বন্যায় যখন বাঁচার লড়াই, সাতকানিয়ায় তখন কবরস্থান ভাঙার উৎসব!

দলছুট নেতা মোরশেদের ত্রাস: রক্তাক্ত ও বিপন্ন এক পরিবার

প্রকাশিত: ১১ জুলাই, ২০২৬ ১৩:৩০

টানা বর্ষণ আর পাহাড়ি ঢলে চারদিকে তখন থৈ থৈ পানি। বুক সমান বন্যায় ডুবছে ঘরবাড়ি, তলিয়ে গেছে ফসলের মাঠ।

নলুয়া ইউনিয়নের মানুষ যখন জীবন বাঁচাতে, ঘরের শেষ সম্বলটুকু নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে হন্যে হয়ে ছুটছে, ঠিক তখনই একদল দুর্বৃত্ত মেতে উঠেছিল ভিন্ন এক উৎসবে।

কোনো জীবিত মানুষ নয়, বন্যার সেই চরম মানবিক বিপর্যয়কে পুঁজি করে রাতের আঁধারে তারা আঘাত হেনেছে মৃত মানুষের শেষ ঠিকানায়। গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে একটি পারিবারিক কবরস্থানের দেয়াল।

গত বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) দিবাগত রাতে চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার নলুয়া ইউনিয়নের পূর্ব গাটিয়াডেঙ্গা গ্রামের মোসলেম মুন্সি বাড়িতে ঘটে এই ন্যাক্কারজনক ও বর্বর ঘটনা।

বন্যার পানির তোড় নয়, বরং মানুষের তৈরি হিংস্রতার তোড়ে ধূলিসাৎ হয়েছে এই পবিত্র দেয়াল।

ভয়ার্ত ও ক্ষোভ মেশানো কণ্ঠে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্য মিজানুল ইসলাম বলেন, “চারদিকে তখন বন্যার পানি থৈ থৈ করছে। আমরা ঘর বাঁচাবো নাকি জীবন বাঁচাবো, সেই চিন্তায় অস্থির।

ঠিক সেই সুযোগে রাতের আঁধারে আমাদের পারিবারিক কবরস্থানের দেয়ালটি ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয় দুর্বৃত্তরা। মানুষ কতটা নিচে নামলে, কতটা হিংস্র হলে বন্যার দিনেও এমন বর্বরতা চালাতে পারে?”

মিজানুল ইসলামের অভিযোগ, নলুয়া ইউনিয়ন যুবলীগের সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি ফখরুদ্দিন মিন্টুর অনুসারী একটি সন্ত্রাসী গ্রুপ এই ঘটনার পেছনে রয়েছে।

তবে বন্যার কারণে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় অভিযুক্তদের কারো বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

ভোল পাল্টে জামায়াতে মোরশেদ, নেপথ্যে প্রবাসী মিন্টুর ভাই

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগের ভিত্তিতে জানা যায়,নলুয়ায় দীর্ঘদিন ধরে একটি সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসী চক্র রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় আধিপত্য বিস্তার করে আসছে।

সাতকানিয়া
সাবেক সাংসদ ও আওয়ামী লীগ নেতাকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন মিন্টু

প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়া, ছিনতাই, মাদক বেচাকেনা ও প্রভাব বিস্তারের মতো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড তাদের নিত্যদিনের বিষয়।

স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, মূল অভিযুক্ত ফখরুদ্দিন মিন্টু বর্তমানে বিদেশে অবস্থান করলেও এলাকায় তাঁর বিশাল সন্ত্রাসী বাহিনী নিয়ন্ত্রণ করেন তাঁর বড় ভাই কামাল উদ্দিন।

সাতকানিয়া
আওয়ামী লীগ নেতা আবু ছালেহকে ফুল দিয়ে বরণ করে নিচ্ছেন কামাল

আর মাঠ পর্যায়ে সেই বাহিনীর মূল চালিকাশক্তি বা ‘অপারেশনাল কমান্ডার’ হিসেবে নেতৃত্ব দিচ্ছেন তাদের ভাগিনা মোরশেদ আলম।সাতকানিয়া

স্থানীয় বাসিন্দারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, মোরশেদ আলম আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সক্রিয় এবং প্রভাবশালী ছিলেন।

কিন্তু গত বছরের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নিজের পিঠ বাঁচাতে তিনি রাতারাতি ভোল পাল্টে ফেলেন। যোগ দেন জামায়াতপন্থী সংগঠন ‘শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন’-এ। সাতকানিয়া

নতুন এই রাজনৈতিক মোড়ক ব্যবহার করে এলাকায় আগের মতোই ত্রাসের রাজত্ব কায়েম রেখেছেন তিনি। তাঁর বিরুদ্ধে জুলাই-পরবর্তী সহিংসতাসহ একাধিক মামলা রয়েছে বলেও জানা গেছে।

মোরশেদ ও তাঁর বাহিনীর এই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে যারাই মুখ খুলেছেন, তাদেরই হতে হয়েছে রক্তাক্ত।

মিজানুল ইসলাম ও তাঁর পরিবার এই প্রতিবাদের কারণে দীর্ঘদিন ধরে চরম মূল্য দিয়ে আসছেন।

একের পর এক হামলায় পরিবারটি এখন পুরোপুরি বিপন্ন। অপরাধের খতিয়ান ঘাঁটলে দেখা যায় এক পরিকল্পিত নিপীড়নের চিত্র:

জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে ২০২৪ সালের ২৭ জুন সাতকানিয়া থানায় প্রথম সাধারণ ডায়েরি (জিডি নম্বর: ১৩০২) করেন মিজানুল।

২০২৫ সালের ৫ আগস্ট বাবার কবর জিয়ারত করতে গেলে মোরশেদ আলম ধারালো দা নিয়ে মিজানুলের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন।

হামলায় তাঁর বাম হাত গুরুতর জখম হয়। পরে পুলিশ এসে ঘটনাস্থল থেকে হামলাকারীদের ফেলে যাওয়া দা উদ্ধার করে।

চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি রাতে মিজানুলের বাড়ির ৪টি সিসিটিভি ক্যামেরা ভেঙে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা, যাতে তাদের অপরাধের কোনো প্রমাণ না থাকে।

তাছাড়া গত ২৮ মে ঈদের নামাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় এসে মিজানুলকে লক্ষ্য করে আগ্নেয়াস্ত্র তাক করা হয়। সাতকানিয়া

তাঁর চিৎকারে আশপাশের মানুষ এগিয়ে এলে মোরশেদ (যার হাতে আগ্নেয়াস্ত্র ছিল) ও তাঁর সহযোগী শহিদ (যার হাতে ছিল ধারালো কিরিচ) দ্রুত পালিয়ে যায়। (এসডিআর নম্বর: ১৪৫৫)।

সবশেষ, গত বৃহস্পতিবার রাতে বন্যার সুযোগ নিয়ে চালানো হলো কবরস্থান ভাঙার এই নারকীয় উৎসব।

আতঙ্কে বোবা এলাকাবাসী, কী বলছে প্রশাসন?

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক এলাকাবাসী জানান, মিন্টু, কামাল ও মোরশেদের আতঙ্কে এলাকায় কেউ প্রকাশ্যে মুখ খোলার সাহস পায় না। সামান্য প্রতিবাদ করলেই নেমে আসে অমানুষিক নির্যাতন, হয়রানি ও মিথ্যা মামলা।

এ বিষয়ে সাতকানিয়া সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) মো. আরিফুল ইসলাম সিদ্দিকী বলেন,“কবরস্থানের দেয়াল ভাঙচুরের বিষয়টি আমাদের জানানো হয়েছে। বর্তমানে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির কারণে পুলিশের স্বাভাবিক টহল ও কার্যক্রম কিছুটা ব্যাহত হচ্ছে।

তবে পরিস্থিতির উন্নতি হওয়া মাত্রই ঘটনার তদন্ত করে জড়িতদের চিহ্নিত করা হবে এবং কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

নলুয়াবাসীর মনে যে আতঙ্কের ঢেউ বইছে, তা সহজে নামার নয়। দলছুট নেতা মোরশেদের এই ত্রাসের রাজত্ব থেকে একটি বিপন্ন পরিবার আর কতদিন এভাবে রক্তাক্ত হবে?

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি