পাহাড়ের সবুজ আর ঝর্ণার জলধারার মোহনীয় রূপ মুহূর্তেই রূপ নিয়েছিল বিভীষিকাময় এক ফাঁদে। চট্টগ্রামের পন্থীছিলার বিখ্যাত ‘ঝরঝরি ঝর্ণা’ দেখার আনন্দ হঠাৎ করেই পরিণত হয় বাঁচার এক চরম আকুতিতে।
পথ ভুলে গহিন অরণ্যে হারিয়ে যাওয়া দুই তরুণ যখন জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে, ঠিক তখনই ৯৯৯-এর একটি কল আর পুলিশের রুদ্ধশ্বাস ছায়াবৃত্ত বদলে দিল সব দৃশ্যপট।
ঘটনাটি ঘটে গত শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর)। চট্টগ্রাম শহরের ফ্রীপোর্ট এলাকা থেকে অ্যাডভেঞ্চারের টানে সীতাকুণ্ডের ঝরঝরি ঝর্ণায় ঘুরতে এসেছিলেন দুই কলেজ শিক্ষার্থী-শ্রাবণ দেব (১৯) ও মো. সিয়াম (১৯)।
দুপুর ৩টার দিকে পাহাড় ও ঝর্ণার সৌন্দর্য উপভোগ শেষে লোকালয়ে ফেরার পথ ধরেন তাঁরা। কিন্তু প্রকৃতির চোখধাঁধানো সৌন্দর্যের আড়ালে যে দিকভ্রান্তির ফাঁদ পাতা ছিল, তা বুঝতে পারেননি এই দুই তরুণ।
ঘন জঙ্গল আর দুর্গম পাহাড়ের আঁকাবাঁকা পথে ভুল দিকে পা বাড়াতেই বদলে যায় পরিবেশ। চারপাশের চেনা পথ হারিয়ে যায় অদেখা বৃক্ষরাজির আড়ালে।
মুহূর্তের মধ্যেই তাঁরা বন্দি হয়ে পড়েন সীতাকুণ্ডের অবারিত, দুর্গম গহিন পাহাড়ে। মোবাইল ফোনে নেটওয়ার্ক না থাকায় পরিবারের সাথে যোগাযোগও পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। সময় গড়ায়, পাহাড়ি পথ ধরে নেমে আসে নিকষ অন্ধকার আর এক অজানা আতঙ্ক।
দীর্ঘ ক্ষণের ব্যাকুল অপেক্ষার পর অবশেষে পাহাড়ের এক কোণে মোবাইলের সিগন্যাল ভেসে ওঠে। এক মুহূর্ত দেরি না করে তাঁরা জাতীয় জরুরি সেবা ‘৯৯৯’-এ কল করে নিজেদের বিপদের কথা জানান।
খবর পাওয়ামাত্রই সীতাকুণ্ড মডেল থানা-পুলিশ কালবিলম্ব না করে এক উদ্ধার অভিযানের নকশা আঁকে।
তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় ট্র্যাকিং করে গহিন পাহাড়ে তাঁদের সম্ভাব্য অবস্থান চিহ্নিত করা হয়। এরপর স্থানীয় অভিজ্ঞ পথপ্রদর্শকদের সঙ্গে নিয়ে পুলিশের একটি চৌকস দল নেমে পড়ে অন্ধকার পাহাড়ের গা ছমছমে অভিযানে।
দীর্ঘ ছয় ঘণ্টার এক চরম অনিশ্চয়তা ও রুদ্ধশ্বাস অভিযানের পর, শনিবার দিনগত রাত ১টার দিকে পাহাড়ি অরণ্যের অন্ধকার চিরে আলোর দেখা মেলে।
পুলিশ সদস্যরা নিখোঁজ দুই শিক্ষার্থীকে সম্পূর্ণ সুস্থ ও জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করতে সক্ষম হন।
উদ্ধার অভিযানের সফল সমাপ্তি নিয়ে সীতাকুণ্ড মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মহিনূল ইসলাম জানান, পর্যটক নিখোঁজের তথ্য পাওয়ার পরপরই আমাদের একটি বিশেষ দল ঘটনাস্থলে পৌঁছায়।
প্রযুক্তি ও স্থানীয়দের সহায়তায় রুদ্ধশ্বাস অভিযানের পর তাঁদের নিরাপদে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। প্রাথমিক সহায়তা শেষে তরুণদের তাঁদের পরিবারের জিম্মায় হস্তান্তর করা হয়েছে।
প্রকৃতির রূপ দেখতে গিয়ে জীবন যেন হুট করে থমকে না যায়-সে বিষয়ে সতর্ক করে পুলিশ প্রশাসন থেকে পাহাড়ি ঝর্ণা ও দুর্গম এলাকায় ভ্রমণের সময় পর্যাপ্ত সতর্কতা অবলম্বন এবং স্থানীয় অভিজ্ঞদের পরামর্শ মেনে চলার জোরালো আহ্বান জানানো হয়েছে।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি


