চট্টগ্রাম নগরীর ময়লা অপসারণের কাজে ব্যবহৃত যেসব পুরোনো গাড়ি বহু আগেই পথচলতি মানুষের বিরক্তির কারণ হয়েছে, সেগুলোকে কেন্দ্র করেই এবার সাজানো হয়েছে এক বিপুল অঙ্কের ‘সংস্কার নাট্যানুষ্ঠান’।
সিটি করপোরেশনের (চসিক) যান্ত্রিক বিভাগ একসঙ্গে ৪৬টি কাজের দরপত্র আহ্বান করেছে। যার সিংহভাগই জরাজীর্ণ ময়লার গাড়ি মেরামত, যন্ত্রাংশ সরবরাহ ও রংচঙ করার নামে। তবে এই দরপত্রের ভেতরে প্রবেশ করতেই বেরিয়ে আসছে একের পর এক অসংগতি, রহস্যময় পুনরাবৃত্তি এবং অবিশ্বাস্য তড়িঘড়ি।
একই গাড়িতে দুই রূপ, একই কাজের পুনর্বৃত্তায়ন
বিজ্ঞপ্তিটির তালিকা গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে চমকে ওঠার মতো তথ্য মেলে। ২৭৪৩৬২ চেসিস নম্বরের একটি আইশার ময়লার গাড়ি সংস্কারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে আলাদাভাবে দুবার। দুই ক্ষেত্রেই গাড়িটির ইঞ্জিন, গিয়ারবক্স, বডি ও কেবিন সংস্কারের বিশাল তালিকা দেওয়া হয়েছে।
প্রশ্ন উঠছে, একই গাড়ির সম্পূর্ণ সংস্কার কাজ কেন দুটি পৃথক প্যাকেজে বিভাজিত করা হলো? এটি কি কেবলই খসড়া তৈরির সময়কার প্রাতিষ্ঠানিক অসাবধানতা, নাকি একই কাজের অর্থ দুবার তোলার কোনো সূক্ষ্ম ছক?
শুধু এই একটি গাড়িই নয়,একটি প্যাকেজে ৩৬টি গাড়ি ও একটি মোটরসাইকেলের জন্য বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রাংশ সরবরাহের কথা বলা হয়েছে। আরেকটিতে ২৬টি গাড়ির যন্ত্রাংশ সরবরাহের কথা রয়েছে। অন্য প্যাকেজে ২৪টি গাড়ির যন্ত্রাংশ সরবরাহ, আবার কোথাও ২৩টি, ১২টি, ৫টি গাড়ি ও একটি মোটরসাইকেলের বিভিন্ন অংশ সংস্কার বা সরবরাহের কথা বলা হয়েছে।
এ ছাড়া ২২টি ইঞ্জিন ট্রলির বিভিন্ন যন্ত্রাংশ সরবরাহ, ১০টি ইঞ্জিন ট্রলির পুরো বডি সংস্কার এবং ১৫টি ময়লার কনটেইনার মেরামতের জন্যও পৃথক কাজ রাখা হয়েছে।
অর্থাৎ একটি দরপত্র বিজ্ঞপ্তির মধ্যেই চসিকের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার যানবাহন ও যন্ত্রপাতির বড় একটি অংশকে মেরামত ও যন্ত্রাংশ সরবরাহের আওতায় আনা হয়েছে। এভাবে খুচরো ও পাইকারি প্যাকেজ বানিয়ে যেভাবে শত শত যন্ত্রাংশ কেনার আয়োজন চলছে, তা সাধারণ রক্ষণাবেক্ষণকে ছাড়িয়ে বড় ধরনের আর্থিক শুভঙ্করের ফাঁকিকেই নির্দেশ করে।
১ ঘণ্টার ব্যবধান ও ব্যয়ের আড়াল
গত ১৯ আগস্ট চসিক যান্ত্রিক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী রুবেল চন্দ্র দাসের স্বাক্ষরিত এই দরপত্র বিজ্ঞপ্তিতে দরপত্র দলিল কেনার সময় নির্ধারণ করা হয়েছে ৩০ আগস্ট দুপুর ১টা এবং জমার শেষ সময় একই দিন দুপুর ২টা।
সরকারি ই-জিপি প্রক্রিয়ার অজুহাত দেওয়া হলেও, ৪৬টির মতো পৃথক ও জটিল কাজের দরপত্র জমার জন্য মাত্র এক ঘণ্টার ব্যবধান রাখা অত্যন্ত নজিরবিহীন ও রহস্যজনক।
তার চেয়েও বড় ভয়ংকর তথ্য হলো-বিজ্ঞপ্তির কোথাও এই ৪৬টি প্যাকেজের আনুমানিক বা প্রাক্কলিত ব্যয়ের কোনো হিসাব উল্লেখ নেই।সূত্র-টিডিএস
জরাজীর্ণ যে গাড়িগুলোর বর্তমান বাজারমূল্য হয়তো কয়েক লাখ টাকায় নেমে এসেছে, সেগুলোর পেছনে সরকারি কোষাগার থেকে কত কোটি টাকা ঢালা হচ্ছে, তা নগরবাসীর কাছে পুরোপুরি অস্পষ্ট রাখা হয়েছে।
ভাঙাড়ি দামে কেনা গাড়িতে সোনা বাঁধানোর চেষ্টা?
ল্যান্ডফিলে ব্যবহৃত আনন্দবাজারের চেইনচালিত স্কেভেটর থেকে শুরু করে আরেফিন নগরের লং-বুম এক্সকাভেটর কিংবা ধাতব ও স্টিলের কনটেইনার-কিছুই বাদ পড়েনি এই তালিকায়।
বর্জ্য অপসারণের গাড়ি ও যন্ত্রপাতি সচল রাখা নিঃসন্দেহে জরুরি, কিন্তু বড় প্রশ্ন হলো-এসব বহু পুরোনো গাড়ির আয়ুষ্কাল আর কত দিন বাকি?
নতুন একটি গাড়ি কেনার খরচের সঙ্গে এই মেরামত ব্যয়ের কোনো তুলনামূলক গাণিতিক বিশ্লেষণ বা কারিগরি রিপোর্ট কি আদৌ তৈরি করা হয়েছে? নাকি লক্কড়ঝক্কড় গাড়ি সচল রাখার দোহাই দিয়ে সরকারি অর্থকে অনির্দিষ্টকালের জন্য মেরামতের খাদে ফেলে দেওয়া হচ্ছে?
যন্ত্রাংশের মান নিয়ন্ত্রণ ও কার্যক্ষমতা পরীক্ষার সুস্পষ্ট রূপরেখা ছাড়া এত বিশাল আয়োজনের অর্থ একটাই-মেরামতের কিছুদিন পরেই গাড়িগুলো আবার অচল হবে, আর ফের শুরু হবে দরপত্রের নামান্তর হরিলুট।
বর্জ্য মুক্ত পরিচ্ছন্ন নগরী গড়ার চটকদার বিজ্ঞাপনের পেছনে এই ৪৬ দরপত্রের গোলকধাঁধা নিয়ে এখন স্বাধীন ও নিরপেক্ষ কারিগরি তদন্ত সময়ের দাবি।
এসব বিষয়ে জানতে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন যান্ত্রিক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী রুবেল চন্দ্র দাসের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করেও সংযোগ পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে তার হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বারে কিছু প্রশ্ন রেখে বার্তা পাঠিয়ে বেশ কয়েকদিন অপেক্ষা করার পরও তার কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে তিনি বক্তব্য দিলে তা প্রতিবেদনে সংযুক্ত করা হবে।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি

