তিনি কীভাবে খুলশীর ওসি? মেয়র শাহাদাতের তোপ, অপরাহ্নেই বদলি

উত্তপ্ত রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিমণ্ডল

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ০৮ অক্টোবর, ২০২৬ ১৩:৩১

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনের তীব্র ক্ষোভ প্রকাশের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) খুলশী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুর রহিমকে থানা থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

যদিও পুলিশ প্রশাসন দাবি করছে এটি তাদের নিয়মিত রদবদল, তবে সাম্প্রতিক ঘটনাবলি ও রাজনৈতিক টানাপোড়েনের পর এই সিদ্ধান্ত নগরজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে।

ঘটনার সূচনা বুধবার নগরীর ঈদগাঁও এলাকায় আয়োজিত ডেঙ্গু সচেতনতামূলক এক কর্মসূচিতে। সেখানে বক্তব্য দেওয়ার সময় খুলশী থানার ওসি আবদুর রহিমের অতীত ভূমিকা ও বর্তমান রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তোলেন মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন।

মেয়র অভিযোগ করেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আবদুর রহিম বাকলিয়া থানার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন।

বর্তমান পরিস্থিতিতে তিনি কীভাবে খুলশী থানার ওসির দায়িত্ব পেলেন, সে প্রশ্ন তুলে মেয়র বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ওই এলাকায় আওয়ামী লীগ বা যুবলীগের কোনো নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করেননি ওসি রহিম।

বক্তব্যে চসিক নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নিজের বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনেন মেয়র। তার দাবি, পরিকল্পিতভাবে তাকে হেয় করতে এই ষড়যন্ত্রের ছক কষা হচ্ছে এবং সংশ্লিষ্ট থানা প্রশাসন এর সাথে যুক্ত।

প্রতিবেদনের নেপথ্যে রয়েছে আগের রাতে নগরীর মতিঝর্ণা এলাকায় মেয়রের ভবনের চারপাশে গভীর রাতে পুলিশের বিশেষ অবস্থান। পুলিশের ভাষ্যমতে, সেটি ছিল একটি সাধারণ অভিযানের অংশ।

তবে গুঞ্জন ওঠে, একাধিক মামলার আসামি ও বহিস্কৃত স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা ওয়াকিল হোসেন ওরফে বগা ওই ভবনে অবস্থান করছেন-এমন সংবাদের ভিত্তিতেই পুলিশ সেখানে যায়।

পুলিশের তালিকা অনুযায়ী, ওয়াকিলের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, মাদক, মারধর, পুলিশের ওপর হামলা ও বিস্ফোরক আইনসহ অন্তত ১৭টি মামলা রয়েছে।

গত ৮ জুন সরকারি জমি দখলকে কেন্দ্র করে প্রকাশ্যে গোলাগুলির ঘটনার পর দল তাকে বহিষ্কার করে।

তবে ওসির এই অবস্থানের কঠোর সমালোচনা করেন মেয়র শাহাদাত। ওয়াকিলকে ‘জুলাইযোদ্ধা’ হিসেবে উল্লেখ করে মেয়র দাবি করেন, বিগত সরকারের আমলে তিনি একের পর এক মামলার শিকার হয়ে আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন।

মেয়র চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেন, কোনো সাংবাদিক যদি প্রমাণ করতে পারেন ওয়াকিল আমার সাথে চলে গেছেন, তবে আমি রাজনীতি ছেড়ে দেব। তা না পারলে মিথ্যা প্রচারকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গত ২৯ সেপ্টেম্বর ১৬ বছর বয়সী কিশোর হৃদয়কে কুপিয়ে হত্যার নৃশংস ঘটনার প্রসঙ্গও মেয়রের বক্তব্যে উঠে আসে।

পুলিশের দাবি-নিহত হৃদয় এবং অভিযুক্তরা বহিস্কৃত নেতা ওয়াকিলের অনুসারী। এই মামলায় ইতিমধ্যেই সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

তবে মেয়রের গুরুতর অভিযোগ, হৃদয় হত্যা মামলার এক আসামি কামরুলকে অন্যায়ভাবে মারধর করে জোরপূর্বক ওয়াকিলের নাম বলতে বাধ্য করেছেন ওসি রহিম।

মেয়রের অভিযোগ, বিগত সরকারের বিশ্বস্ত কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করা রহিম এখন খুলশী এলাকায় বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির তৃণমূল ভিত্তি দুর্বল করার অপচেষ্টা চালাচ্ছেন।

মেয়রের বিস্ফোরক বক্তব্যের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ওসি আবদুর রহিমকে বদলি করে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চে (সিটিএসবি) সংযুক্ত করা হয়।

এই তড়িঘড়ি বদলি প্রসঙ্গে সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী বলেন, এটি সম্পূর্ণ একটি নিয়মিত বদলি প্রক্রিয়া। মেয়র কী বক্তব্য দিয়েছেন তা আমার জানা নেই।

অন্যদিকে নিজের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিষয়ে বিদায়ী ওসি আবদুর রহিম কোনো প্রকার মন্তব্য করতে রাজি হননি।

মতিঝর্ণা এলাকার অভিযান প্রসঙ্গে সিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও অপারেশন) ফয়সাল আহমেদ নিশ্চিত করেন, পুলিশ একটি অভিযানের স্বার্থেই সেখানে গিয়েছিল, বিশেষ কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

হঠাৎ এই প্রশাসনিক পরিবর্তন এবং রাজনৈতিক বক্তব্যের জোয়ার চট্টগ্রাম নগরজুড়ে নতুন আলাপের জন্ম দিয়েছে, যার রেশ সহজে থামছে না।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি