এক যুগ আগে একটি রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থায় জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দিতে প্রয়োজন ছিল স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাধারণ ক্যাডারে প্রথম বিভাগে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি এবং ন্যূনতম তিন বছরের অভিজ্ঞতা।
কিন্তু সব যোগ্যতার শর্ত কাগজেই বন্দি রেখে একটি প্রশাসনিক ছাড়পত্রের আড়ালে কারিগরি ক্যাডারের ওপরের গ্রেডে ঢুকে পড়েন এক তরুণ। সেখান থেকে শুরু।
এরপর রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার, পদোন্নতি বিধিমালাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন এবং জ্বালানি তেলের সংবেদনশীল স্থাপনায় একটানা দেড় দশক খুঁটি গেড়ে বসে গড়ে তোলা হয় দুর্নীতির এক বিশাল সাম্রাজ্য।
রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি বিপণন প্রতিষ্ঠান মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডের (পিএলসি) সহকারী মহাব্যবস্থাপক (মেইন ইনস্টলেশন) মো. রাশেদুল হকের প্রশাসনিক উত্থান ও কর্মকাণ্ড পর্যালোচনায় উঠে এসেছে এমনই চাঞ্চল্যকর চিত্র।
সংগৃহীত নথিপত্র, প্রাতিষ্ঠানিক তদন্তের তথ্য ও একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রের অনুসন্ধানে দেখা যায়, ভুয়া সনদের ওপর দাঁড়িয়ে শুরু হওয়া চাকরি জীবনের আড়ালে তিনি গড়ে তুলেছিলেন শত শত কোটি টাকার তেল চুরি, পাচার ও প্রশাসনিক চাঁদাবাজির এক দুর্ভেদ্য সিন্ডিকেট।
শিক্ষাগত যোগ্যতায় ছদ্মবেশ ও নিয়োগ জালিয়াতি
সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বিষয়টি নিয়ে আরও আলোচনায় উঠে আসে। প্রতিবেদনে উল্লেখ, ২০১২ সালের ১ নভেম্বর মেঘনা পেট্রোলিয়ামে নিয়োগ পান রাশেদুল হক। তৎকালীন সার্ভিস রুলস ও নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী সাধারণ ক্যাডারের সপ্তম গ্রেডের পদের জন্য প্রথম বিভাগে স্নাতকোত্তর ডিগ্রির অভিজ্ঞতা বাধ্যবাধকতা থাকলেও তিনি তা পূর্ণ করতে পারেননি।
অভিযোগ রয়েছে, কারিগরি শাখার দুই ধাপ উপরের (পঞ্চম গ্রেড) বিএসসি পাস পদের বিপরীতে একটি ভুয়া ছাড়পত্র ও অসম্পূর্ণ সনদ জমা দিয়ে অনিয়মের মাধ্যমে নিয়োগ বাগিয়ে নেন তিনি।
এই নিয়োগ প্রক্রিয়ার মূল নথি যাচাই করলেই দুর্নীতির সূচনা উন্মোচিত হবে বলে দাবি সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের।তথ্যসূত্র-সিএম
বদলি বিধিমালাকে বুড়ো আঙুল: একই স্থানে ১৫ বছর
সরকারি কিংবা রাষ্ট্রায়ত্ত যেকোনো সংস্থায় সুশাসন নিশ্চিতের অন্যতম শর্ত হলো ৩ থেকে ৫ বছর পর পর কর্মকর্তাদের বদলি। কিন্তু রাশেদুল হকের ক্ষেত্রে এই নিয়ম সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় রাখা হয়েছিল।
চট্টগ্রাম পতেঙ্গাস্থ প্রধান স্থাপনার (মেইন ইনস্টলেশন) মতো কৌশলগত ও স্পর্শকাতর স্থানে তিনি প্রায় ১৫ বছর ধরে একই পদে বহাল ছিলেন।
একটি সংবেদনশীল পদে দেড় দশক একটানা অবস্থান করে তিনি পুরো প্রশাসনিক ব্যবস্থার ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন।
সাবেক সরকারের আমলে নিজেকে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের ‘ছাত্রলীগ নেতা’ পরিচয় দিয়ে প্রতিষ্ঠানে ভীতি ও ক্ষমতার দাপট তৈরি করেছিলেন বলে দায়িত্বশীল সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে। যা বিভিন্ন গণমাধ্যমেও উঠে এসেছে।
তেল চুরি ও ডিপো চাঁদাবাজির সিন্ডিকেট
পতেঙ্গা প্রধান স্থাপনাটি মূলত দেশের জ্বালানি সংরক্ষণ ও বিতরণের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র। সংগৃহীত অনুসন্ধানী তথ্য এবং গণমাধ্যমে প্রকাশিত সূত্র বলছে, সেখানে দায়িত্ব পালনকালে মেঘনা পেট্রোলিয়ামের তৎকালীন অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা উপমহাব্যবস্থাপক (পরিচালন) মুজিবুর রহমান চৌধুরীকে সাথে নিয়ে রাশেদুল একটি চোরাচালান বলয় গড়ে তোলেন।
এই চক্রের কাজ ছিল প্রধান স্থাপনা থেকে শুরু করে আঞ্চলিক ডিপোগুলোতে পরিবহনকালে কারিগরি উপায়ে সিস্টেম লস দেখিয়ে কোটি কোটি টাকার জ্বালানি তেল গায়েব করা, তেল পাচার এবং জ্বালানিতে ভেজাল মিশ্রণ করা।
এছাড়া দেশের বিভিন্ন আঞ্চলিক ডিপো থেকে প্রাতিষ্ঠানিক চাপ প্রয়োগ করে প্রতি মাসে মোটা অঙ্কের চাঁদা আদায় করার সুনির্দিষ্ট তথ্য মিলেছে।
সংগৃহীত অর্থ পরবর্তীতে রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া বজায় রাখতে সরকারের উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের কাছে পৌঁছানো হতো।
আইন লঙ্ঘন করে পদোন্নতি ও আর্থিক আত্মসাৎ
শুধু অনৈতিক সুযোগ-সুবিধাই নয়, রাশেদুল হক প্রাতিষ্ঠানিক পদোন্নতি বাণিজ্য ও অর্থ আত্মসাতেও জড়িয়ে পড়েন। ২০২১ সালের ২৫ নভেম্বর প্রতিষ্ঠানের পদোন্নতি নীতিমালার ১৪.১ ও ১৪.৩ ধারা সরাসরি লঙ্ঘন করে, কোনো বিভাগীয় শূন্য পদ না থাকা সত্ত্বেও বিপুল অঙ্কের অঘোষিত লেনদেনের মাধ্যমে চারজন কর্মকর্তাকে সরাসরি ব্যবস্থাপক (ম্যানেজার) পদে পদোন্নতি দেওয়ার প্রক্রিয়ায় তিনি মূল অনুঘটক হিসেবে কাজ করেন।
এছাড়া কোম্পানির অভ্যন্তরীণ আইনি মামলা পরিচালনার নামে ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি করা এবং কোম্পানির মালিকানাধীন বিলাসবহুল গাড়ি ব্যক্তিগত কাজে ভাড়ায় খাটিয়ে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
অবৈধ অর্জনে গড়ে তোলা সম্পত্তির পাহাড়
অভিযোগকারীদের দাবি ও প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, তেল চুরি ও অনিয়মের মাধ্যমে অর্জিত অর্থ দিয়ে তিনি নিজ জেলা ভোলায় প্রাসাদসম বিলাসবহুল বাড়ি নির্মাণ করেছেন, হাঁকাচ্ছেন একাধিক দামি গাড়ি।
এছাড়া স্ত্রী ও সন্তানদের নামে ব্যাংকে মোটা অঙ্কের এফডিআর (FDR) এবং সঞ্চয়পত্র আকারে কোটি কোটি টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি গড়ে তুলেছেন, যার বৈধ অর্থনৈতিক উৎসের কোনো সামঞ্জস্য নেই। তথ্যসূত্র-এসবাংলা
রাজনৈতিক ছত্রছায়া-চাপ
অতীতে রাশেদুল হকের অনিয়ম নিয়ে একাধিকবার অভ্যন্তরীণ তদন্তের গুঞ্জন উঠলেও ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক শক্তির ভয় দেখিয়ে তা মাঝপথেই বন্ধ করে দেওয়া হয়। গত ৫ আগস্ট দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এই প্রভাবশালী কর্মকর্তার সব দুর্নীতির নথি জনসম্মুখে আসতে শুরু করেছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, একজন সরকারি বা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা হয়ে আয়ের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পদের পাহাড় গড়া দুর্নীতি দমন আইনের সরাসরি বরখেলাপ।
বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ:
সামগ্রিক বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান মনে করেন, নিয়োগে জালিয়াতি, নীতিমালার ব্যত্যয় ঘটিয়ে এক পদে বছরের পর বছর বহাল থাকা এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ চুরি প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসনের চরম বিনাশ ঘটায়।
অর্জিত সম্পত্তির আইনি উৎস না থাকলে তা স্পষ্টতই বিচার্য অপরাধ। স্বচ্ছ প্রাতিষ্ঠানিক তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা জরুরি।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) নির্ভরযোগ্য একটি সূত্রে জানা গেছে, নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় সুনির্দিষ্ট তথ্য ও নথি হস্তগত হলে কিংবা প্রকাশিত অনুসন্ধানী তথ্যের ভিত্তিতে আইনি যাচাই শেষ করে দ্রুত তদন্ত প্রক্রিয়া শুরু করা হবে।
রাশেদুল হকের বিরুদ্ধে ওঠা এই অভিযোগ নিয়ে জানতে তার মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। পরে তার হোয়াটসঅ্যাপে সুনিদ্দিষ্ট কিছু অভিযোগের সত্যতা জানতে বার্তা পাঠালে তিনি নিজে কোন মন্তব্য না করে বেসরকারি টেলিভিশনের ঢাকার এক সাংবাদিক পরিচয়ে সংবাদটি প্রকাশ না করার বিশেষ অনুরোধ জানান।
তবে এর আগে অপর এক গণমাধ্যমে তিনি সব তথ্য অস্বীকার করে বলেছিলেন, তার বিরুদ্ধে আনীত সব কথা ভিত্তিহীন ও মিথ্যা। একটি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী তার প্রাতিষ্ঠানিক অগ্রগতিতে ঈর্ষান্বিত হয়ে সুনাম ক্ষুণ্ন করার জন্য এসব অপপ্রচার চালাচ্ছে।
রাষ্ট্রীয় কৌশলগত জ্বালানি খাতের শৃংখলা ও জনআস্থা ফিরিয়ে আনতে মেঘনা পেট্রোলিয়ামের ক্ষুব্ধ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দ্রুত উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত কমিশন গঠন করে রাশেদুল হকসহ জড়িত পুরো সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি


