উখিয়ার রোহিঙ্গা শিবিরের আবারও নিয়তির নির্মম পরিহাস। কয়েক দিনের একটানা বর্ষণে পাহাড়ের বুক চিরে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল আর কাদা-মাটি এবার কেড়ে নিল নিষ্পাপ শিশুদের প্রাণ।
আজ বুধবার (৮ জুলাই) দুপুরে উখিয়ার ৫ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ঘটে যাওয়া এক ভয়াবহ পাহাড়ধসে ধুলিসাৎ হয়ে গেছে একটি অস্থায়ী মহিলা মাদ্রাসা।
মাটির অতল গহ্বরে চাপা পড়েছে বহু শিশুর শৈশব। উখিয়া থানা পুলিশ এখন পর্যন্ত ৫টি শিশুর মরদেহ উদ্ধারের তথ্য নিশ্চিত করেছে।
ঘটনার সময় মাদ্রাসার ভেতরে আলো-আঁধারিতে সুর মিলিয়ে কোরআন পাঠে মগ্ন ছিল প্রায় ৩০ জন শিশু ছাত্রী। কিন্তু মুহূর্তের এক বিকট শব্দে সেই পবিত্র সুর বিলীন হয়ে যায় বুকফাটা আর্তনাদ আর গোঙানিতে।
স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী ও ক্যাম্পের বাসিন্দাদের সূত্রে জানা গেছে, দুপুরের দিকে বৃষ্টির বেগ বাড়ার সাথে সাথে পাহাড়ের একটি বিশাল অংশ হঠাৎ ধসে পড়ে পাদদেশে থাকা বাঁশ ও পলিথিনে ঘেরা মাদ্রাসাটির ওপর। মাটির বিপুল চাপ সইতে না পেরে মুহূর্তেই ধসে পড়ে পুরো কাঠামোটি।
উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুজিবুর রহমান জানান, ঘটনার পরপরই ফায়ার সার্ভিস, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং স্থানীয় রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবীরা যৌথভাবে উদ্ধার অভিযান শুরু করেন।
তিনি বলেন, “আমরা এ পর্যন্ত পাঁচজন শিশুর মরদেহ উদ্ধার করেছি। তবে মাটির নিচে এখনও বহু শিশু আটকে থাকায় নিহতের সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। উদ্ধারকাজ অত্যন্ত সতর্কতার সাথে চালানো হচ্ছে।”
কাদামাটি সরিয়ে স্বজনদের খোঁজে হাত দিয়ে মাটি খুঁড়ছেন অনেক রোহিঙ্গা শরণার্থী।
নিজের সন্তানকে হারিয়ে নির্বাক এক মা বিলাপ করে বলছিলেন, “ও তো সকালেই পড়তে এলো, আমি ভাবতেও পারিনি মাটি এসে আমার কলিজাটা কেড়ে নেবে।”
উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে পাহাড়ধসের ঘটনা এবারই প্রথম নয়। মাত্র দুদিন আগে, গত সোমবারও (৬ জুলাই) টানা বৃষ্টির কারণে পৃথক পাহাড়ধসে নারী-পুরুষসহ আটজন নিহত হন।
৪৮ ঘণ্টার ব্যবধানে আবারও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি প্রমাণ করে, এই ক্যাম্পগুলো এখন কতটা বিপজ্জনক মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে।
| দুর্ঘটনার তারিখ | স্থান | হতাহতের বিবরণ |
| ৬ জুলাই, ২০২৬ | উখিয়া (বিভিন্ন ক্যাম্প) | পাহাড়ধসে নারী-পুরুষসহ ৮ জন নিহত |
| ৮ জুলাই, ২০২৬ | ৫ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্প | মাদ্রাসা ধসে ৫ শিশু নিহত, বহু শিশু নিখোঁজ |
বিশেষজ্ঞ এবং পরিবেশবাদীদের মতে, ২০১৭ সালে বিপুল সংখ্যক শরণার্থীর আবাসন নিশ্চিত করতে গিয়ে উখিয়ার বিস্তীর্ণ বনাঞ্চল ও পাহাড় কেটে অপরিকল্পিতভাবে ঘরবাড়ি তৈরি করা হয়েছিল।
পাহাড়ের ওপর থেকে গাছপালা কেটে ফেলায় মাটির ক্ষয়রোধ ক্ষমতা সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে বর্ষা মৌসুমে সামান্য ভারী বৃষ্টিতেই পাহাড়ের ভেতরের মাটি নরম হয়ে ধসে পড়ে।
টানা বর্ষণ আর বারবার পাহাড়ধসের এই ঘটনায় পুরো উখিয়া জুড়েই এখন চরম আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। পাহাড়ের ঢালে বসবাসকারী হাজারো রোহিঙ্গা পরিবার এখন প্রতি মুহূর্তে মৃত্যুর প্রহর গুনছে।
ফায়ার সার্ভিসের সাইরেন আর স্বজনহারা মানুষদের বুকফাটা কান্নায় ৫ নম্বর ক্যাম্পের বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে।
উদ্ধার অভিযান এখনও চলমান। মাটির নিচে আটকে থাকা বাকি শিশুরা যেন অলৌকিকভাবে হলেও জীবিত ফিরে আসে-এই মুহূর্তে এটাই উখিয়ার আকাশ-বাতাসের একমাত্র আকুতি।
তবে প্রকৃতির এই রুদ্ররূপের সামনে অপরিকল্পিত এই জনবসতির ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্নচিহ্ন রয়েই গেল।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি

