দেশে কর্মীরা বিপাকে, দুবাইয়ে নেতার রাজকীয় বিয়ে: প্রশ্নের মুখে আব্দুস সবুর লিটন

নেটিজেনরা বলছেন, ১৭ বছরের লুটের টাকার আয়েশ

প্রকাশিত: ০৬ জুলাই, ২০২৬ ১৭:৩৪

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পতিত আওয়ামী লীগের সাধারণ কর্মী-সমর্থকেরা যখন আত্মগোপনে, ঠিক তখনই সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে বিলাসবহুল আয়োজনে গোপনে চতুর্থ বিয়ে সম্পন্ন করেছেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) সাবেক প্যানেল মেয়র ও ২৫ নম্বর রামপুরা ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর আব্দুস সবুর লিটন।

সম্প্রতি তাঁর এই জাঁকজমকপূর্ণ বিয়ের বেশে কিছু ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

বিশেষ করে, হালিশহর থানা আওয়ামী লীগের সাবেক এই সভাপতির এমন রাজকীয় জীবনযাপন দেখে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করছেন দলটির তৃণমূলের নেতাকর্মীরা।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবি ও ভিডিওতে দেখা যায়, বরবেশী আব্দুস সবুর লিটন এবং কনে একই রঙের রাজকীয় পোশাকে সজ্জিত। কেক কাটা এবং ফুল বিনিময়ের মতো জমকালো সব আনুষ্ঠানিকতায় মুখর ছিল তাঁদের এই আসর।

জানা গেছে, সম্প্রতি তাঁদের প্রথম বিবাহবার্ষিকী উপলক্ষে এক শুভাকাঙ্ক্ষী ফেসবুকে কেক কাটার ছবি পোস্ট করলে পুরোনো বিয়ের ছবিগুলোও নতুন করে সামনে আসে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চট্টগ্রামের হালিশহর এলাকার এক যুবলীগ কর্মী হতাশা ব্যক্ত করে বলেন, “যেখানে দেশের মাটিতে ছাত্রলীগ-যুবলীগের সাধারণ কর্মীরা মামলা-হামলার ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন, সেখানে দুবাইয়ে বসে আমাদের সভাপতি সাহেব চতুর্থবারের মতো বিয়ে করে রীতিমতো আয়েশি জীবন কাটাচ্ছেন। এটি আমাদের আবেগে চপেটাঘাত ছাড়া আর কিছুই নয়।”

আব্দুস সবুর লিটনের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে চট্টগ্রামে বিতর্কের ইতিহাস এটিই প্রথম নয়। এর আগে ২০০৪ সালে হালিশহরের রামপুরার রঙ্গীপাড়ার একই মায়ের গর্ভজাত দুই বোন, বেবি আক্তার ও সুমি আক্তারকে একসঙ্গে বিয়ে করে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন তিনি।

ইসলামী শরিয়ত অনুযায়ী একই সঙ্গে দুই বোনকে স্ত্রী হিসেবে রাখা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও, লিটন সে সময় স্থানীয় বাসিন্দাদের তীব্র আপত্তি ও সমালোচনাকে তোয়াক্কা করেননি। পরবর্তীতে দীর্ঘ সংসার জীবনের পর এক বোনকে তালাক দিয়ে সেই সম্পর্কের ইতি টানেন তিনি।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৪ সালের শুরুর দিকে নগরের উত্তর কাট্টলীর স্থায়ী বাসিন্দা এক হিন্দু তরুণীকে বিয়ে করেন লিটন।

ওই তরুণী চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে স্নাতক শেষ করে সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল এবং সাবেক সংসদ সদস্য এস এম আল মামুনের অনুসারী হিসেবে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন।

তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর লিটন ওই তরুণী ও তাঁর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে ভারতে পালিয়ে যান।

এর কিছুদিন পর ভারত থেকে দুবাইয়ে পাড়ি জমিয়ে গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে সেখানে অবস্থানরত এক বাংলাদেশি তরুণীকে চতুর্থবারের মতো বিয়ে করেন তিনি।

বিয়ের ছবিতে থাকা লিটনের ৪র্থ স্ত্রীর নাম তাহসিন জেনি বলে জানা গেছে। চট্টগ্রামের অনেকেই তাকে জেনিফার জেনি নামেই চিনতেন৷ তিনি একসময় মডেলিংয়ের পাশাপাশি স্ট্যান্ড আপ কমেডিয়ান ছিলেন বলেও জেনির একাধিক বন্ধুরা জানিয়েছেন। চট্টগ্রাম ভিত্তিক বিভিন্ন পণ্যের বিজ্ঞাপনের মডেলও হয়েছিলেন জেনি৷

রাজনীতির পাশাপাশি আব্দুস সবুর লিটনের বিরুদ্ধে সিগারেটের অবৈধ ব্যান্ডরোল ব্যবহার ও নকল বিদেশি সিগারেট তৈরির ব্যবসার মাধ্যমে বিপুল অর্থ উপার্জনের অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, এই বিপুল অর্থ অবৈধভাবে বিদেশে পাচার করার কারণেই আজ প্রবাসে তাঁর এমন আয়েশি জীবন সম্ভব হয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ইসমাঈল হোসেন নামে এক ব্যবহারকারী লিখেছেন, “১৭ বছর ধরে লুট করা টাকায় এমন আয়েশি জীবন পরিচালনা করা সম্ভব।”

মো. ইমন নামে অন্য একজন লিখেছেন, “জনগণের টাকা চুরি করে বিদেশে আয়েশে আছেন তিনি, অথচ বিচার হওয়া উচিত ছিল।”

উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলনে চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে সন্ত্রাসী ও নিজস্ব ‘কিশোর গ্যাং’ লেলিয়ে দিয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর গুলি বর্ষণের ঘটনার পেছনেও আব্দুস সবুর লিটনের নাম আসে। তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলাও দায়ের করা হয়েছে।

দেশে তাঁর বিচার প্রক্রিয়া যখন থমকে আছে, তখন দুবাইয়ের বিলাসী জীবনের এই ছবিগুলো সাধারণ মানুষের মনে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। সূত্র-AD