বান্দরবানের সিভিল সার্জন শাহীনের অদৃশ্য শক্তি-এক কোটির ওষুধে চার কোটি বিল!

অভিযোগে ওএসডি-মাস না পেরোতেই স্বপদে পুনর্বহাল

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২২:০০

এক কোটি টাকার ওষুধ কিনে পার্বত্য জেলা পরিষদ থেকে চার কোটি টাকার বিল তুলে নেওয়ার মতো গুরুতর দুর্নীতি ও টেন্ডার অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পর তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

কিন্তু মাত্র এক মাসের ব্যবধানে সব অভিযোগ ও বিতর্ককে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে আবারও স্বপদে ফিরে এলেন বান্দরবান পার্বত্য জেলার সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ শাহীন হোসাইন চৌধুরী।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের রহস্যজনক এক আদেশে তাঁকে পুনরায় একই পদে পদায়ন করায় স্থানীয় সচেতন মহল ও সচেতন জনগণের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

গত ২৭ সেপ্টেম্বর স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে দেখা যায়, মহাখালী স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) হিসেবে কর্মরত ডা. মোহাম্মদ শাহীন হোসাইন চৌধুরীকে পুনরায় বান্দরবান পার্বত্য জেলার সিভিল সার্জনের চলতি দায়িত্বে পদায়ন করা হয়েছে।

একই সঙ্গে আগামী ২৯ সেপ্টেম্বরের মধ্যে তাঁকে নতুন কর্মস্থলে যোগদানের নির্দেশ দেওয়া হয়।

ঘটনার সূত্রপাত পার্বত্য বান্দরবানের স্বাস্থ্য খাতের কেনাকাটায় নজিরবিহীন অনিয়মকে কেন্দ্র করে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উঠে আসে, বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের মাধ্যমে স্বাস্থ্য বিভাগের জন্য ওষুধ কেনার ক্ষেত্রে বাস্তব মূল্যের চেয়ে চারগুণ বেশি অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে।

এক কোটি টাকার ওষুধ ক্রয় দেখিয়ে চার কোটি টাকার বিল ভাউচার পাস করিয়ে নেওয়ার বিস্ফোরক তথ্যে তোলপাড় সৃষ্টি হয় জেলাজুড়ে।

শুধু তা-ই নয়, ওষুধ ক্রয় ও যন্ত্রপাতি সরবরাহের টেন্ডার প্রক্রিয়ায় ব্যাপক কারচুপি এবং নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার একাধিক অভিযোগ ওঠে সিভিল সার্জন ডা. শাহীন হোসাইন চৌধুরীর বিরুদ্ধে।

এসব অনিয়মের তথ্য প্রকাশ্যে আসার পর ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে স্বাস্থ্য বিভাগ। পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে গত ২০ আগস্ট স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ডা. শাহীনকে সিভিল সার্জন পদ থেকে সরিয়ে মহাখালী স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে ওএসডি হিসেবে বদলি করা হয়।

দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত কর্মকর্তা বদলি হওয়ার পর স্থানীয় পর্যায়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা ফেরার একধরনের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল।

কিন্তু ওএসডির মেয়াদ এক মাস পার হতে না হতেই কোন খুঁটির জোরে এবং কার নির্দেশে এই আদেশ প্রত্যাহার করে তাঁকে পুনরায় বান্দরবানেই ফিরিয়ে আনা হলো-তা নিয়ে উঠেছে নানা প্রশ্ন।

বান্দরবানের স্থানীয় বিশিষ্ট নাগরিক ও সচেতন ব্যক্তিবর্গ জানান, পার্বত্য অঞ্চলের সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার নামে কোটি কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও একজন বিতর্কিত কর্মকর্তাকে পুনরায় একই চেয়ারে বসানো প্রশাসন ও মন্ত্রণালয়ের সচ্ছতাকে মারাত্মকভাবে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

দুর্নীতির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা কিংবা বিভাগীয় তদন্ত সম্পন্ন করার আগেই তাঁকে স্বপদে ফেরানোকে দুর্নীতির সরাসরি ‘পুনর্বাসন’ হিসেবে দেখছেন তারা।

অভিযোগ উঠেছে, স্বাস্থ্য খাতকে জিম্মি করে ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধি ও অবৈধ আর্থিক সুবিধা নেওয়ার এই চক্র বন্ধ না হলে পার্বত্য অঞ্চলের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে।

এসব বিষয়ে মতামত জানতে বান্দরবান পার্বত্য জেলার সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ শাহীন হোসাইন চৌধুরীর মুঠোফোনে কল করলেও তার সাথে যোগাযোগ সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে তার হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বারে বার্তা পাঠালেও এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি। বক্তব্য পেলে প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।

এদিকে একটি স্বচ্ছ ও সুষ্ঠু তদন্ত প্রক্রিয়ার স্বার্থে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন স্থানীয়রা।

তাঁদের দাবি, অবিলম্বে এই রহস্যজনক পদায়নের আদেশ বাতিল করে এক কোটি টাকার ওষুধে চার কোটি টাকা উত্তোলনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে এবং ঘটনার সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি