জলাবদ্ধতার অভিশাপ মুছতে নাগরিক সচেতনতার কড়া নাড়ছেন মেয়র শাহাদাত

প্রকাশিত: ০৯ জুলাই, ২০২৬ ২০:০১

দেশের ইতিহাসের অন্যতম বিরল ও রেকর্ড ভাঙা বর্ষণে বিপর্যস্ত বন্দরনগরী চট্টগ্রাম। গত চার-পাঁচ দিনে নগরীতে ঝরেছে প্রায় এক হাজার মিলিমিটারের কাছাকাছি বৃষ্টিপাত, যার মধ্যে কেবল এক দিনেই রেকর্ড করা হয়েছে ৪১২ মিলিমিটার।

বিশ্বের বহু শহরের পুরো বছরের বৃষ্টিপাতকেও হার মানানো এই প্রলয়ঙ্কারী প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখে দাঁড়িয়ে নগরবাসীকে আতঙ্কিত না হয়ে ধৈর্য, মানবিকতা ও সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে পরিস্থিতি মোকাবিলার আহ্বান জানিয়েছেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন।

বৃহস্পতিবার চসিকে অনুষ্ঠিত জলাবদ্ধতা নিরসনকল্পে গঠিত ১৯ সদস্যবিশিষ্ট সমন্বয় কমিটির জরুরি সভা শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে এক মতবিনিময়কালে মেয়র এসব কথা বলেন।

তিনি সাফ জানিয়ে দেন, এটি কোনো সাধারণ পরিস্থিতি নয়, একটি ব্যতিক্রমী প্রাকৃতিক দুর্যোগ।

তবে এই দুর্যোগের মধ্যেও চসিক, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, জেলা প্রশাসন, পুলিশ, ওয়াসা ও সিডিএসহ সব সংস্থা দিনরাত এক করে মাঠে কাজ করে যাচ্ছে।

পাহাড়ের মানুষ সরাতে ‘আস্থা ও বুঝিয়ে বলার’ কৌশল টানা ভারী বর্ষণ আরও কয়েক দিন অব্যাহত থাকার পূর্বাভাসের কথা উল্লেখ করে মেয়র মানবিক বিপর্যয় এড়ানোর ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেন।

বিশেষ করে পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে থাকা বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে আসার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “অনেক পরিবার শেষ সম্বল হারানোর আশঙ্কায় পাহাড়ি এলাকা ছাড়তে চান না।

শুধু প্রশাসনিক নির্দেশ দিয়ে এই মনস্তাত্ত্বিক সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। তাদের আস্থা অর্জন করতে হবে, বুঝিয়ে নিরাপদ স্থানে নিয়ে আসতে হবে।”

চসিকের পক্ষ থেকে আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে নিয়মিত খাদ্য ও প্রয়োজনীয় সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে বলেও তিনি নিশ্চিত করেন।

জলাবদ্ধতার নেপথ্যে মানুষের তৈরি ক্ষত ও সেনাবাহিনীর ভূমিকা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে ডা. শাহাদাত হোসেন জানান, অতীতে বহু খাল ও ড্রেন দখল, ভরাট এবং অবৈজ্ঞানিক স্থাপনা নির্মাণের কারণে সংকুচিত হয়ে গেছে।

কোথাও খালের ওপর ভবন, কোথাও গরুর খামার, আবার কোথাও ড্রেনের মুখ বন্ধ করে ফুটপাত নির্মাণের কারণে পানি প্রবাহ আটকে যাচ্ছে। বর্তমানে এসব প্রতিবন্ধকতা অপসারণের কাজ চলছে।

এই দুর্যোগে সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ারিং ব্রিগেডের খাল পুনরুদ্ধার ও প্রশস্ত করার ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করে মেয়র বলেন, “সেনাবাহিনী যেভাবে কাজ করছে তা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। এই কাজগুলো না হলে এবারের রেকর্ড বৃষ্টিপাতে পরিস্থিতি আরও কতটা ভয়াবহ হতো তা ভাবা যায় না।”

সাফল্য ও ভবিষ্যৎ মহাপরিকল্পনা গত বছরের তুলনায় এবার পরিস্থিতির উন্নতির চিত্র তুলে ধরে মেয়র জানান, ২০২৫ সালে ধারাবাহিকভাবে খাল-নালা পরিষ্কার ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের ফলে নগরীর প্রায় ৬০ শতাংশ জলাবদ্ধতা কমানো সম্ভব হয়েছে।

একসময়ের চিরচেনা জলমগ্ন এলাকা-বহদ্দারহাট, মুরাদপুর, জিইসি মোড়, চকবাজার, দুই নম্বর গেট ও বাকলিয়ায় এবার দীর্ঘসময় পানি জমে থাকেনি, যা একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি।

সাময়িক ধীরগতির বিষয়ে তিনি জানান, বর্ষার কারণে হিজড়া খাল, জামালখান খাল, রামপুরা খাল, বামনশাহী খাল ও আজব বাহার খালের কাজ কিছুটা শ্লথ হলেও বর্ষা শেষ হওয়ার তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে এগুলো সম্পন্ন করা হবে।

পাশাপাশি চসিকের উদ্যোগে আরও ৪০টি খাল পুনরুদ্ধার ও উন্নয়নের মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে, যা টেকসই অর্থায়ন ও প্রযুক্তির মাধ্যমে রক্ষণাবেক্ষণ করা হবে।

‘এই শহর আমাদের সবার’-নাগরিকদের প্রতি মেয়রের আর্তি পানিবন্দি নগরবাসীর দুর্ভোগের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়ে মেয়র বলেন, ”যাঁরা এখনও কষ্ট পাচ্ছেন, তাঁদের কাছে আমরা আন্তরিকভাবে দুঃখিত।

তবে মনে রাখতে হবে, অনেক জলাবদ্ধতার জন্য আমাদের নিজেদের অসচেতনতাও দায়ী। খাল, নালা ও ড্রেনে প্লাস্টিক, পলিথিন ও ময়লা-আবর্জনা ফেলা বন্ধ করতে হবে।

ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য, পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ চট্টগ্রাম গড়ে তুলতে সবাইকে দায়িত্বশীল হতে হবে।“

দুর্যোগের এই কঠিন সময়ে গুজব না ছড়িয়ে প্রকৃত তথ্য ও দায়িত্বশীল সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যমে সংস্থাগুলোর কাজের গতি বাড়াতে সংবাদমাধ্যমের প্রতিও আহ্বান জানান মেয়র শাহাদাত হোসেন।

সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ও চলমান প্রকল্পগুলোর সফল বাস্তবায়নের মাধ্যমে চট্টগ্রামকে অচিরেই একটি নিরাপদ ও টেকসই বাসযোগ্য নগরী হিসেবে ফিরিয়ে দেওয়ার দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি