সিডিএর জমিতে দোকানপাট,বুলডোজারের ধাক্কায় চুরমার মইজ্জ্যারটেক!

অভিযানে গুঁড়িয়ে যায়; আবার গড়ায় নতুন সাম্রাজ্য

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ০৫ অক্টোবর, ২০২৬ ১৪:১৬

চট্টগ্রাম শহর ছুঁয়ে কর্ণফুলী উপজেলার প্রবেশদ্বার-মইজ্জ্যারটেক মোড়ে প্রতিদিনের মতো কোলাহল ছিল, কেনাবেচার হাঁকডাক ছিল।

ওয়েলফুডের সুবাস, চেমন ইস্পাতের সীমানা, কুলিং কর্নারের আড্ডা আর ঝুপড়ি দোকানের ব্যস্ততা-সব মিলিয়ে জমজমাট এক বাণিজ্যক্ষেত্র।

কিন্তু এই চকচকে বাণিজ্যের নিচে চাপা পড়ে ছিল এক দীর্ঘদিনের অভিযোগ-সবই গড়া হয়েছে সরকারি জমিতে, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) চোখের সামনেই, অনধিকার চর্চায়। হঠাৎ নীরবতা ভেঙে গর্জে উঠল সিডিএর ভারী এস্কেভেটর।

রোববার, ৫ অক্টোবর। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) স্পেশাল ম্যাজিস্ট্রেট ও যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ হামীমুন তানজীনের নেতৃত্বে শুরু হলো এক সাঁড়াশি অভিযান।

সঙ্গে ছিলেন সিডিএর মইজ্জারটেক প্রকল্পের প্রকল্প কর্মকর্তা ও নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ হাসান। আইনশৃঙ্খলার সুরক্ষায় কর্ণফুলী থানা পুলিশ ও স্পেশাল পুলিশের চৌকস দল, আর সাথে প্রায় ৪০ জন শ্রমিক।

শুরু হলো একের পর এক স্থাপনা ধূলিসাৎ করার পালা। আব্দুল মন্নানের দখলে থাকা নামি ব্র্যান্ড ওয়েলফুড থেকে শুরু করে এস আলমের চেমন ইস্পাত লিমিটেডের সীমানাপ্রাচীর-কোনো বড় নাম কিংবা প্রভাবের তোয়াক্কা করেনি সিডিএর এস্কেভেটর।

মুহূর্তের মধ্যে গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো অবৈধ কুলিং কর্নার, মুদির দোকান, বিকাশের এজেন্সির দোকান, গোপন গোডাউন, বেকারি এবং সড়কের ওপর জেঁকে বসা একের পর এক ঝুপড়ি দোকান। বছরের পর বছর ধরে অবৈধভাবে দখল করে রাখা সিডিএর জমি যেন এক নিমেষে মুক্ত বাতাসের মুখ দেখল।

অভিযানের তীব্রতা দেখে উপস্থিত পথচারীদের অনেকেই বলছিলেন, অবৈধ দখল তো উচ্ছেদ হলো, কিন্তু এই স্বস্তি কতদিনের?

অভিযান শেষে সিডিএর প্রকল্প কর্মকর্তা মোহাম্মদ হাসান দৃঢ় কণ্ঠে জানান, মইজ্জারটেক মোড়ের এই জংশনটি সম্পূর্ণ অবৈধ মুক্ত করা হয়েছে। শুধু এটাই শেষ নয়, পর্যায়ক্রমে এলাকার অন্যান্য সব অবৈধ স্থাপনাও একইভাবে উচ্ছেদ করা হবে।

তবে এই উচ্ছেদ অভিযানের ইতিহাস কিন্তু নতুন নয়। কর্ণফুলীর পুরাতন ব্রিজঘাট থেকে মইজ্জ্যারটেক পর্যন্ত সিডিএর জমিতে এস্কেভেটর চলার দৃশ্য স্থানীয়দের জন্য বেশ পরিচিত।

স্মৃতির পাতা ওল্টালে দেখা যায়, ২০২৩ সালের মে মাসে পুরাতন ব্রিজঘাট এলাকায় এক লহমায় উচ্ছেদ করা হয়েছিল প্রায় ২৫০টি অবৈধ স্থাপনা। তার ঠিক দুবছর পর ২০২৫ সালের মে মাসে আবারও উচ্ছেদের হাতল ঘোরে।

পুরাতন ব্রিজঘাট, সৈন্যরটেক, খুদ্যেরটেক, আজিমপাড়া ও মইজ্জ্যারটেক এলাকায় গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় দুই শতাধিক অবৈধ স্থাপনা। এমনকি একই সময়ে কালারপোল রোডে আরও তিন শতাধিক দোকান উচ্ছেদের খবর ছড়িয়ে পড়েছিল শিরোনামে শিরোনামে।

প্রতিটি অভিযানের পর সিডিএ প্রতিশ্রুতির সুর তোলে-ধারাবাহিক অভিযান চলবে, দখলদারদের ছাড় দেওয়া হবে না। কিন্তু ইতিহাস বলছে, অভিযানের ধুলোবালি থিতিয়ে গেলেই আবার সুযোগ বোঝে গজায় নতুন নতুন দোকান, আবার গড়ে ওঠে নতুন ক্ষমতার সীমানা।

রবিবারের এই বিশাল অভিযানের পর সাধারণ মানুষের প্রশ্ন একটাই-উচ্ছেদের চোর-পুলিশ খেলা কি চিরতরে থামবে? নাকি আবারও আইনের চোখ ফাঁকি দিয়ে নতুন কোনো ব্যানার টাঙানো হবে সরকারি জমিতে?

উচ্ছেদই যদি শেষ কথা না হয়, তবে এবার কি কার্যকর নজরদারির শক্ত প্রাচীর গড়ে তুলবে সিডিএ? উত্তর লুকিয়ে আছে সময়ের হাতে।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি