চট্টগ্রাম বন্দরনগরীর পাহাড়তলী থানার মৌসুমী আবাসিক এলাকার একটি ছিমছাম সংসার। এই সংসারের অভিভাবক প্রায় এক দশক ধরে প্রবাসের কর্মব্যস্ততায় দিন কাটাচ্ছেন দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে।
হাজার মাইল দূরত্বে থেকেও প্রবাসের ঘামঝরা উপার্জনে সচল ছিল এই পরিবারের চাকা। কিন্তু একটি মাত্র ফোনালাপ চোখের পলকে সেই শান্ত পরিবারে নামিয়ে আনে অন্ধকারের চাদর।
প্রবাসীর মোবাইল হ্যাক করে নিখুঁত এক প্রতারণার জালে সর্বস্বান্ত করা হলো তাঁর ঘরের মানুষকে।
যেভাবে শুরু ঘটনার সূত্রপাত
গত ২৮ অক্টোবর, সকাল ৯টা। চট্টগ্রাম নগরীর পাহাড়তলী থানায় তখন সবেমাত্র সকালের রোদ ছড়িয়েছে। ঠিক সেই মুহূর্তে প্রবাসীর স্ত্রী ৫৪ বছর বয়সী কোহিনুর আক্তারের মুঠোফোনে ভেসে ওঠে একটি নম্বর।
স্ক্রিনে ফুটে ওঠা নম্বরটি অচেনা নয়-এটি তাঁর দক্ষিণ আফ্রিকা প্রবাসী স্বামীরই ব্যবহৃত নম্বর। ফোন তুলতেই অপর প্রান্ত থেকে ভেসে আসে উৎকণ্ঠা ছড়ানো এক কণ্ঠস্বর।
বলা হয়, প্রবাসীর কাগজপত্রে বড় ধরনের গুরুতর সমস্যা দেখা দিয়েছে এবং এই মুহূর্তে দক্ষিণ আফ্রিকা পুলিশ তাঁকে আটক করেছে।
বিদেশের মাটিতে প্রিয় মানুষটি পুলিশি হেফাজতে-এমন সংবাদ একজন স্ত্রীর মনে কেমন ঝড় তুলতে পারে? আতঙ্কে স্তব্ধ হয়ে পড়েন কোহিনুর আক্তার।
বিদেশের আইন বা প্রশাসনের জটিলতা বুঝতে না পেরে তিনি তখন পুরোপুরি দিশেহারা। আর ঠিক এই মুহূর্তটির জন্যই ওত পেতে ছিল নিখুঁত এক প্রতারক চক্র।
আতঙ্কের সুযোগে ধাপে ধাপে টাকা লোপাট
প্রবাসীর স্ত্রীর আতঙ্ককে পুঁজি করে প্রতারকেরা ফাঁদ আরও শক্ত করে। পুলিশি ঝামেলা থেকে স্বামীকে দ্রুত মুক্ত করার কথা বলে প্রথমে ৫০ হাজার টাকা দাবি করা হয়। স্বামীর জীবন ও বিপদের কথা ভেবে সরল বিশ্বাসে মুহূর্তের কথা না ভেবে কোহিনুর আক্তার ০১৮৭৯৪৪৫৯৬০ নম্বরে সেই টাকা বিকাশ করে দেন।
কিন্তু লোভি চক্রের ক্ষুধা এতটুকুতে মেটেনি। মুহূর্তের মধ্যে আরও ৫১ হাজার টাকা দাবি করে বসেন তারা। বিপদগ্রস্ত স্ত্রীর মনে তখন একটাই চিন্তা-যাতে স্বামীর কোনো ক্ষতি না হয়। এই অন্ধ বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে ০১৬২৩৪৪…৮০ নম্বরের মাধ্যমে আরও ৫১ হাজার টাকা পাঠিয়ে দেন তিনি।
এভাবে মাত্র দুই ধাপে সর্বমোট ১ লাখ ১ হাজার টাকা চলে যায় অচেনা পকেটে। টাকা পাঠানোর পরপরই যখন ওই নম্বরগুলোতে পুনরায় যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়, তখন প্রতিটি নম্বরই বন্ধ পাওয়া যায়। তখনই মেরুদণ্ড দিয়ে বয়ে যায় ঠান্ডা স্রোত-বুঝতে বাকি থাকে না যে প্রতারণার শিকার হয়েছেন তিনি।
প্রতারণার নির্মম বাস্তবতা ও পুলিশের পদক্ষেপ
পরবর্তীতে স্বামীর সঙ্গে নানা মাধ্যমে যোগাযোগ করে জানা যায় এক নির্মম সত্য। তাঁর মোবাইলটি হ্যাক করা হয়েছিল এবং পুরোটাই ছিল একটি সংঘবদ্ধ সাইবার অপরাধী চক্রের সুনিপুণ কারসাজি।
দূর প্রবাস থেকে কোনো পুলিশ তাঁকে আটক করেনি, বরং শত শত মাইল দূরে বসে থাকা স্বামীর পরিচলনার মাধ্যমটিই হাতিয়ার বানিয়েছিল প্রতারকেরা।
এ ঘটনায় সর্বস্ব হারানো প্রবাসীর স্ত্রী কোহিনুর আক্তার গত ২৮ অক্টোবর পাহাড়তলী থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।
পাহাড়তলী থানার পুলিশ জানিয়েছে, অভিযোগটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রযুক্তির সহায়তায় প্রতারক চক্রটিকে শনাক্ত করে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি


