২৫ মে ২০২৬। দিনটি হওয়ার কথা ছিল এক মায়ের জীবনের সবচেয়ে আনন্দের দিন। চট্টগ্রামের সার্জিস্কোপ হাসপাতালে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে পাঁচলাইশ থানাধীন এলাকার বাসিন্দা মো. ইফতেখার হোসেন ও আমাতুল মাকনুন দম্পতির কোল আলো করে জন্ম নেয় ফুটফুটে এক পুত্রসন্তান।
কিন্তু জন্মের পরপরই অক্সিজেনজনিত জটিলতা ও নিউমোনিয়ার কারণে নবজাতকটিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রামের বায়েজিদ থানাধীন আরেফিন নগর বায়েজিদ লিংক রোডে অবস্থিত সাজিনাজ হাসপাতাল লিমিটেডের (Shajinaz Hospital Limited) নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (NICU)-এ স্থানান্তর করা হয়।
সেখান থেকেই শুরু হয় এক পরিবারের দীর্ঘ, বেদনাময় এবং শেষ পর্যন্ত মর্মান্তিক যাত্রা।
গত শুক্রবার (১২ জুন) রাত ১১টা ২ মিনিটে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে Amatul Maknun (আমাতুল মাকনুন) নামের একটি আইডি থেকে দেওয়া এক পোস্টে শিশুটির মা অভিযোগ করেন, সাজিনাজ হাসপাতালের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা, দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসকদের অবহেলা, ভুল চিকিৎসা এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নানা অনিয়মের কারণে তাঁর সন্তানের মৃত্যু হয়েছে।
পোস্টে তিনি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন।
চিকিৎসা শুরু, তারপর বদলে যায় পরিস্থিতি:
পোস্টে উল্লেখিত-পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী, সাজিনাজ হসপিটালের শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. ফয়সাল আহমেদের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা শুরু হয়।
শিশুটির মা বলেন, প্রতিদিন নির্ধারিত সময়ে তারা সন্তানের খোঁজ নিতে যেতেন। ধীরে ধীরে শিশুটির অবস্থার উন্নতিও হচ্ছিল।
পরে কোরবানির ঈদের ছুটিতে তিনি ঢাকায় গেলে চিকিৎসার দায়িত্ব নেন ইম্পেরিয়াল হাসপাতালের শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. আনোয়ার হোসেন এবং সংশ্লিষ্ট ডিউটি চিকিৎসকেরা।
পঞ্চম দিনে হাসপাতালের এক চিকিৎসক তাঁদের জানান, শিশুটিকে NICU থেকে কেবিনে স্থানান্তরের প্রস্তুতি চলছে।
সেদিনই প্রথমবারের মতো কিছুটা স্বস্তি পেয়েছিলেন মা। কিন্তু সেই স্বস্তি বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি।
এ বিষয়ে ডা. ফয়সাল আহমেদের বক্তব্য জানতে তার মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রতিবেদককে উল্টো প্রশ্ন করে আপনার সঙ্গে কেন কথা বলবো, আপনি কে? এমন ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করে ফোন কেটে দেন।
‘হাতে ব্যান্ডেজ কেন?’—সন্দেহের শুরু:
মায়ের ভাষ্য অনুযায়ী, সন্তানের সঙ্গে কিছুক্ষণ সময় কাটানোর সময় তিনি লক্ষ্য করেন, শিশুটির বাম হাতে ব্যান্ডেজ বাঁধা রয়েছে। কারণ জানতে চাইলে তাঁকে বলা হয়, ‘কিছু না।’ পরদিন পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে যায়।
পরিবারের অভিযোগ, ডা. ফয়সাল আহমেদ তাঁদের ডেকে শিশুটির হাত দেখান। তখন দেখা যায়, বাম হাতের নিচের অংশ এবং কয়েকটি আঙুল অস্বাভাবিকভাবে কালো হয়ে গেছে।
মা দাবি করেন, আগের দিন এমন কোনো লক্ষণ ছিল না।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, চিকিৎসকদের কাছে কারণ জানতে চাইলে প্রথমদিকে বিষয়টিকে তেমন গুরুতর নয় বলে উপস্থাপন করা হয়। পরে চিকিৎসকদের কেউ কেউ পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্বীকার করেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
ক্যানোলা-সংক্রান্ত জটিলতা থেকেই কি গ্যাংগ্রিন?
পরিবারের অভিযোগ, শিশুটির হাতে ব্যবহৃত ক্যানোলা বা শিরায় প্রবেশ করানো লাইনের কারণে জটিলতা তৈরি হয়ে থাকতে পারে, যা পরে গ্যাংগ্রিনে রূপ নেয়।
তাদের দাবি, সময়মতো প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা, পর্যবেক্ষণ এবং বিশেষায়িত ব্যবস্থাপনা নেওয়া হয়নি। পরিস্থিতি গুরুতর হওয়ার পরও দ্রুত ঢাকায় রেফার না করে স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে ডা. আনোয়ার হোসেনের সাথে যোগোযোগ করা হলে এখন এসব বিষয় নিয়ে কথা বলার সময় নেই মন্তব্য করে তিনি প্রতিবেদককে তার অফিসে দেখা করার কথা বলে ফোন কেটে দেন।
ঢাকা যাওয়ার আগে অস্ত্রোপচার নিয়ে প্রশ্ন?
পরিবার জানায়, পরিস্থিতির অবনতি ঘটলে ভাসকুলার সার্জন ডা. মিনহাজসহ কয়েকজন বিশেষজ্ঞকে ডাকা হয়। কিছু চিকিৎসার পর সাময়িক উন্নতির আভাস পাওয়া গেলেও পরদিন শিশুটির অবস্থার আরও অবনতি ঘটে।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, ঢাকায় নেওয়ার সিদ্ধান্তের আগে আরেকটি অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দেওয়া হয়। এ সময় পেডিয়াট্রিক সার্জন ডা. আদনান ওয়ালিদকে ডেকে একটি ছোট অপারেশন করা হয়।
তবে পরে ঢাকার কয়েকটি হাসপাতালের চিকিৎসকেরা ওই অস্ত্রোপচারের পদ্ধতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন বলে দাবি করেছে পরিবার।
সময়ের সঙ্গে দৌড়: চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা:
আইসিইউ অ্যাম্বুলেন্সে প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টার যাত্রা শেষে নবজাতকটিকে প্রথমে ঢাকার ইবনে সিনা হাসপাতালে নেওয়া হয়।
সেখানে ব্যান্ডেজ খোলার পর যে দৃশ্য তারা দেখেছেন, সেটিকে পরিবার ‘দুঃস্বপ্নের চেয়েও ভয়াবহ’ বলে বর্ণনা করেছে।
তাদের দাবি, তখন গ্যাংগ্রিন কবজি পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল এবং সংক্রমণ শরীরের অন্যান্য অঙ্গেও প্রভাব ফেলতে শুরু করেছিল।
পরে শিশুটিকে এভারকেয়ার হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।
শেষ চেষ্টা: হাত কেটে ফেলার সিদ্ধান্ত:
পরিবারের দাবি, এভারকেয়ার হাসপাতালের চিকিৎসকেরা শিশুটিকে বাঁচানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন।
কিন্তু তখন পরিস্থিতি এতটাই জটিল হয়ে পড়েছিল যে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনতে আক্রান্ত হাত অপসারণ ছাড়া আর কোনো কার্যকর বিকল্প ছিল না।
একজন মায়ের জন্য এমন সিদ্ধান্ত ছিল অত্যন্ত কঠিন। তবুও সন্তানের জীবন বাঁচানোর আশায় পরিবার সম্মতি দেয়।
গত ৩ জুন নবজাতকটির আক্রান্ত হাত অপসারণ করা হয়। পরিবার ভেবেছিল, হয়তো এবার সন্তানটি বেঁচে যাবে। কিন্তু সেই আশাও টিকল না।
অপারেশনের পরদিন শিশুটির শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। রক্তচাপ কমে যায়, শরীরের রঙ পরিবর্তিত হতে থাকে, লিভার ও পেট ফুলে ওঠে। একপর্যায়ে হৃদ্যন্ত্রে একাধিক জটিলতা দেখা দিলে মৃত্যু হয় নবজাতকটির।
সামাজিক মাধ্যমে ঝড়:
ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দীর্ঘ পোস্ট দেন শিশুটির মা। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পোস্টটি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। হাজার হাজার প্রতিক্রিয়া, মন্তব্য ও শেয়ারে বিষয়টি ছড়িয়ে পড়ে।
অনেকেই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানান। কেউ কেউ দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কী বলছে?
নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় হাসপাতালের প্রশাসনিক দায়িত্বশীলদের বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়।
এ বিষয়ে চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলামের বক্তব্য পাওয়া গেলে হুবহু যুক্ত করা হবে।
প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। এমনকি ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাইফুল ইসলাম এবং পরিচালক হাসান মাহমুদ চৌধুরীর সাথেও যোগাযোগ করে ব্যর্থ হয়েছে প্রতিবেদক।
তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাদের সাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের অফিসিয়াল পেইজে এ বিষয়ে একটি বিবৃতি দিয়েছেন।
এতে সাজিনাজ হাসপাতাল লিমিটেড কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, নবজাতকটি ২৫ মে রাতে তাদের NICU-তে ভর্তি হওয়ার সময় থেকেই শ্বাসকষ্ট ও নিউমোনিয়াজনিত জটিলতায় ভুগছিল।
হাসপাতালের ভাষ্য অনুযায়ী, ভর্তির সময় শিশুটির বাম হাতের উপরের অংশে (হাত, বাহু ও কবজি) উল্লেখযোগ্য ফোলা ছিল, যা পূর্ববর্তী হাসপাতাল থেকে স্থানান্তরের সময় থেকেই বিদ্যমান ছিল এবং বিষয়টি শিশুর অভিভাবককে অবহিত করা হয়েছিল।
কর্তৃপক্ষের দাবি, ভর্তির পর বাম হাতে থাকা বাইরের ক্যানোলা অপসারণ করা হয় এবং আক্রান্ত অঙ্গ নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। পরবর্তী সময়ে বাম হাতে আর কোনো ক্যানোলা ব্যবহার করা হয়নি।
ফোলা ও রক্ত সঞ্চালনজনিত জটিলতার সম্ভাবনা বিবেচনায় প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, ড্রেসিং, অঙ্গ উঁচু করে রাখা এবং বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা চালানো হয়।
হাসপাতাল জানায়, ৩০ ও ৩১ মে শিশুটির হাতে রক্ত সঞ্চালনের অবনতির লক্ষণ দেখা দিলে শিশু সার্জন, ভাসকুলার সার্জন ও শিশু বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
পরবর্তীতে একাধিক বিশেষজ্ঞের পরামর্শে ১ জুন শিশুটির হাতে জরুরি ফ্যাসিওটমি (Fasciotomy) করা হয়। তাদের দাবি, অস্ত্রোপচারের পর হাতের রঙ ও রক্ত সঞ্চালনে সাময়িক উন্নতির লক্ষণ দেখা গিয়েছিল।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, উন্নততর চিকিৎসার জন্য পরবর্তীতে শিশুটিকে ঢাকার একটি উচ্চতর চিকিৎসাকেন্দ্রে রেফার করা হয়।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, পুরো চিকিৎসা প্রক্রিয়ায় অভিভাবকদের নিয়মিতভাবে রোগীর অবস্থা সম্পর্কে অবহিত করা হয়েছে এবং চিকিৎসক দল সর্বোচ্চ পেশাগত সতর্কতা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে চিকিৎসা প্রদান করেছে।
তবে শেষ পর্যন্ত শিশুটিকে বাঁচানো সম্ভব না হওয়ায় তারা গভীর দুঃখ প্রকাশ করেছে এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছে।
এদিকে সাজিনাজ হাসপাতালের বিবৃতির প্রেক্ষিতে নিহত নবজাতকের মা হিসেবে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রতিবেদকের কাছে তুলে ধরেছেন।
তিনি বলেন, পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের বক্তব্য অনুযায়ী, শিশুটিকে সাজিনাজ হাসপাতালে নেওয়ার সময় তার হাতে কোনো ধরনের সমস্যা বা দৃশ্যমান ক্ষত ছিল না। হাসপাতালে ভর্তির পর আমাদের পরিবারের একজন সদস্যকে শিশুর সম্পূর্ণ শারীরিক অবস্থা দেখানো হয়। তখন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষই আমাদের শিশুর পায়ে একটি দাগ দেখিয়ে বলেন। যদি হাতে কোনো সমস্যা বা জটিলতা তখন থেকেই থেকে থাকে, তবে সেটিও নিশ্চয়ই তখন আমাদের জানানো হতো। বিষয়টি যাচাই করতে হাসপাতালের সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করলেই প্রকৃত ঘটনা স্পষ্ট হয়ে যাবে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ভর্তি হওয়ার প্রথম দিন থেকে চতুর্থ দিন পর্যন্ত হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বা চিকিৎসকদের পক্ষ থেকে শিশুর হাতে কোনো সমস্যা আছে বলে আমাদের কখনো জানানো হয়নি। যদি এমন কোনো জটিলতা শুরু থেকেই থাকত, তাহলে তা আমাদের সঙ্গে শেয়ার করা হতো এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষাও করা হতো।
প্রশ্ন হলো, যদি প্রথম দিন থেকেই এমন সমস্যা থেকে থাকে, তাহলে শিশুর হাত সংক্রান্ত কোনো পরীক্ষা কেন করা হয়নি?
প্রতিদিন ডা. আনোয়ার আমাদের শিশুর শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে ব্রিফ করতেন। কিন্তু চতুর্থ দিন পর্যন্ত কেউ আমাদের হাতে কোনো জটিলতার কথা জানাননি।
পঞ্চম দিনে আমি শিশুকে দেখতে গিয়ে তার বাম হাতে ব্যান্ডেজ দেখতে পাই। বিষয়টি নিয়ে ডিউটি চিকিৎসকের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “কোনো সমস্যা নেই।”
কিন্তু পরদিন, অর্থাৎ ৩০ তারিখ সকালে ডা. ফয়সাল এসে প্রথমবারের মতো আমাদের হাতে হওয়া ক্ষতির বিষয়টি দেখান। তখন হাতের অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয় ছিল।
সেদিন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আমাদের জানান যে, চট্টগ্রামে এই সমস্যার প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি নেই। তাই শিশুটিকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
আমরা ঢাকায় নেওয়ার প্রস্তুতি নিলেও পরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আরও কয়েকজন চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে নতুন একটি চিকিৎসা পদ্ধতি শুরু করেন।
কিছুটা উন্নতির লক্ষণ দেখা গেলে তারা আমাদের অনুরোধ করেন আরেকটি দিন সময় দেওয়ার জন্য। সেই অনুরোধে আমরা সাড়া দিই।
কিন্তু ৩১ তারিখ সকালে শিশুর অবস্থার আরও অবনতি হলে আমরা চূড়ান্তভাবে ঢাকায় নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিই।
এ সময় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানান, দীর্ঘ যাত্রা শিশুর জন্য সহনীয় করতে একটি অস্ত্রোপচার প্রয়োজন।
আমরা চিকিৎসকদের পরামর্শে তাতেও সম্মতি দিই। কিন্তু পরবর্তীতে আমাদের ধারণা হয়েছে যে, ওই অস্ত্রোপচারটি সঠিকভাবে সম্পন্ন হয়নি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ওই দিন অস্ত্রোপচারের পরপরই আমরা হাসপাতাল থেকে রিলিজ নিয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হই। হাসপাতাল ত্যাগ করার আগে সাজিনাজ হাসপাতালের ডা. জুবায়েরের ফোন থেকে আমি ডা. আনোয়ারের সঙ্গে কথা বলি।
তখন আমি জানতে চাই কেন আমার শিশুর সমস্যার বিষয়টি আগে থেকে আমাদের জানানো হয়নি এবং কেন আমি দুই দিন আগে হাসপাতালে এসেও তাঁর সঙ্গে দেখা করতে পারিনি। এ সংক্রান্ত কথোপকথনের রেকর্ড এবং সেদিনের পরিস্থিতি হাসপাতালের সিসিটিভি ফুটেজে থাকার কথা।
আমরা বিশ্বাস করি, সিসিটিভি ফুটেজ, চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথিপত্র এবং সংশ্লিষ্ট রেকর্ডসমূহ নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা করা হলে প্রকৃত ঘটনা সবার সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
পরিবারের দাবি, এখনো বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর মেলেনি—শিশুটির হাতে কীভাবে গ্যাংগ্রিন তৈরি হলো? কখন প্রথম জটিলতা শনাক্ত করা হয়েছিল? পরিবারকে শুরু থেকেই বিষয়টি স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছিল কি? প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা যথাসময়ে করা হয়েছিল কি? ঢাকায় রেফারের সিদ্ধান্ত আরও আগে নেওয়া উচিত ছিল কি? অপারেশন ও পরবর্তী চিকিৎসা আন্তর্জাতিক ও জাতীয় চিকিৎসা-প্রোটোকল অনুযায়ী হয়েছিল কি না?
তদন্তই দিতে পারে উত্তর:
নবজাতকের মৃত্যুর এই ঘটনায় সাজিনাজ হাসপাতাল লিমিটেডের ডা. আনোয়ার হোসেন, ডা. ফয়সাল আহমেদ, সংশ্লিষ্ট ডিউটি চিকিৎসক এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা এখনো স্বাধীনভাবে যাচাই হয়নি।
চিকিৎসা অবহেলার অভিযোগ সত্য কি না, তা নির্ধারণ করবে স্বাধীন মেডিকেল বোর্ড, সংশ্লিষ্ট তদন্ত সংস্থা কিংবা আদালত।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—একটি পরিবার তাদের সন্তানকে হারিয়েছে। সেই শোকের গভীরতা কোনো তদন্ত, কোনো মামলা কিংবা কোনো রায় দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়।
আজও মায়ের বুকের ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছে একটি প্রশ্ন—“যে সন্তানকে কোলে নিয়ে বাড়ি ফেরার স্বপ্ন দেখেছিলাম, সে কেন ফিরল নিথর হয়ে?”
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি

