back to top

অর্থ আত্মসাৎ-পাচার: ইউসিবিএলের ২ সাবেক পরিচালক কারাগারে

প্রকাশিত: ৩১ মার্চ, ২০২৬ ১১:৫৩

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা ২৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ ও পাচারের মামলায় আত্মসমর্পণের পর ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের (ইউসিবিএল) দুই সাবেক পরিচালককে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) চট্টগ্রামের বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালতে আত্মসমর্পণ করেন ইউসিবিএলের সাবেক দুই পরিচালক অপরূপ চৌধুরী ও তৌহিদুল সিপার।

শুনানি শেষে আদালত তাদের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।

দুদকের আইনজীবী মোকাররম হোসাইন জানান, ঋণ অনুমোদনের আগে ব্যাংকের তদন্ত কমিটি প্রস্তাবটি ঝুঁকিপূর্ণ উল্লেখ করে ১৭টি নেতিবাচক কারণ তুলে ধরেছিল। কিন্তু সে সময়ের পরিচালনা পর্ষদ তা উপেক্ষা করে ঋণ অনুমোদন দেয়।

আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট রাশেদুল আলম বলেন, তার মক্কেলরা ইউসিবিএলের স্বাধীন পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

অপরূপ চৌধুরী সরকারি প্রশাসনের কর্মকর্তা এবং তৌহিদুল সিপার একটি বিদেশি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা ছিলেন। তারা আত্মসমর্পণের পর জামিন আবেদন করলেও আদালত তা নাকচ করেন।

এর আগে চলতি বছরের ১১ মার্চ একই আদালত এই মামলায় সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদসহ ৩৬ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে।

সেদিন গ্রেপ্তার থাকা ৮ জন ছাড়া বাকি আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়।

মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু করার জন্য আগামী ৫ এপ্রিল দিন নির্ধারণ করা হয়েছে। ওইদিন বাদীর সাক্ষ্যগ্রহণ হওয়ার কথা রয়েছে।

এর আগে ৭ জানুয়ারি চট্টগ্রামের সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালত দুদকের দাখিল করা অভিযোগপত্র গ্রহণ করেন।

তারও আগে ৫ জানুয়ারি মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা, দুদকের উপ-পরিচালক মো. মশিউর রহমান আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন।

ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবিএল) থেকে ২৫ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে পাচারের দায়ে গত বছরের ২৪ জুলাই দুদকের প্রধান কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মো. মশিউর রহমান চট্টগ্রাম জেলা কার্যালয়-১ মামলা দায়ের করেন।

মামলার আসামিরা হলেন-সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ, তার স্ত্রী ও ইউসিবিএল ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান রুকমীলা জামান (৪৬), ব্যাংকের পরিচালক আসিফুজ্জামান চৌধুরী (৪৬) ও বোন রোকসানা জামান চৌধুরী (৫৬), ইউসিবিএল ব্যাংকের সাবেক পরিচালক বশির আহমেদ (৫৫), আফরোজা জামান (৪৮), সৈয়দ কামরুজ্জামান (৬১), মো. শাহ আলম (৬২), মো. জোনাইদ শফিক (৬৪), অপরূপ চৌধুরী (৬৫), তৌহিদ সিপার রফিকুজ্জামান (৬৬), ইউনুছ আহমদ (৭৯), হাজী আবু কালাম (৭৯), নুরুল ইসলাম চৌধুরী (৬২) এবং সাবেক চেয়ারম্যান এম এ সবুর (৭৭) ও সাবেক ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরিফ কাদরী (৬৪), ইউসিবিএল ব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তা মোহাম্মদ একরাম উল্লাহ (৫১), আবদুল হামিদ চৌধুরী (৫০), আবদুর রউফ চৌধুরী, জিয়াউল করিম খান (৪৬), মোহাম্মদ আব্দুল আউয়াল (৫৮), মীর মেসবাহ উদ্দীন হোসাইন (৬২) ও বজল আহমেদ বাবুল (৫৬)। আরামিট গ্রুপের মোহাম্মদ ফরমান উল্লাহ চৌধুরী (৫১), কাজী মোহাম্মদ দিলদার আলম (৬৬), মোহাম্মদ মিছাবাহুল আলম (৫০), আব্দুল আজিজ (৩৯), মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম (৫৪), মেহাম্মদ হোছাইন চৌধুরী (৪৮), ইয়াছিনুর রহমান (৪৩), ইউছুফ চৌধুরী (৪৫) ও সাইফুল ইসলাম (৪৫)।

মামলায় অভিযোগ করা হয়, সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা আরামিটের কর্মকর্তাদের নামে পাঁচটি নামসর্বস্ব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খোলেন। এর মধ্যে একটি প্রতিষ্ঠানের নামে গম, ছোলা, হলুদ ও মটর আমদানির জন্য ১৮০ দিনের মধ্যে ফেরতযোগ্য ‘টাইম লোন’ আবেদন করেন।

নিজ পরিবারের মালিকানায় থাকা ইউসিবিএল ব্যাংকে এ আবেদন করা হয়। ইউসিবিএল থেকে ২৫ কোটি টাকা ঋণ মঞ্জুর হওয়ার পর সেই টাকা একই ব্যাংকে ঋণের অর্থ ‘নামসর্বস্ব’ চারটি প্রতিষ্ঠান—আলফা ট্রেডার্স, ক্লাসিক ট্রেডার্স, মডেল ট্রেডিং ও ইম্পেরিয়াল ট্রেডিং—এর হিসাবে পে-অর্ডারের মাধ্যমে স্থানান্তর করা হয়। পরে সেই অর্থ নগদে উত্তোলন করে বিভিন্নভাবে সরিয়ে নেওয়া হয়।

দুদকের দাবি, এই চক্র হুন্ডি ও হাওলা পদ্ধতিতে অর্থ প্রথমে সংযুক্ত আরব আমিরাতে এবং পরে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে পাচার করে। তদন্তে বিদেশে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার সম্পদের তথ্যও পাওয়া গেছে।

চট্টগ্রাম বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালত ইতোমধ্যে এই মামলায় অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দিয়েছেন। আগামী ৫ এপ্রিল থেকে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।

আসামিদের মধ্যে আরামিট পিএলসির এজিএম মো. আব্দুল আজিজ এবং তদন্তে সম্পৃক্ততা পাওয়ায় আরামিট পিএলসির আরেক এজিএম উৎপল পালকে গত বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর বুধবার রাতে নগরীর ডবলমুরিং থানা এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করেন দুদকের প্রধান কার্যালয়ের উপ-পরিচালক ও মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মো. মশিউর রহমান।

দুদকের চট্টগ্রাম সমন্বিত জেলা কার্যালয়-১ এর উপ-পরিচালক সুবেল আহমেদ জানিয়েছেন গ্রেপ্তারের পরদিন বৃহস্পতিবার তাদের আদালতে তোলা হয়েছে। দুদকের করা যে মামলায় জাবেদ ও রুকমীলা আসামি, সেই মামলায় আরামিট পিএলসির দুই এজিএম আব্দুল আজিজ ও উৎপল পালকে ৫ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে দুদক। ওই মামলায় আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছেন তারা।

অন্যদিকে গেল বছরের ২৪ সেপ্টেম্বর বিদেশে পলাতক সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান আরামিট গ্রুপের অফিসে অভিযান পরিচালনা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। চট্টগ্রাম নগরীর চান্দগাঁও থানাধীন কালুরঘাট ভারী শিল্প এলাকায় অভিযানের সময় ৮৩ লাখ ৭৬ হাজার ৭৩০ টাকাসহ আরামিট পিএলসির সহকারী মহাব্যবস্থাপক (এজিএম) জাহাঙ্গীর আলম নামে এক কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের বিষয়ে দুদকের আইনজীবী মোকাররম হোসেন বলেন, আরামিট গ্রুপের অফিসে অভিযান চালিয়ে নগদ টাকা ছাড়াও কিছু চেক বইয়ের মুড়ি উদ্ধার করা হয়।’

জানা গেছে, বিদেশে পলাতক সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের নামে ইস্যু করা ১১টি চেক ব্যবহার করে চারটি ব্যাংক থেকে ১ কোটি ৭৬ লাখ টাকা তুলে নেওয়া হয়।সাইফুজ্জামান চৌধুরীর সই করা চেকগুলোর আসল কপিসহ (মুড়ি) জাহাঙ্গীর আলমের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।

দুদক সূত্র জানায়, গত এক সপ্তাহের মধ্যে ইসলামী ব্যাংকের কয়েকটি শাখা থেকে এক কোটি টাকা, জনতা ব্যাংক থেকে ৩০ লাখ, সোনালী ব্যাংক থেকে ৩৬ লাখ ও মেঘনা ব্যাংক থেকে ১০ লাখ টাকা তোলা হয়। এর আগে অর্থপাচার মামলায় দুদকের হাতে গ্রেফতার শিল্পগোষ্ঠী আরামিট পিএলসি’র সহকারী মহাব্যবস্থাপক (এজিএম) মো. আব্দুল আজিজ ও উৎপল পালের আইনি লড়াইয়ের খরচ বহনের জন্য এ টাকা তোলা হয়েছে বলে দাবি করেছেন জাহাঙ্গীর আলম। তবে দুদক মনে করছে, নতুন করে এক কোটি ৭৬ লাখ টাকা উত্তোলনের সঙ্গেও আত্মসাৎ বা পাচারের যোগসূত্র রয়েছে।

২০১৯ সালের অক্টোবর থেকে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে এই অর্থ আত্মসাৎ ও পাচারের ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ রয়েছে।

এ মামলায় দণ্ডবিধির ৪০৬, ৪০৯, ৪২০, ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৭১ ও ১০৯ ধারা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন ও মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি