বন্দরনগরী চট্টগ্রামের ১ লাখ ৪ হাজার ৫১১টি সুপেয় পানির সংযোগের ওপর ঝুলছে নতুন এক আতঙ্কের খড়্গ। যে পানি জীবনের প্রতীক, সেই পানিই এখন চট্টগ্রামবাসীর জন্য নিঃশব্দ আর্থিক রক্তক্ষরণের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সংস্থাতোর রাজস্ব বিভাগের পক্ষ থেকে গ্রাহক পর্যায়ে পানির দাম আরও ৫ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব এসেছে। আপাতদৃষ্টিতে ৫ শতাংশ একটি ছোট সংখ্যা মনে হলেও, এটিই হতে যাচ্ছে বিগত দেড় দশকের দীর্ঘ শোষণের সর্বশেষ আঘাত।
১ লাখ পরিবারে দুশ্চিন্তার ছায়া
ওয়াসার নিজস্ব মাসিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংস্থাটির মোট গ্রাহক সংযোগের প্রায় ৯৩ শতাংশই সাধারণ আবাসিক। ফলে এই মূল্যবৃদ্ধির চাবুক মূলত আছড়ে পড়বে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত গৃহস্থালিগুলোর পিঠে।
২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে এক লফটে পানির দাম বাড়ানো হয়েছিল ৩৮ শতাংশ! তখন আবাসিক গ্রাহকদের জন্য প্রতি এক হাজার লিটারের দাম বেড়ে দাঁড়ায় ১৮ টাকা এবং বাণিজ্যিক গ্রাহকদের জন্য ৩৭ টাকা। সেই রিশকের রেশ কাটতে না কাটতেই আবারও পকেট কাটার বন্দোবস্ত করা হচ্ছে।
২০০৯ সালের স্মৃতি মনে করলে শিউরে উঠতে হয়-তখন যেখানে এক হাজার লিটার পানির দাম ছিল মাত্র ৫ টাকা ৪১ পয়সা, আজ তা ১৮ টাকা পেরিয়ে আরও উঁচুতে ওঠার অপেক্ষায়। এটি কি কেবলই মূল্যবৃদ্ধি, নাকি কোনো পূর্বপরিকল্পিত অর্থনৈতিক নির্যাতন?
চট্টগ্রাম ওয়াসার পানির মূল্যের ক্রমবিকাশ (আবাসিক ও বাণিজ্যিক)
-------------------------------------------------------------
বছর আবাসিক (প্রতি ১০০০ লি.) বাণিজ্যিক (প্রতি ১০০০ লি.)
২০০৯ ৫.৪১ টাকা ১৫.৩২ টাকা
২০১৪ ৬.৯০ টাকা ১৯.৫৯ টাকা
২০২০ ১২.৪০ টাকা ৩০.৩০ টাকা
২০২২ (জানু) ১৩.০০ টাকা ৩১.৮২ টাকা
২০২২ (সেপ্টে) ১৮.০০ টাকা ৩৭.০০ টাকা
ওয়াসার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তারা যুক্তি দিচ্ছেন-ভূগর্ভস্থ নলকূপ বন্ধ করে নদীর পানি শোধনের ফলে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। সঙ্গে যোগ হয়েছে বিদেশি ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ।
কিন্তু নগরবাসীর প্রশ্ন খুব সহজ, ওয়াসার মেগা অবকাঠামো প্রকল্পের শত শত কোটি টাকার অনিয়ম ও ঋণের বোঝা সাধারণ গ্রাহক কেন নিজের রক্তের ঘামে মেটাবে?
পরিশোধিত পানির মান নিয়ে যেখানে প্রতিনিয়ত প্রশ্ন ওঠে, নলের মুখ দিয়ে অনেক সময় ড্রেনের দুর্গন্ধযুক্ত ঘোলা পানি আসে-সেখানে সেবার মান না বাড়িয়ে বারবার দাম বাড়ানোর এই অসম প্রতিযোগিতা কতটা নৈতিক?
আজ শনিবার দুপুরে ওয়াসার প্রধান কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বোর্ড সভায় তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত না নিয়ে চার সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
উপব্যবস্থাপনা পরিচালক বিষ্ণু কুমার দে’কে আহ্বায়ক এবং প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা রুমন’দে, বোর্ড সদস্য বেগম সৈয়দা জেরিন হোসেন ও রাসেল মিয়াকে সদস্য করে গঠিত এই কমিটি বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামত নেবে।
ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম মো. জানে আলম আশ্বাস দিয়ে বলেছেন, আইন অনুযায়ী প্রতিবছর ৫ শতাংশ দাম বাড়ানোর সুযোগ থাকলেও সব পক্ষের মতামত নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে।
তবে অতীত অভিজ্ঞতা বলে, এ ধরনের মতামত গ্রহণের প্রক্রিয়া প্রায়শই একটি আনুষ্ঠানিকতা বা ‘আইওয়াশ’ এ পরিণত হয়।
যে আইনের দোহাই দিয়ে প্রতিবছর ৫ শতাংশ দাম বাড়ানোর সুযোগ খোঁজা হয়, সেই আইনে কি গ্রাহককে ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন ও বিশুদ্ধ পানি দেওয়ার কোনো বাধ্যতামূলক ধারা নেই?
যেখানে সাধারণ মানুষ নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতিতে নাভিশ্বাস তুলছে, সেখানে জীবনধারণের মৌলিক উপাদান ‘পানি’কে এভাবে বাণিজ্যিক পণ্য বানিয়ে ফায়দা লোটার চেষ্টা অনভিপ্রেত। এই মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব চট্টগ্রামবাসীর স্বস্তির ওপর সরাসরি আঘাত।
ওয়াসার অদক্ষতা, অপচয় এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের দীর্ঘসূত্রতার দায় কেন গ্রাহকের ঘাড়ে চাপানো হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখতে অবিলম্বে স্বাধীন ও উচ্চপর্যায়ের তদন্ত প্রয়োজন।
না হলে, জীবনদায়ী এই পানিই শেষ পর্যন্ত বন্দরনগরীর মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় অভিশাপ হয়ে দাঁড়াবে।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি

