো রাখঢাক না রেখেই সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণগুলো আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে।

এর মধ্যে রয়েছে-ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন ও ভাঙাচোরা সড়ক। চালকদের বেপরোয়া গতি, অদক্ষতা এবং শারীরিক-মানসিক অসুস্থতা। নির্ধারিত কর্মঘণ্টা ও নিশ্চিত বেতনের অভাব (যা চালকদের অতিরিক্ত খাটার প্রতিযোগিতায় নামায়)। মহাসড়কে ধীরগতির যান চলাচল এবং তরুণদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল সংস্কৃতি এবং বিআরটিএর সক্ষমতার ঘাটতি এবং গণ-পরিবহন খাতে জেঁকে বসা চাঁদাবাজি।

প্রতিটি দুর্ঘটনার পর একটি সংখ্যা তৈরি হয়, কিন্তু সেই সংখ্যার আড়ালে হারিয়ে যায় একেকটি পরিবার, ভেঙে যায় হাজারো স্বপ্ন।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশন স্পষ্ট জানিয়েছে, কেবল শোক প্রকাশ বা তদন্ত কমিটি গঠন নয়, সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে এই চিহ্নিত সমস্যাগুলোর দ্রুত ও কঠোর সমাধান করতে হবে। অন্যথায়, সড়কের এই রক্তক্ষরণ থামানো অসম্ভব।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি