সময় তখন দুপুর সোয়া দুইটা। চীন থেকে আসা ১ হাজার ২৮২ একক আমদানি পণ্যভর্তি বিশাল আকৃতির একটি জাহাজ ভিড়ছিল চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনালে (এনসিটি)।
কিন্তু চট্টগ্রাম বন্দরের প্রধান প্রবেশপথ বা চ্যানেলে ঢুকতেই ঘটল চরম বিপত্তি-হঠাৎ বিকল হয়ে পড়ল ১ হাজার ২৮২ টিইইউএস কন্টেইনারবাহী মাল্টার পতাকাবাহী জাহাজ ‘সিএনসি ইউরেনাস’ এর স্টিয়ারিং!
স্টিয়ারিং ফেল করে চাবিহীন গাড়ির মতো নিয়ন্ত্রণে হারায় বিশাল এই জাহাজটি। চট্টগ্রাম বন্দর হলো বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি বা ‘লাইফলাইন’, যেখান দিয়ে দেশের ৯২ শতাংশ পণ্য আমদানি-রপ্তানি পরিবাহিত হয়।
এই সংকীর্ণ চ্যানেলে যদি কন্টেইনারবাহী এই বিদেশি জাহাজটি আড়াআড়িভাবে আটকে যেত, তবে মুহূর্তেই অচল হয়ে পড়ত পুরো দেশের বৈদেশিক বাণিজ্য। থমকে যেত হাজার হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড।
তবে সেই সম্ভাব্য মহাবিপর্যয় থেকে অল্পের জন্য রক্ষা পেয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর।
নিয়ন্ত্রণ হারানোর পর বিশাল জাহাজটি নদীর স্রোতে ভাসতে ভাসতে মোহনার বাইরে চলে যায়। প্রায় ৪০ মিনিটের এক শ্বাসরুদ্ধকর ভাসমান যাত্রা শেষে শেষমেশ পতেঙ্গা নেভাল একাডেমির পশ্চিম পাশে সাগরের চরে গিয়ে আটকে পড়ে জাহাজটি।
আকস্মিক এই ভাটার কারণে পানির গভীরতা কম থাকায় জাহাজটি চরে আটকে যায়। নৌ-বিশেষজ্ঞদের মতে, ঠিক ওই মুহূর্তে ভাটা না থাকলে কিংবা গভীর পানি থাকলে বড় ধরনের সংঘর্ষ ও প্রাণহানির মতো বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারত।
ঘটনায় জাহাজে থাকা হাজার কোটি টাকা মূল্যের আমদানি পণ্যের কোনো ক্ষতি হয়েছে কিনা তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া না গেলেও, স্বস্তির খবর হলো-জাহাজে থাকা বিদেশি নাবিকদের সবাই সম্পূর্ণ নিরাপদে ও অক্ষত আছেন।
দুর্ঘটনার তথ্য নিশ্চিত করে চট্টগ্রাম বন্দরের সদস্য (হারবার ও মেরিন) কমডোর আহমেদ আমিন আবদুল্লাহ জানান, সব নাবিক নিরাপদে আছেন। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, বন্দরের মূল প্রবেশপথ বা চ্যানেল সম্পূর্ণ সচল রয়েছে। জাহাজটিতে কিছু যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিয়েছিল।
আমাদের মেরিন বিভাগের টিম টাগবোট নিয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছেছে। বর্তমানে নদীতে ভাটা চলায় পরবর্তী জোয়ারের সময় জাহাজটি উদ্ধারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
এদিকে ঘটনা ঘটার পরপরই চট্টগ্রাম বন্দরের চারটি শক্তিশালী টাগবোট এবং মেরিন বিভাগের চারজন অভিজ্ঞ পাইলট দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে জাহাজটির নিরাপদ নোঙর নিশ্চিত করতে ও উদ্ধারকাজ চালাতে নিরলসভাবে কাজ করছেন।
একটি বড় বিপর্যয় এড়ানো গেলেও এই ঘটনাটি ফের মনে করিয়ে দিল-দেশের অর্থনৈতিক লাইফলাইন চট্টগ্রাম বন্দরের চ্যানেলে সামান্যতম যান্ত্রিক ত্রুটিও কতটা বড় ঝুঁকিসৃষ্টি করতে পারে। তবে দ্রুত পদক্ষেপ ও প্রকৃতির কৃপায় এ যাত্রায় এক বড় অর্থনৈতিক ধস থেকে বেঁচে গেল বাংলাদেশ।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি

