একটি বন্ধ কক্ষ। ভেতরে চলছে মধ্যযুগীয় কায়দায় বর্বরতা। একজন সম্মানিত ব্যবসায়ীর আর্তচিৎকার দেয়াল ভেদ করে বাইরে পৌঁছাতে পারছে না।
অবর্ণনীয় শারীরিক যাতনা আর বলপ্রয়োগের মুখে বাধ্য হয়ে সই করতে হচ্ছে চেক ও স্ট্যাম্পে।
সভ্য সমাজে এমন একটি নির্মম ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ক্ষোভে ফুঁসে উঠেছে বরিশাল নগরী।
অবশেষে এই পৈশাচিক ঘটনার মূল অভিযুক্ত মোস্তাফিজুর রহমান লিটুকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
আজ রোববার বেলা ২টার দিকে নগরের সদর রোডের ‘টপ টেন’ নামের একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সামনে থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
বরিশাল কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আল মামুন উল ইসলাম বেলা ৩টার দিকে বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, এ ঘটনায় বিকেলে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হবে।
সিসিটিভি ফুটেজে বন্দি সেই শিউরে ওঠা মুহূর্ত
অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ২৭ জুন সন্ধ্যার পর নগরের সদর রোডে অবস্থিত অগ্রণী হাউজিং (আবাসন) লিমিটেডের কার্যালয়ে এই লোমহর্ষক ঘটনাটি ঘটে।
প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আব্দুল আজিজ হাওলাদার শনিবার রাতে তার কার্যালয়ের সিসিটিভি ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করলে মুহূর্তেই তা ভাইরাল হয়ে যায়।
ফুটেজে দেখা যায়, আব্দুল আজিজের কক্ষে হঠাৎ চার যুবক প্রবেশ করেন। তাদের মধ্যে মোস্তাফিজুর রহমান লিটু নামের এক যুবক কোনো কিছু না শুনেই আকস্মিকভাবে আব্দুল আজিজের ওপর চড়াও হন এবং মারধর শুরু করেন।
একপর্যায়ে চরম অমানবিক ও বর্বর কায়দায় তার অণ্ডকোষ চেপে ধরে দুটি চেক এবং একটি সাদা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর দিতে বাধ্য করা হয়।
তীব্র ব্যথায় ও আতঙ্কে আব্দুল আজিজ যখন ‘বাচ্চু, বাচ্চু’ বলে চিৎকার করে সাহায্য চাচ্ছিলেন, তখন অন্য এক ব্যক্তি কক্ষে প্রবেশের চেষ্টা করলেও লিটুর সহযোগীরা তাকে ধাক্কা দিয়ে বের করে দেয়।
এরপর জোরপূর্বক আদায় করা চেক ও স্ট্যাম্প হস্তান্তরের ছবিও তুলে নেয় হামলাকারীরা।
ভীষণ মানসিক ও শারীরিক যাতনার মধ্য দিয়ে গিয়েছেন ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী। বিচার পাওয়ার আশায় গত বৃহস্পতিবারই তিনি আদালতের দ্বারস্থ হন এবং একটি নালিশি মামলা দায়ের করেন।
আদালত মামলাটি এফআইআর হিসেবে গ্রহণের জন্য কোতোয়ালি মডেল থানার ওসিকে নির্দেশ দিয়েছেন।
নেপথ্যে কী ছিল?
ভুক্তভোগী আব্দুল আজিজ হাওলাদারের দাবি, লিটু একসময় অগ্রণী হাউজিংয়ের অংশীদার ছিলেন।
তবে তার বিনিয়োগের বিপরীতে তাকে যথাযথভাবে জমি বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং সেই জমি বিক্রিও করা হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানের কাছে লিটুর আর কোনো পাওনা নেই মর্মে একটি লিখিত অঙ্গীকারনামাও রয়েছে।
আজিজ বলেন, “সব হিসাব চুকে যাওয়ার পরও লিটু দীর্ঘদিন ধরে আমার কাছে এক কোটি টাকা দাবি করে আসছিল।
গত ২৭ জুন সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে সে দলবল নিয়ে আমার অফিসে ঢুকে আমাকে নির্মমভাবে মারধর করে।
জোর করে আমার কাছ থেকে ৭০ লাখ টাকার একটি চেক, একটি সাদা চেক এবং দুটি সাদা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেয়। ঘটনার পরপরই আমি ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি অবহিত করায় তারা কোনো টাকা তুলতে পারেনি।”
অভিযুক্তের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে ধোঁয়াশা
গ্রেপ্তার হওয়া মোস্তাফিজুর রহমান লিটুর বাড়ি অগ্রণী হাউজিংয়ের অদূরে কাটপট্টি সড়কে। তার বড় ভাই মাহবুবুর রহমান পিন্টু মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সভাপতি।
স্থানীয়ভাবে লিটু যুবদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত বলে গুঞ্জন থাকলেও আজ রোববার দুপুরে বরিশাল প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে জেলা ও মহানগর যুবদলের নেতারা তা জোরালোভাবে অস্বীকার করেছেন।
দলীয় নেতাদের দাবি, লিটু যুবদলের কোনো ওয়ার্ড কমিটিরও সদস্য নন এবং দলের কোনো কর্মসূচিতে তাকে কখনো দেখা যায়নি।
অভিযুক্ত ও পুলিশের বক্তব্য
গ্রেপ্তার হওয়ার আগে অবশ্য অভিযোগের বিষয়ে মোস্তাফিজুর রহমান লিটু নিজের মতো করে সাফাই গেয়েছিলেন।
তার দাবি, “যারা ওই দিন কার্যালয়ে গিয়েছিলেন, তারা সবাই প্রতিষ্ঠানের পরিচালক।
আব্দুল আজিজ পরিচালকদের টাকা আত্মসাৎ করেছেন। এ বিষয়ে পরিচালকেরা সংবাদ সম্মেলন করে বিস্তারিত জানাবেন।”
কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি মো. আল মামুন উল ইসলাম বলেন, “আব্দুল আজিজ শনিবার রাতে থানায় এসে আদালতে মামলা করার বিষয়টি মৌখিকভাবে জানিয়েছিলেন।
আদালতের আদেশের কপি আজ (রোববার) থানায় পৌঁছানোর কথা রয়েছে। আমরা আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিচ্ছি।”
একটি বাণিজ্যিক বিরোধের জেরে এভাবে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া এবং এক প্রবীণ ব্যবসায়ীর ওপর এমন অমানবিক নির্যাতন নগরীর আইনশৃঙ্খলা ও ব্যবসায়িক পরিবেশ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে।
ভুক্তভোগী ও সচেতন মহল এখন এই ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করছেন।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি

