যে আনন্দ আর ঘরে ফিরতে দিল না মাহিদুলকে

গোলপোস্টের নিচেই থেমে গেল জীবন

প্রকাশিত: ০৩ জুলাই, ২০২৬ ১৫:৩১

খেলার মাঠ মানুষের আনন্দের জায়গা। সেখানে বাঁশির শব্দে শুরু হয় প্রতিযোগিতা, গোলে ফেটে পড়ে উল্লাস, আর খেলা শেষে সবাই ফিরে যায় নিজের জীবনের কাছে। কিন্তু কখনো কখনো একটি মাঠই হয়ে ওঠে জীবনের শেষ ঠিকানা।

চট্টগ্রাম নগরের হালিশহরের বেগমজান উচ্চবিদ্যালয় মাঠে শুক্রবার (৩ জুলাই) সকাল প্রায় ৮টার দিকে ঘটে তেমনি এক ঘটনা। যেখানে একটি তরুণ জীবনের আকস্মিক অবসান, একটি পরিবারের স্বপ্নভঙ্গ এবং নিরাপদ খেলার পরিবেশ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তোলার মতো এক মর্মান্তিক বাস্তবতা।

মাত্র ২০ বছরের মাহিদুল ইসলাম। পটুয়াখালী জেলার বাউফল উপজেলার কোনোপদিয়া গ্রামের রাসেল গাজীর ছেলে। জীবিকার তাগিদে বাড়ি ছেড়ে এসেছিলেন চট্টগ্রাম নগরে।

রংমিস্ত্রির কাজ করতেন। প্রতিদিন অন্যের ঘর-দেয়ালে নতুন রঙ তুলতেন, অথচ নিজের জীবনের ক্যানভাসটি এত দ্রুত ফাঁকা হয়ে যাবে, তা কেউ কল্পনাও করেনি।

সকালের ছুটির সময়টুকু ছিল বন্ধুদের সঙ্গে ফুটবল খেলার জন্য। স্থানীয় বেগমজান উচ্চবিদ্যালয় মাঠে খেলতে যান মাহিদুল। খেলায় তাঁর দলের জয় হয়। জয় মানেই উল্লাস, বন্ধুত্বের হাসি, আবেগ আর উদ্‌যাপন।

সেই উদ্‌যাপনের এক মুহূর্তেই ঘটে যায় সবকিছু। মাহিদুল গোলপোস্টের ওপরের লোহার ক্রসবারে লাফিয়ে ঝুলে পড়ার চেষ্টা করেন।

কিন্তু দীর্ঘদিনের পুরোনো ও জরাজীর্ণ গোলপোস্টটি তাঁর শরীরের ভার সহ্য করতে পারেনি। মুহূর্তের মধ্যে সেটি উপড়ে ভেঙে নিচে পড়ে যায়।

লোহার ভারী বারটি সরাসরি এসে আঘাত হানে তাঁর বুকে। মাঠের উল্লাস মুহূর্তেই থেমে যায়। যে মাঠ কয়েক সেকেন্ড আগেও জয়ের আনন্দে মুখর ছিল, সেটিই পরিণত হয় উৎকণ্ঠা আর অসহায় ছুটোছুটির দৃশ্যে।

দুলাভাই মো. রবিউল ও খালাতো ভাই মোহাম্মদ মনির দ্রুত তাঁকে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যান। কিন্তু চিকিৎসকদের পরীক্ষার পর জানানো হয়, মাহিদুল আর নেই।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির সহকারী ইনচার্জ সোহেল রানা জানান, গোলপোস্ট ভেঙে বুকের ওপর পড়ায় গুরুতর আঘাত ও অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণের কারণে মাহিদুলের মৃত্যু হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।

ময়নাতদন্ত শেষে প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে।

মাহিদুলের মৃত্যু এমন এক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি, যেখানে খেলার মাঠে ব্যবহৃত অবকাঠামোর নিরাপত্তা অনেক সময় অদেখাই থেকে যায়।

দীর্ঘদিনের পুরোনো ও জরাজীর্ণ গোলপোস্টটি যদি যথাসময়ে পরীক্ষা, মেরামত বা অপসারণ করা হতো, তাহলে কি এই প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব ছিল?

এই প্রশ্নের উত্তর এখন তদন্তের বিষয়, তবে এমন দুর্ঘটনা নিরাপত্তা ব্যবস্থার গুরুত্বকে নতুন করে সামনে নিয়ে আসে।

এদিকে পটুয়াখালীর কোনোপদিয়া গ্রামে অপেক্ষা করছে একটি পরিবার। তাঁদের কাছে মাহিদুল ছিলেন শুধু একজন উপার্জনক্ষম তরুণ নন, ছিলেন ভবিষ্যতের ভরসা।

রংমিস্ত্রির শ্রমে গড়া সেই স্বপ্নগুলো এখন থেমে গেছে একটি পুরোনো গোলপোস্টের নিচে।

একটি ফুটবল ম্যাচে জয় এসেছিল। কিন্তু সেই জয় আর ঘরে ফেরাতে পারেনি মাহিদুলকে।

হালিশহরের সেই মাঠে হয়তো আবারও খেলা হবে। আবারও গোল হবে, উল্লাস হবে, বাঁশি বাজবে।

কিন্তু শুক্রবার সকালের সেই দুর্ঘটনা মনে করিয়ে দেবে—খেলার আনন্দ কখনোই নিরাপত্তার চেয়ে বড় হতে পারে না।

একটি ভেঙে পড়া গোলপোস্ট শুধু একজন তরুণের জীবনই কেড়ে নেয়নি; ভেঙে দিয়েছে একটি পরিবারের স্বপ্ন, এক বাবার অপেক্ষা, স্বজনদের আশা আর বন্ধুদের হাসির স্মৃতিও।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি