শাহ আমানত সেতুতে ডিজিটাল কারসাজি: নির্বাহী প্রকৌশলীর ছায়ায় কোটি কোটি টাকার রাজস্ব উধাও

টোল ব্যবস্থাপনায় অভিনব প্রতারণা: রসিদবিহীন আদায় ও ভুয়া প্রিন্ট

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ০৭ অক্টোবর, ২০২৬ ১৮:০৭

চট্টগ্রামের দক্ষিণ জেলা, বান্দরবান ও পর্যটন নগরী কক্সবাজারের অন্যতম প্রধান প্রবেশদ্বার কর্ণফুলী (শাহ আমানত) সেতু।

প্রতিদিন হাজার হাজার যানবাহনের চাকা ঘোরার সঙ্গে সঙ্গে এখান থেকে অর্জিত হওয়ার কথা সরকারের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব। কিন্তু বাস্তবে তা ঘটছে না।

স্বয়ংক্রিয় ডিজিটাল ব্যবস্থা ও প্রযুক্তির আড়ালে চলছে ভয়াবহ অনিয়ম, সূক্ষ্ম কারসাজি ও সুপরিকল্পিত রাজস্ব আত্মসাৎ। সরকারের কোটি কোটি টাকার রাজস্ব পকেটে পুরছে একটি সংঘবদ্ধ চক্র।

এই অভিনব রাজস্ব ফাঁকি ও আর্থিক হরিলুটের কেন্দ্রে সরাসরি উঠে এসেছে চট্টগ্রাম সড়ক ও জনপদ বিভাগের (সওজ) নির্বাহী প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) মো. মাইদুল ইসলামের নাম।

অনিয়মের অভিনব কৌশল:
রসিদবিহীন আদায় ও ভূয়া প্রসংখা নিয়ম অনুযায়ী টোল প্লাজায় প্রতিটি গাড়ি থামবে, স্বয়ংক্রিয় ব্যারিয়ার নামানো থাকবে এবং কম্পিউটারে গাড়ির সঠিক নম্বর ও শ্রেণী উঠে তথ্য সিস্টেমে সংরক্ষণ হওয়ার পর চালককে মুদ্রিত রসিদ বুঝিয়ে তবেই ব্যারিয়ার উঠবে।

কিন্তু অনুসন্ধান ও সরেজমিনে দেখা গেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। একাধিক বুথে ব্যারিয়ার তোলাই থাকছে, গাড়ি না থামিয়েই টোল কর্মীরা দ্রুত নগদ টাকা নিয়ে ছেড়ে দিচ্ছে গাড়ি। চালকদের অভিযোগ, দিনের চেয়ে রাতে এই অনিয়মের মাত্রা আরও বেপরোয়া রূপ নেয়।

পরিচয় গোপন রেখে অনুসন্ধানে পাওয়া যায় আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য। টোল দেওয়ার পর প্রাপ্ত রসিদে গাড়ির প্রকৃত নম্বরের বদলে লেখা থাকছে ‘০০০০’ (চারটি শূন্য) কিংবা ‘০০০০০০’ (ছয়টি শূন্য)। অনেক সময় সম্পূর্ণ রসিদবিহীন টাকা আদায় করা হয় কিংবা চালকদের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয় পূর্বনির্ধারিত প্রিন্ট করা পুরনো রসিদ।

টোল প্লাজার দায়িত্বপ্রাপ্তরা একে “সিস্টেম হ্যাং” বা প্রযুক্তির ত্রুটি বলে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করলেও কর্মীদের সূত্রে জানা গেছে আসল উদ্দেশ্য ভিন্ন।

মূল নিবন্ধিত নম্বর গোপন রেখে যানবাহন পারাপার করানোর প্রধান উদ্দেশ্য হলো-সেতু দিয়ে পার হওয়া মোট যানবাহনের সংখ্যা নথিপত্রে গোপন রাখা।

যানবাহনের সংখ্যা কম দেখালে সরকারি খাতায় রাজস্ব আদায় কম দেখানো সহজ হয়, আর সেই সুযোগে অর্জিত অর্থের সিংহভাগই আত্মসাৎ করছে এই চক্রটি।

প্রযুক্তির আড়ালে হিসাব ফাঁকি ও তদারকির অভাব ইলেকট্রনিক গভর্নমেন্ট প্রোকিউরমেন্ট (ই-জিপি) নথি অনুসারে, শাহ আমানত সেতুর তিন বছরের ওয়েব-বেসড টোল কালেকশন, অপারেশন ও ম্যানেজমেন্ট সুবিধার জন্য ১৬ কোটি টাকার একটি প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছিল।

প্রযুক্তিনির্ভর এএনপিআর (স্বয়ংক্রিয় নম্বর প্লেট সনাক্তকরণ) ক্যামেরা, আরএফআইডি ব্যবস্থা এবং অনলাইন ডেটা সার্ভারের মাধ্যমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবতা ঠিক উল্টো।

তিন বছর ধরে টোল আদায়ের দায়িত্বে থাকা ইজারাদার শামীম এন্টারপ্রাইজের মেয়াদ গত ৪ এপ্রিল শেষ হয়। এরপর নতুন টেন্ডারে সর্বনিম্ন দরদাতাকে কাজ না দিয়ে চট্টগ্রাম সড়ক ও জনপদ বিভাগ নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় টোল আদায় শুরু করে।

বর্তমানে প্রযুক্তির কোনো অডিট বা তদারকি না থাকার সুযোগে অবাধে চলছে এই রাজস্ব কারসাজি। প্রতিদিনের দৈনিক বা মাসিক নির্দিষ্ট যানবাহন পারাপারের তথ্য জনসম্মুখে প্রকাশ করা হয় না।

এমনকি টোল আদায় কমে গেলে বা বেড়ে গেলে কত গাড়ি পার হয়েছে তার সঠিক লগ ডেটা সরবরাহ করতেও ব্যর্থ হচ্ছে কর্তৃপক্ষ।

সওজের তথ্যমতেই প্রতিদিন গড়ে ২০ থেকে ২২ হাজার যানবাহন পারাপার বাবদ প্রায় ২৫ লাখের বেশি টাকা আদায় হয়, যা সপ্তাহের বৃহস্পতি, শুক্র ও শনিবার ৩৫ হাজারে গিয়ে ঠেকে। কিন্তু ডিজিটাল কারসাজিতে এই তথ্যের বিশাল গড়মিল থেকে যাচ্ছে।

সিন্ডিকেটের মূলে নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাইদুল ইসলাম সওজ অফিসের অভ্যন্তরীণ একাধিক দায়িত্বশীল সূত্রের দাবি, শাহ আমানত সেতুর এই সংঘবদ্ধ টোল সিন্ডিকেটের মূল নিয়ন্ত্রক হিসেবে কাজ করছেন স্বয়ং নির্বাহী প্রকৌশলী (চ. দা.) মো. মাইদুল ইসলাম।

অভিযোগ রয়েছে, সেতুতে আদায়কৃত নগদ অর্থের একটি সুনির্দিষ্ট অংশ বা ‘প্যাকেট’ প্রতিদিন নিয়ম করে চলে যায় তাঁর কার্যালয়ে। দপ্তরের গুটি কয়েক অসাধু কর্মকর্তা, কর্মচারী ও টোল প্লাজার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীদের প্রত্যক্ষ সহায়তায় এই রাজস্ব লুটপাট প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে।

এ বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী (চ. দা.) মো. মাইদুল ইসলাম এর মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি সকল অভিযোগ অস্বিকার করেন। দায়িত্বে থেকে ঘটনার দায় এড়ানো সম্ভব কিনা জানতে চাইলে তিনি সরাসরি জানিয়ে দেন এখানে তার কোন দায় নেই।

দীর্ঘ ১৬ বছরের টোল ও স্থানীয ক্ষোভ:
টোলমুক্তকরণের দাবি ২০০৬ সালের ৮ আগস্ট ৫৯০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৯৫০ মিটার দৈর্ঘ্যের এই ৩য় কর্ণফুলী সেতুটির নির্মাণকাজ শুরু হয় এবং ২০১০ সালের সেপ্টেম্বরে তা উন্মুক্ত করা হয়।

দীর্ঘ ১৬ বছরে যান চলাচল বহুগুণ বেড়েছে, কয়েক দফায় বাড়ানো হয়েছে টোলের হারও। বর্তমানে থ্রি-হুইলার ৩০ টাকা থেকে শুরু করে বড় বাস ১৫৫ টাকা, ট্রাক ২০০-৩০০ টাকা এবং লরি ৭৫০ টাকা পর্যন্ত টোল দিচ্ছে।

প্রতিদিন অতিরিক্ত যানজটে যাত্রী ও ড্রাইভারদের সময় নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের যাতায়াতে বাড়তি অর্থ গুনতে হচ্ছে।

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) চেয়ারম্যান মো. বেলায়েত হোসেন স্পষ্ট জানিয়েছেন, পটিয়া, আনোয়ারা ও দক্ষিণ চট্টগ্রামের মানুষ দিনে একাধিকবার এই সেতু দিয়ে যাতায়াত করে। সেতুটি অনেক আগে নির্মিত হয়েছে এবং যে পরিমাণ বিনিয়োগ করা হয়েছিল তার দ্বিগুণ-তিনগুণ টাকা ইতিমধ্যে উঠে গেছে।

ঋণের বোঝা থাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েগুলোর মতো এখানে টোল বহাল রাখা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। এটিকে দ্রুত টোলমুক্ত করা জনগণের ন্যায্য দাবি।

কর্ণফুলী নাগরিক পরিষদ সহ বিভিন্ন সংগঠন ইতিমধ্যেই টোল প্রত্যাহারের দাবিতে আন্দোলন ও গণস্বাক্ষর অভিযান চালিয়েছে।

তদন্ত ও উত্তরণের পথ বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রাতিষ্ঠানিক প্রতারণা ও অর্থ আত্মসাতের জট খোলা অসম্ভব কিছু নয়।

নিরপেক্ষ অডিটের মাধ্যমে মূল কারসাজি ধরে ফেলা সম্ভব। এক্ষেত্রে সেতুর সিসিটিভি ফুটেজের যানবাহনের সংখ্যার সাথে সার্ভার লগ ডেটার মিল দেখা। লেনভিত্তিক মুদ্রিত রসিদের সিরিয়াল নম্বর ও সফটওয়্যার থেকে প্রাপ্ত দৈনিক যানবাহনের ক্যাটাগরিভিত্তিক গণনা যাচাই করা এবং দৈনিক আদায়কৃত অর্থের ব্যাংক জমা ও চালান রসিদের সঙ্গে প্রকৃত সিসিটিভি গণনার তুলনা করা।

জাতীয় রাজস্বের এই অপচয় বন্ধে অবিলম্বে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠনের জোর দাবি উঠেছে।

একইসঙ্গে টোল আদায়ে পূর্ণ স্বচ্ছতা ফেরাতে প্রতিদিনের যানবাহন পারাপারের তথ্য ও আদায়কৃত অর্থ ডিজিটাল বোর্ডে জনসম্মুখে প্রকাশের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি