রেলে আধুনিকায়নের নামে চলছে রাষ্ট্রীয় অর্থের হরিলুট!

৭০ বছরের পুরোনো ইঞ্জিনে ভরসা

প্রকাশিত: ২৭ জুলাই, ২০২৬ ১২:২৬

হাজার হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প, বহরে নতুন উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ইঞ্জিন সংযোজন আর বিশ্বমানের যাত্রীসেবার নানা প্রতিশ্রুতি-বাংলাদেশ রেলওয়েকে ঘিরে স্বপ্নের কমতি নেই।

তবে দৃশ্যমান সব আয়োজনের নেপথ্যে ঢাকা পড়েছে এক ভয়ংকর ও করুণ বাস্তব চিত্র। সরকারি অর্থের হরিলুট, চরম প্রশাসনিক অদক্ষতা এবং দুর্বল জবাবদিহির কারণে দেশের অন্যতম বৃহত্তম এই রাষ্ট্রীয় সেবা খাত আজ চরম সংকটে।

একদিকে হাজার কোটি টাকার বাজেট বরাদ্দ, অন্যদিকে একের পর এক বিকল ইঞ্জিন। একদিকে আধুনিকায়নের ঘোষণা, অন্যদিকে ১ কোটি টাকার যন্ত্রাংশ ৮ কোটি টাকায় কেনার নজিরবিহীন দুর্নীতি।

সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত অচলাবস্থায় থমকে গেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে।

কাগজে শত কোটি টাকার যন্ত্রাংশ, গুদামে শূন্যতা

দেশীয় সক্ষমতা বাড়ানো এবং বিদেশের ওপর নির্ভরতা কমানোর মূল লক্ষ্য নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছিল চট্টগ্রামের পাহাড়তলী এবং নীলফামারীর সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানা।

উদ্দেশ্য ছিল নিজস্ব কারখানায় প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ তৈরি করা, যাতে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের পাশাপাশি রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ও এক ধাক্কায় নেমে আসে। তবে বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো।

কারখানা দুটিতে বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত এবং প্রতি বছর তাদের পেছনে রাষ্ট্রের কোটি কোটি টাকা ব্যয় হলেও সেখানে চাহিদামাফিক যন্ত্রাংশ উৎপাদিত হয় না। কারখানা পরিচালনার জন্য আলাদা বরাদ্দ নেওয়া হয় ঠিকই, কিন্তু বাস্তবে যন্ত্রাংশের প্রায় পুরোটাই চড়া দামে বিদেশ থেকে আমদানি করা হচ্ছে।

সবচেয়ে চমকে ওঠার মতো তথ্য হলো, রেজিস্টার বা স্টোরের খাতায় যে শত শত কোটি টাকার যন্ত্রাংশ মজুত দেখানো হয়, সরেজমিনে গুদামে সেগুলোর বড় একটি অংশের কোনো অস্তিত্বই পাওয়া যায় না। স্টোর ফাঁকা রেখে নথিপত্রে ‘মজুত’ দেখানোর এই ভূতুড়ে কারবার দীর্ঘদিন ধরেই চলছে।

রেলের বহরের করুণ চিত্র:
পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চল মিলিয়ে মোট ২৭১টি ইঞ্জিনের একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে অকেজো।
আধুনিক ‘৩০০০ সিরিজ’: ২০২০ সালে কেনা ৩০টি কোটি টাকার নতুন ইঞ্জিনের একটি বড় অংশই এখন বিকল হয়ে পড়ে আছে।
বাধ্য হয়ে ১৯৫০ এর দশকে আসা (সাত দশকের পুরোনো) ইঞ্জিন জোড়াতালি দিয়ে চালানো হচ্ছে।

বিশেষ করে পাহাড়তলী ডিজেল শপের অধীনে থাকা বহু ইঞ্জিন কেবল সাময়িক যন্ত্রাংশের অভাবে মাসের পর মাস মেরামতের অপেক্ষায় পচছে। যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে ট্রেন চলাচলের সময়সূচিতে, চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ যাত্রী ও ব্যবসায়ীরা।

পদোন্নতি পাচ্ছেন দুর্নীতির কারিগরেরা

রেলওয়ের ক্রয় প্রক্রিয়া ও যন্ত্রাংশ কেনাকাটা যেন রূপ নিয়েছে অনিয়মের এক নিরাপদ অভয়ারণ্যে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বাজারদরের তোয়াক্কা না করে ইচ্ছেমতো দরে কেনাকাটা চলায় প্রতি বছর হাতবদল হচ্ছে রাষ্ট্রের বিপুল পরিমাণ অর্থ।

সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এমন এক পশমে শিহরিত হওয়ার মতো তথ্য।

বাজারে যে ‘ডায়েচ ডিজেল ইঞ্জিনের’ স্পেয়ার পার্টসের আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ১ কোটি টাকা, রেলওয়ের দরপত্রে সেই একই পার্টস কেনা হয়েছে প্রায় ৮ কোটি টাকায়! অর্থাৎ, একটি কেনাকাটাতেই প্রায় ৭ কোটি টাকার অতিরিক্ত অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও সিন্ডিকেট ঠিকাদারদের একটি অসাধু চক্র।

দুদক ইতোমধ্যে দরপত্রের নথি, মূল্যায়ন প্রতিবেদন ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের তথ্য তলব করলেও সংশ্লিষ্ট মহল বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার নানা চেষ্টা চালাচ্ছে।

নজিরবিহীন এই লুটপাটের চেয়েও ভয়াবহ দিক হলো, এসব অনিয়মের বিপরীতে দৃষ্টান্তমূলক কোনো শাস্তির নজির নেই।

অভিযোগ রয়েছে-বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে অনিয়মের খবর প্রকাশিত হলেও অদৃশ্য শক্তিবলে তদন্ত প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করা হয়। তদন্ত শেষে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে তাদের বদলি কিংবা পদোন্নতি দিয়ে পুরস্কৃত করাটাই যেন রেলের নিয়মে পরিণত হয়েছে।

সংকট অর্থের, নাকি সদিচ্ছার?

রেলওয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা অবশ্য সব দায় চাপাচ্ছেন অর্থ সংকট, সময়মতো বরাদ্দ না পাওয়া এবং তীব্র জনবল সংকটের ওপর। তাদের দাবি, শেষ মুহূর্তে অর্থ ছাড় হওয়ায় এবং আমদানিনির্ভরতার কারণে কেনাকাটায় বিলম্ব হয়।

তবে খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও প্রকৌশলীরা এই অজুহাত পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাদের মতে, সংকট অর্থের নয়, সংকট স্বচ্ছতা ও নিয়তের।

প্রতি বছর সরকার যে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দিচ্ছে, তার একটি বড় অংশই অনিয়ম ও দুর্নীতির আবর্তে তলিয়ে যাচ্ছে। মানসম্মত যন্ত্রাংশ ব্যবহার করে পাহাড়তলী ও সৈয়দপুর কারখানাকে সচল রাখা গেলে বিদেশের ওপর নির্ভরতা অর্ধেকেরও নিচে নেমে আসতো।

বাংলাদেশ রেলওয়েকে বাঁচাতে হলে কেবল নতুন ইঞ্জিন কেনা বা মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করলেই চলবে না।

প্রয়োজন ক্রয় প্রক্রিয়ায় শতভাগ স্বচ্ছতা ও ডিজিটাল তদারকি, কেনাকাটায় অনিয়মে জড়িত কর্মকর্তা-ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও কঠোর আইনি শাস্তি এবং দেশীয় কারখানা দুটিকে আধুনিকায়ন করে পূর্ণাঙ্গ উৎপাদনে ফেরানো।

অন্যথায়, প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকা গলে পানি হবে, দুর্নীতিবাজদের পকেট ভারী হবে। আর ভর্তুকির অতল গহ্বরে তলিয়ে যাবে সাধারণ মানুষের এই ভরসাস্থল।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি