সীতাকুণ্ডে ফেরদৌস স্টিলের আস্পর্ধা-১০ লাশের ওপর দাঁড়িয়ে প্রভাবের মহড়া!

মৃত্যুকূপ ঢাকা দেওয়ার চক্রান্ত,কার শক্তিতে বেপরোয়া

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ০৪ অক্টোবর, ২০২৬ ১৫:১৮

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীতে ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজে বিষাক্ত হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাসে ১০ জন শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যুর পর দেড় মাসের বেশি সময় পার হয়েছে।

কিন্তু যে মর্মান্তিক ঘটনার পর নিরপেক্ষ বিচার, আইনানুগ ব্যবস্থা ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের কথা ছিল, তা এখন ঢাকা পড়েছে ক্ষমতাবান মালিকপক্ষের প্রভাব, চতুর কৌশল ও আইনি আবর্জনায়।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে-আদালতের নিষেধাজ্ঞা উড়িয়ে দেওয়া, ন্যায্য ক্ষতিপূরণ না দিয়ে ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারগুলোকে জিম্মি করা, পরিবেশ অধিদপ্তরকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন এবং কতিপয় গণমাধ্যমকর্মী ও প্রভাবশালী মহলকে সামলে নিয়ে ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার এক ভয়ঙ্কর নীল নকশা।

দুর্ঘটনার পরপরই ইয়ার্ডটির কার্যক্রম স্থগিত ও সিলগালা করার নির্দেশনা আসে এবং আদালত থেকেও সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন।

আদালতের নির্দেশনাকে তোয়াক্কা না করেই নেপথ্যে কার্যক্রম সচল রাখার চেষ্টা এবং সার্বিক পরিদর্শনের নামে মূল অপরাধ আড়াল করার অভিযোগ উঠেছে।

তিনটি সরকারি সতর্কতা, একটি শ্রম আদালতের মামলা, পরিবেশগত ছাড়পত্রের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়া, গ্যাস-ফ্রি সনদ নিয়ে প্রশ্ন এবং শ্রমিক তালিকায় অসঙ্গতির তথ্য সামনে আসার পর এখন প্রশ্ন উঠছে-এটি কি শুধু একটি দুর্ঘটনা, নাকি একের পর এক সতর্কবার্তা উপেক্ষার পরিণতি?

ঘটনার সকাল, ‘রুটিন’ কাজেই বিষাক্ত মৃত্যু

১৪ আগস্ট সকাল সাড়ে ৮টার দিকে ফেরদৌস স্টিলের ইয়ার্ডে ভাঙার জন্য রাখা LNG carrier MT Rasi-এর একটি ব্যালাস্ট ট্যাংকে শ্রমিকেরা কাজ করছিলেন। ট্যাংকের ভেতরে জমে থাকা পানি/স্লাজের কারণে হাইড্রোজেন সালফাইড (H₂S) গ্যাস তৈরি হয়েছিল বলে পরবর্তী তদন্তে উঠে আসে।

তদন্তে দেখা যায়, ট্যাংকে ছিদ্র করার কাজটিকে ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষের কাছে প্রায় ‘রুটিন’ কাজ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল। কিন্তু এটি ছিল একটি confined space-যেখানে প্রবেশের আগে এবং কাজ চলাকালে অক্সিজেন, বিষাক্ত ও দাহ্য গ্যাস পরীক্ষা করার প্রয়োজন ছিল।

সরকারি তদন্ত কমিটির তথ্য অনুযায়ী, সেদিন কাজে নিয়োজিত শ্রমিকদের হাতে পর্যাপ্ত গ্যাস মাস্ক বা SCBA ছিল না। এমনকি উদ্ধারকারীদের ক্ষেত্রেও যথাযথ শ্বাস-সুরক্ষা সরঞ্জামের ঘাটতি ছিল। ঘটনাস্থলে নিরাপত্তা ব্যবস্থাপক, অ্যাম্বুলেন্স, চিকিৎসক কিংবা জরুরি উদ্ধার দলও ছিল না।

প্রথমে ঘটনাস্থলেই কয়েকজন শ্রমিক মারা যান। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও একজনের মৃত্যু হয়। সব মিলিয়ে নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় ১০। এই মৃত্যুর ঘটনাটি আরও বেদনাদায়ক হয়ে ওঠে যখন জানা যায়-কাজটি যে দিন চলছিল, সেটি ছিল সাপ্তাহিক ছুটির দিন।

দুর্ঘটনার এক মাস আগে মামলা-তবু কেন নিরাপত্তা ঘাটতি রইল?

কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (ডিআইএফঈ-DIFE) এর নথি অনুযায়ী, ফেরদৌস স্টিলে কর্মপরিবেশ ও পেশাগত নিরাপত্তা নিয়ে চলতি বছরে একাধিকবার পরিদর্শন হয়। ২ ফেব্রুয়ারি নিরাপত্তা ঘাটতি সংশোধনের নির্দেশ দেওয়া হয়। ৪ মে পুনঃপরিদর্শনে দেখা যায়, আগের নির্দেশ বাস্তবায়িত হয়নি।

৮ জুন আবারও অগ্নি ও পেশাগত নিরাপত্তা জোরদারের নির্দেশ দেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত ১৫ জুলাই শ্রম আদালতে মামলা করে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (ডিআইএফঈ-DIFE)। তার মাত্র এক মাসের মধ্যে ঘটে ১০ শ্রমিকের মৃত্যু।

এ ঘটনায় বিশেষজ্ঞরা মালিকপক্ষ ছাড়াও রাষ্ট্রীয় তদারকি ব্যবস্থার কাছেও প্রশ্ন ছুড়ে দেন। তাদের জানার আগ্রহ, ফেব্রুয়ারির নির্দেশ বাস্তবায়ন হয়নি, এটি মে মাসে ধরা পড়ল। মে মাসেও বাস্তবায়ন হয়নি-জুনে আবার নির্দেশ দেওয়া হলো। জুলাইয়ে মামলা হলো।

কিন্তু মামলা করার পরও ইয়ার্ডে উচ্চঝুঁকির কাজ কীভাবে চলতে থাকল? কোন কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছিল যে মামলা চলাকালে শ্রমিকদের জীবন নিরাপদ আছে?

আদালতের নির্দেশনা: বাস্তবায়ন কোথায়?

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) দুর্ঘটনার পর আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন তুলে আইনি নোটিশ দেয়।

বেলার দাবি, জাহাজ কাটার আগে গ্যাস-ফ্রি সনদ, পরিবেশ সুরক্ষা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও শ্রমিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে উচ্চ আদালতের ধারাবাহিক নির্দেশনা রয়েছে।

বেলা আরও অভিযোগ করেছে, সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলো এসব নির্দেশনা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করেনি এবং বিদ্যমান তদন্তগুলোর নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

এখানে ‘আদালত অবমাননা হয়েছে’ কিনা সংশ্লিষ্ট আদেশের সার্টিফাইড কপি (certified copy) এবং তার বাস্তবায়ন নথি পরীক্ষা করলেই আসল সত্য উন্মোচন হবে দাবি বেলার।

গ্যাস-ফ্রি সনদেও প্রশ্ন

সরকারি তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ‘এমটি রাসি’ এর গ্যাস-ফ্রি সনদ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তদন্ত কমিটি দেখতে পেয়েছে, বহুজাতিক পরিদর্শন, পণ্য পরীক্ষা এবং সার্টিফিকেশন (সনদ প্রদানকারী) সংস্থা Intertek এর সনদে (গ্রহণযোগ্য-acceptable) উল্লেখ থাকলেও সব ট্যাংক বাস্তবে পরিদর্শন করা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে যায়। সনদে হাইড্রোজেন সালফাইড (H₂S) এবং কার্বন মনোক্সাইড (CO) পরীক্ষা করা হয়নি বলেও তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে।

অন্যদিকে বাংলাদেশ জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ আইন, ২০১৮ ও The Ship Breaking and Recycling Rules-2011 এর বিষয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিস্ফোরক পরিদপ্তর-এর দায়িত্বের মধ্যে জাহাজের বিভিন্ন ট্যাংক পরীক্ষা করে “মানব প্রবেশের উপযোগী-Safe for Man Entry” এবং “Gas Free for Hot Work” সনদ দেওয়ার বিষয় রয়েছে।

তাহলে প্রশ্ন, একটি জাহাজকে নিরাপদ ঘোষণা করার পরও কীভাবে একটি ব্যালাস্ট ট্যাংকের ভেতরে প্রাণঘাতী গ্যাস জমে রইল?

আরও গুরুত্বপূর্ণ-সনদ দেওয়ার সময় সব ঝুঁকিপূর্ণ স্থান বাস্তবে পরীক্ষা করা হয়েছিল কি না? পরীক্ষার পদ্ধতি কী ছিল? গ্যাস শনাক্তকরণে কী যন্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিল? সেই যন্ত্রের calibration record কোথায়? এই প্রশ্নগুলোর উত্তরও পরিস্কার না হওয়া পর্যন্ত শুধু ইয়ার্ড মালিককে দায়ী করে তদন্ত শেষ করলে পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না।

পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্রের মেয়াদ শেষ-তবু কাটিং চলছিল

দুর্ঘটনার সবচেয়ে গুরুতর প্রশাসনিক তথ্যগুলোর একটি হলো-ইয়ার্ডের পরিবেশগত ছাড়পত্রের মেয়াদ চলতি বছরের ১২ আগস্ট শেষ হয়ে যায়। দুর্ঘটনা ঘটে ১৪ আগস্ট। পরিবেশগত ছাড়পত্রের মেয়াদ শেষ হওয়া সত্ত্বেও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশেই কারখানা চালানো হচ্ছিল।

১৯ আগস্ট পরিবেশ অধিদপ্তর ফেরদৌস স্টিলকে ৫ লাখ টাকা জরিমানা করে এবং নবায়ন না হওয়া পর্যন্ত জাহাজ কাটার কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয়। অধিদপ্তরের আদেশে বলা হয়, নবায়িত ছাড়পত্র ছাড়া ‘এমটি রাসি’ কাটার কাজ চলছিল।

বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫-এর ধারা ৭ অনুযায়ী পরিবেশের ক্ষতির ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ ও সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে। একই আইনে জাহাজ কাটা বা ভাঙার ফলে ঝুঁকিপূর্ণ বর্জ্য থেকে পরিবেশ দূষণ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি না করার বাধ্যবাধকতাও রয়েছে।

অতচ পরিবেশ অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ শিপ রিসাইক্লিং বোর্ডের একাধিক নির্দেশনার পরও মালিকপক্ষ ন্যূনতম নিরাপত্তা মানদণ্ড অর্জন করেনি।

বিষাক্ত ‘রাসি’ জাহাজটিকে গ্যাস-মুক্তকরণ (Gas-Free Certification) না করেই কাটার অনুমতি কীভাবে মিলল-সে প্রশ্নের নিরপেক্ষ উত্তর আজও অধরা।

কাগজে শ্রমিক, মাঠে কারা?

সরকারি তদন্তের আরেকটি চমকপ্রদ তথ্য-দুর্ঘটনার দিন ইয়ার্ডে কর্মরত শ্রমিকদের তালিকা এবং বাংলাদেশ শিপ রিসাইক্লিং বোর্ডে জমা দেওয়া অনুমোদিত তালিকার মধ্যে বড় ধরনের অসঙ্গতি ছিল।

তদন্ত কমিটির তথ্য অনুযায়ী, প্রথমে মারা যাওয়া পাঁচ শ্রমিকের মধ্যে একজন ছাড়া বাকিদের নাম অনুমোদিত manpower list-এ ছিল না। দুর্ঘটনার দিনের প্রকৃত attendance sheet-ও তদন্ত কমিটির সামনে দেখাতে পারেনি ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষ। বাইরের শ্রমিকদের নথি দুর্ঘটনার পর নষ্ট হয়ে যাওয়ার দাবি করা হয়।

এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শ্রমিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে প্রথমেই জানতে হবে-কাজ করছে কে?

এখন লেবার ইন্সপেকশন ম্যানেজমেন্ট অ্যাপ্লিকেশন (LIMA) তে প্রতিষ্ঠানটি নিবন্ধিত থাকা, আর দুর্ঘটনার দিন বাস্তবে কারা কাজ করছিল-এই দুটি বিষয়কে এক করে দেখার সুযোগ নেই।

তাই LIMA-র রেকর্ড, বাংলাদেশ শিপ রিসাইক্লিং বোর্ড (BSRB) এর অনুমোদিত manpower list, ইয়ার্ডের attendance register, contractor/sub-contractor list এবং নিহতদের নিয়োগ/মজুরি সংক্রান্ত নথি একসঙ্গে যাচাই করা প্রয়োজন।

প্রতিষ্ঠনটির একাধিক শ্রমিক নাম প্রকাশ না করার সর্তে প্রতিবেদকের কাছে বলেছেন, কাগজে শ্রমিকের সংখ্যা এক, মাঠে আরেক। এখন দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্থদের দায় কার?

লেবার ইন্সপেকশন অ্যাপ্লিকেশনে মিথ্যা তথ্যের ভেলকি

কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের ‘লেবার ইন্সপেকশন ম্যানেজমেন্ট অ্যাপ্লিকেশন’ (LIMA)-এ ডিজিটালাইজেশনের দোহাই দিয়ে কাগজে-কলমে কারখানাটিকে সুশৃঙ্খল হিসেবে দেখানোর ডিজিটাল চক্রান্ত ধরা পড়েছে।

অ্যাপ্লিকেশনে শ্রমিক সংখ্যা, কাজের পরিবেশ এবং দৈনিক নিরাপত্তা চেকলিস্ট সংক্রান্ত যে তথ্য আপলোড করা হয়েছে, তার সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল নেই।

ঝুঁকিপূর্ণ কাজে কতজন নিয়োজিত ছিলেন এবং তাদের ব্যক্তিগত সুরক্ষাসামগ্রী (PPE) ছিল কিনা-তা সম্পূর্ণ অসত্যভাবে নিবন্ধিত করা হয়েছে, যা শ্রম আইন ২০০৬-এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সঙ্গে জঘন্য প্রতারণা।

মালিকপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা কতদূর?

শিল্প মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি ইয়ার্ড মালিকের বিরুদ্ধে Ship Breaking and Recycling Rules, 2011 অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে।

তদন্তে নিরাপত্তা সরঞ্জামের ঘাটতি, জরুরি উদ্ধারব্যবস্থার অনুপস্থিতি, manpower list-এর অসঙ্গতি, পরিবেশগত ছাড়পত্রের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও কার্যক্রম এবং ছুটির দিনে ঝুঁকিপূর্ণ কাজের কথা উঠে এসেছে। কিন্তু এখানেই প্রশ্ন: সুপারিশের পর বাস্তবে কী ব্যবস্থা হয়েছে?

বরং মালিকপক্ষের বিরুদ্ধে কোনো নতুন ফৌজদারি মামলার তথ্য নেই, গ্রেপ্তার হয়নি মালিক বা ব্যবস্থাপনার কেউ। এমনকি ঘটনার চার্জশিট হয়েছে কিনা তাও কারো জানা নেই। শ্রম আদালতের মামলার অগ্রগতি সম্পর্কেও কোন তথ্য গণমাধ্যমে প্রকাশ করেননি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়।

পরিদর্শনের নাটকীয়তা ও অসাধু আঁতাত

অবশ্য আইনি সংকট থেকে বাঁচতে ও সাধারণ মানুষের চোখে ধুলো দিতে সরকারি উচ্চপর্যায়ের কতিপয় কর্মকর্তা ও মন্ত্রী-আমলাদের দিয়ে ইয়ার্ডে বিশেষ ‘পরিদর্শন সাজানো’র অভিযোগ উঠেছে।

অনিয়মে জর্জরিত এই স্থানটিকে হঠাৎ ‘শৃঙ্খল ও নিয়ম মেনে চলা ইয়ার্ড’ হিসেবে জাহির করার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে দাবি অনেকের।

একই সঙ্গে, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতাকে রুদ্ধ করতে এবং প্রকৃত চিত্র আড়াল করতে কতিপয় সুযোগ সন্ধানী গণমাধ্যমকর্মীকে বিশেষ সুবিধায় ‘ম্যানেজ’ করার অভিযোগও করেছে ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারের স্বজন ও স্থানীয়রা।

যার ফলে দুর্ঘটনার মূল কারণ ও মালিকপক্ষের প্রত্যক্ষ অবহেলার বিষয়টি মূলধারার আলোচনা থেকে সরিয়ে নেওয়ার একটা সুসংগঠিত চক্রান্ত স্পষ্ট।

ইয়ার্ড বন্ধ-কিন্তু পুনরায় চালুর প্রস্তুতি কেন?

দুর্ঘটনার পর BSRB ফেরদৌস স্টিলের সব কার্যক্রম স্থগিত করে এবং পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ইয়ার্ড বন্ধ রাখার কথা জানায়। তবে শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, বন্ধ ইয়ার্ডগুলো শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পর পুনরায় চালু করা হবে। একই সময়ে ফেরদৌস স্টিল ইয়ার্ড পুনরায় চালুর জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও তিনি বলেন।

বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) বিকেলে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার শীতলপুরে পিএইচপি শিপইয়ার্ড ও কবির স্টিল রিসাইক্লিং ইয়ার্ড পরিদর্শন শেষে মতবিনিময়কালে শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেছেন, সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীতে ফেরদৌস স্টিল শিপইয়ার্ডে সম্প্রতি দুর্ঘটনায় ১০ শ্রমিক নিহত হন।ফেরদৌস শীপ ইয়ার্ড

এরপর থেকে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। এর ফলে প্রায় অর্ধশত শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। এসব শ্রমিকের দুর্ভোগের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বন্ধ প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম দ্রুত চালুর উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানান মন্ত্রী।

তবে শিল্পের বিকাশের সঙ্গে শ্রমিকদের নিরাপত্তা এবং উন্নত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার বিষয়টিকেও গুরুত্ব দিতে হবে বলেও মত প্রকাশ করেন তিনি।

এসময় চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মাহবুব আলম এবং বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসবিআরএ) প্রেসিডেন্ট মো. মহসিনসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ৩ অক্টোবর পর্যন্ত ইয়ার্ড চালু হয়নি, বরং পুনরায় চালুর প্রস্তুতি/প্রক্রিয়ার কথা প্রকাশ্যে এসেছে।

ভয়ংকর মৃত্যুফাঁদে পরিণত ফেরদৌস স্টিল শিপইয়ার্ডটির কার্যক্রম পুনরায় চালুর উদ্দ্যেগে ক্ষতিগ্রস্থ পরিবার ও সচেতন মহলে বিভিন্ন প্রশ্নের দানা বেঁধেছে।

কেউ কেউ বলছেন, পুনরায় চালুর আগে ৩৫টি তদন্ত সুপারিশের কতটি বাস্তবায়িত হয়েছে কিনা? কোন সংস্থা,কোন তারিখ এবং কী কী পরীক্ষা হয়েছে তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জনস্বার্থে পরিস্কার করা প্রয়োজন।

আবার কেউ কেউ প্রতিষ্ঠানটি পুনরায় চালুর খবরে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে উল্টো প্রশ্ন রেখেছেন, নতুন গ্যাস-ফ্রি প্রটোকল কার্যকর, ২৪ ঘণ্টার emergency response team, মাল্টি-গ্যাস ডিটেক্টর নিশ্চিত করা হয়েছে কিনা?

তাছাড়া বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীদের প্রধান পেশাদার সংগঠন/সমিতি সুপ্রিমকোর্ট বার অ্যসোসিয়েশন (SCBA) ব্যবহার বাধ্যতামূলক এবং পারমিট-টু-ওয়ার্ক (PTW) চালু হয়েছে কিনা? সবকিছুর সমাধানের পরেই প্রতিষ্ঠানটি পুনরায় চালু করার দাবি তাদের।

১০টি প্রাণের ক্ষতিপূরণ নিয়েও নানান প্রশ্ন?

দুর্ঘটনার পর গণমাধ্যমের সামনে নিহতদের পরিবারকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বড় বড় ঘোষণা দেওয়া হলেও বাস্তবে তা কতটুকু কার্যকর হয়েছে তা অনুসন্ধান করতে গিয়ে মিলেছে, ক্ষতিগ্রস্থ কয়েকটি পরিবারের কাঁধে এখন অভাব ও স্বজন হারানোর শোকের দ্বিগুণ বোঝা।

দুর্ঘটনার পর প্রতি নিহতের পরিবারকে ১০ লাখ টাকা সহায়তার ঘোষণা দেওয়া হয়।

অনুসন্ধানের তথ্য অনুযায়ী, দুর্ঘটনার পরপর প্রত্যেক পরিবারকে ১ লাখ টাকা দেওয়া হয়। ২৩ আগস্ট ১০ পরিবারকে আরও ৭ লাখ টাকা করে দেওয়া হয়। প্রত্যেক নিহতের জন্য আরও ২ লাখ টাকা শ্রম আদালতে জমা দেওয়ার কথা জানানো হয়।

৯ সেপ্টেম্বর শ্রম আদালতের মাধ্যমে ১০ নিহতের মধ্যে ছয় পরিবারের হাতে ২ লাখ টাকা করে তুলে দেওয়া হয়েছে।

অনুসন্ধানকালে কয়েকজন ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারের স্বজনরা অভিযোগ করে প্রতিবেদককে বলেছেন, ক্ষতিপূরণের বকেয়া টাকা দাবি করলে তাদেরকে নানা আইনি ও সামাজিক ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে।

বেশি বাড়াবাড়ি করলে কিছুই পাওয়া যাবে না-এমন হুমকির মুখে চরম নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছেন ভয়াবহ দুর্ঘটনায় নির্মমভাবে প্রাণ হারানো কয়েকজনের পরিবার। সুবিচারের আশায় দ্বারে দ্বারে ঘুরে এখন অনেকটাই দিশেহারা।

কিন্তু বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ধারা ১৫৫-এ মৃত শ্রমিকের ক্ষতিপূরণ শ্রম আদালতে জমা দেওয়ার বিধান রয়েছে। প্রতিটি পরিবারের payment trail প্রকাশ করা দরকার বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

এসব অভিযোগের বিষয়ে ফেরদৌস শীপ ইয়ার্ড এর মালিক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (CEO) ফেরদৌস ওয়াহিদকে ফোনে না পেয়ে তার হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বারে বার্তা পাঠালেও তিনি এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত কোন মন্তব্য করেননি। পরবর্তীতে তার বক্তব্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনে সংযুক্ত করা হবে।

একই বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান পরিচালনা কর্মকর্তা আছাদুজ্জামান সাইমুনের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেও কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি। বক্তব্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনে সংযুক্ত করা হবে।

আইনি বিশ্লেষণ ও পুনরায় তদন্তের তাগিদ

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ফেরদৌস স্টিল ইয়ার্ডে যা ঘটেছে তা স্রেফ কোনো ‘দুর্ঘটনা’ নয়, এটি অবহেলাজনিত হত্যাকাণ্ডের সামিল।

পেনাল কোডের ৩০৪ (ক) ধারা অনুযায়ী অবহেলার কারণে ঘটিত প্রাণহানির ঘটনায় মালিকপক্ষের সরাসরি দায়বদ্ধতা রয়েছে। বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ (ধারা ১৫১ ও ৩১২) অনুযায়ী কর্মস্থলে নিরাপত্তা নিশ্চিত না করা, অসত্য তথ্য প্রদান এবং দুর্ঘটনা পরবর্তী আইনানুগ ক্ষতিপূরণ আটকে রাখা ফৌজদারি অপরাধ।

তাছাড়া পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ বলছে মেয়াদোত্তীর্ণ ছাড়পত্রে ঝুঁকিপূর্ণ বর্জ্য ও গ্যাসীয় জাহাজ প্রক্রিয়াজাতকরণ পরিবেশগত গুরুতর অপরাধ।

১০ জন শ্রমিকের জীবন কি শুধুই কয়েকটি সংবাদ শিরোনাম আর মালিকপক্ষের প্রভাবের কাছে বলি হওয়ার জন্য? রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থা, বিচার বিভাগ এবং সচেতন সুশীল সমাজ কি এই সংঘবদ্ধ অনিয়ম দেখেও নীরব থাকবে?

কাগজে-কলমে মিথ্যা তথ্য জমা দিয়ে, প্রভাবশালী মহলকে পাশে বসিয়ে এবং নিহতদের স্বজনদের ভয়ে স্তব্ধ করে দিয়ে পার পাওয়ার এই চেষ্টা বন্ধ হতে হবে।

জনস্বার্থে ও ন্যায়বিচারের স্বার্থে ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজের মালিকপক্ষের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ উচ্চপর্যায়ের বিচারিক তদন্ত কমিটি গঠন করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা এখন সময়ের দাবি।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি