বাংলাদেশ রেলওয়ের চট্টগ্রাম ট্রাফিক বিভাগের অধীন পটিয়া রেলওয়ে স্টেশনে দায়িত্ব পালনের চেয়ে অনিয়ম আর অনুপস্থিতির অভিযোগই যেন এখন মুখ্য হয়ে উঠেছে।
স্টেশন মাস্টার আব্দুস সালাম ভূঁঞার বিরুদ্ধে একের পর এক গুরুতর অনিয়ম, কর্মস্থলে অনুপস্থিতি এবং নিয়মবহির্ভূতভাবে হাজিরার স্বাক্ষর দেখিয়ে নিয়মিত সরকারি বেতন-ভাতা উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে।
এতে শুধু প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়েনি, নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়েছে শাখা লাইনের ট্রেন চলাচল।
অনুসন্ধান ও সংগৃহীত নথিপত্র বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, ডিউটি রোস্টার ও প্রশাসনিক নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই দীর্ঘদিন ধরে কর্মস্থল ফাঁকি দিয়ে আসছেন পটিয়া স্টেশন মাস্টার আব্দুস সালাম ভূঁঞা।
অভিযোগ রয়েছে, কোনো ধরনের কন্ট্রোল অর্ডার (উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি বা নির্দেশ) ছাড়াই তিনি দিনের পর দিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকেন।
গত ৫ থেকে ৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কোনো কন্ট্রোল অর্ডার ছাড়াই তিনি কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন বলে অভিযোগকারীদের দাবি। এর আগে আগস্ট মাসের ৮ ও ৯ তারিখেও একই কায়দায় কন্ট্রোল অর্ডার ছাড়াই নৈমিত্তিক ছুটি (সিএল) ভোগ করার প্রমাণ মিলেছে।
সবচেয়ে গুরুতর অনিয়ম ধরা পড়েছে গত ৭ আগস্টের দাপ্তরিক নথিতে। ওই দিন স্টেশন টিএসআর (ট্রেন রেজিস্ট্রেশন ও মুভমেন্ট রেজিস্টার) শিটে তাঁর অনুপস্থিতির সুস্পষ্ট তথ্য থাকলেও, হাজিরা খাতায় দেখা গেছে তাঁর উপস্থিতির স্বাক্ষর।
দায়িত্ব পালনকালে নিজের স্টেশনে অবস্থান না করে আব্দুস সালামকে প্রায়শই চট্টগ্রাম অফিসে বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তার (ডিটিএ) দপ্তর, বিভিন্ন চলন্ত ট্রেন ও অন্যান্য স্টেশনে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়।
কিন্তু যথাসময়ে হাজিরা খাতায় ঠিকই উঠে যায় তাঁর স্বাক্ষর, যা সরকারি অর্থ আত্মসাত ও চরম দাপ্তরিক জালিয়াতির শামিল।
স্টেশন মাস্টারের এমন দায়িত্বজ্ঞানহীনতায় কার্যতঃ অভিভাবকহীন হয়ে পড়েছে পটিয়া স্টেশন। তাঁর অনুপস্থিতিতে ট্রেন চালনাসংক্রান্ত অতীব গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল দাপ্তরিক কাজগুলো চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে নিম্নপদের কর্মচারীদের ওপর। সূত্র-আরএন২৪
পটিয়া ও পার্শ্ববর্তী স্টেশনে কর্মরত পয়েন্টসম্যান ও পোর্টাররা চরম ক্ষোভের সাথে জানান, স্টেশন মাস্টার উপস্থিত না থাকায় টিএসআর চালনা, পিএলসি (প্রাইভেট নম্বর আদান-প্রদান) এবং লাইন ক্লিয়ার দেওয়ার মতো কারিগরি কাজগুলো বাধ্য হয়ে তাদেরই করতে হয়। এসব কাজ চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের এখতিয়ারভুক্ত না হলেও, চাকরি হারানোর ভয়ে তারা ঝুঁকি নিয়ে কাজগুলো করছেন।
শুধু পটিয়া নয়, শাখা লাইনের একাধিক স্টেশনে রাত ও সকালের ট্রেন চলাচলের সময় এবং মেইন লাইনের কিছু স্টেশনের রাতের ডিউটিতেও কোন স্টেশন মাস্টারের উপস্থিতি থাকে না বলে অভিযোগ উঠেছে।
অন্যদিকে, রেলওয়েজুড়ে ধূমপানবিরোধী সচেতনতা কার্যক্রম বহাল থাকলেও পটিয়া স্টেশন মাস্টারের নিজস্ব কক্ষটিকে তিনি ধূমপানের ব্যক্তিগত জোন বানিয়ে ফেলেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে, যার একাধিক স্থিরচিত্র সংক্ষুব্ধদের কাছে সংরক্ষিত আছে।
রেলওয়ের দায়িত্বশীল একটি সংগঠনের এক প্রতিনিধি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, চট্টগ্রাম ট্রাফিক বিভাগের একটি প্রভাবশালী চক্রকে ‘ম্যানেজ’ করেই দীর্ঘদিন ধরে এই অনিয়ম চালিয়ে যাচ্ছেন সালাম। এ কারণেই অনিয়মের সুস্পষ্ট প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ তাঁর বিরুদ্ধে সময়মতো কোনো ব্যবস্থা নেয় না।
প্রশ্ন উঠছে-কর্মস্থলে উপস্থিতি ও নিরাপত্তা তদারকির জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত চট্টগ্রাম ট্রাফিক বিভাগের প্রশাসনিক নজরদারি ব্যবস্থা কি তবে কেবল কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ?
রেলওয়ের সচেতন মহল ও ভুক্তভোগী কর্মচারীদের দাবি, ব্যক্তিগত বা দাপ্তরিক প্রভাবের উর্ধ্বে উঠে অবিলম্বে এক নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটির মাধ্যমে আব্দুস সালাম ভূঁঞার এই দীর্ঘদিনের অনুপস্থিতি, ভুয়া হাজিরা এবং বেতন উত্তোলনের মতো গুরুতর অপরাধের সঠিক তদন্ত করতে হবে।
পাশাপাশি শাখা লাইনসহ প্রতিটি স্টেশনে রাতের ডিউটিতে স্টেশন মাস্টারের সশরীরে উপস্থিতি নিশ্চিত করতে কঠোর প্রশাসনিক নজরদারি জোরদার করা জরুরি।
এসব চাঞ্চল্যকর অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে পটিয়া স্টেশন মাস্টার আব্দুস সালাম ভূঁঞার সাথে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে তার বক্তব্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনে সংযুক্ত করা হবে।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি


