বন অধিদপ্তরে ‘নকল বিসিএস’ মালেকের দৌরাত্ম্য: বন গিলে গড়েছেন নিজের সাম্রাজ্য

অনুসন্ধানের বাইরেই থেকে যাচ্ছেন রেঞ্জার মালেক

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ০৪ অক্টোবর, ২০২৬ ২০:৩৮

বন রক্ষার শপথ নিয়ে সরকারি চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ, চাঁদাবাজি, বন উজাড়ে সহযোগিতা এবং নানা অনিয়মের মাধ্যমে বিপুল সম্পদ গড়ার অভিযোগ উঠেছে ফরেস্ট রেঞ্জার আব্দুল মালেকের বিরুদ্ধে। বর্তমান কর্মস্থল লামা সদর রেঞ্জ।

অভিযোগকারীদের দাবি, দীর্ঘ কর্মজীবনে প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়ায় থেকে তিনি এমন একটি বলয় তৈরি করেছেন, যার কারণে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ উঠলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, অবৈধভাবে অর্জিত অর্থের একটি অংশ নিজের এবং স্ত্রীর ব্যাংক হিসাবে জমা রাখা হয়েছে। রাজধানী ঢাকায় বিলাসবহুল ফ্ল্যাট এবং নিজ এলাকায় স্বজনদের নামে মূল্যবান জমি কেনার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।

তবে এসব সম্পদের মালিকানা, অর্থের উৎস এবং অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন। আর সেই যাচাইয়ের জন্যই সংশ্লিষ্টরা দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও বন বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ সম্পদ অনুসন্ধান এবং নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। সূত্র ডিডি

সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, আব্দুল মালেকের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ নতুন নয়। কর্মজীবনের শুরুতে চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের হাটহাজারী রেঞ্জের মন্দাকিনি বিটে প্রশিক্ষণে থাকার সময় থেকেই স্থানীয় অবৈধ কাঠ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে।

পরে তদবির ও প্রভাব খাটিয়ে চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের শহর রেঞ্জ কর্মকর্তার দায়িত্ব পাওয়ার পর তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগের পরিধি আরও বাড়ে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।

সেখানে টানা তিন বছরের বেশি সময় দায়িত্ব পালনকালে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, ইউনিফর্ম ছাড়াই ডিবি পুলিশের আদলে হাইস গাড়ি ভাড়া করে বিভিন্ন চেকপোস্ট ও কাঠবাহী যানবাহনে অভিযান চালানো হতো।

বৈধ ট্রানজিট পাস (টিপি) থাকা কিংবা টিপিবিহীন কাঠবাহী গাড়ি আটকে এক থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত আদায়ের অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, আদায় করা অর্থের পুরোটা সরকারি রসিদে দেখানো হতো না। এমনকি অতিরিক্ত কাঠের ঘনফুট গোপনে বিক্রি করে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও উঠেছে।

আব্দুল মালেকের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সবচেয়ে গুরুতর দিকগুলোর একটি হলো তাঁর কথিত সম্পদ বৃদ্ধির বিষয়টি।

অভিযোগকারীদের দাবি, চাকরির বৈধ আয় ও পরিচিত আয়ের উৎসের সঙ্গে সামঞ্জস্যহীনভাবে তাঁর এবং তাঁর স্ত্রীর নামে বিপুল অর্থ জমা হয়েছে। ঘুষ, চাঁদাবাজি ও বনসম্পদ ধ্বংসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অবৈধ কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে অর্জিত অর্থ ব্যাংক হিসাবে রাখা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

এখানেই তদন্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি সামনে আসে-একজন সরকারি কর্মচারীর বৈধ আয় ও ঘোষিত সম্পদের সঙ্গে তাঁর বাস্তব সম্পদের কোনো অসামঞ্জস্য আছে কি না?

এই প্রশ্নের উত্তর বের করতে হলে আব্দুল মালেক ও তাঁর স্ত্রীর নামে থাকা ব্যাংক হিসাব, আয়কর নথি, সম্পদ বিবরণী, জমি ও ফ্ল্যাটের দলিল এবং অর্থের লেনদেন খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ঢাকায় ফ্ল্যাট, গ্রামে জমি-সম্পদের উৎস কী?

অভিযোগ রয়েছে, রাজধানী ঢাকায় আব্দুল মালেক বিলাসবহুল ফ্ল্যাট কিনেছেন। পাশাপাশি তাঁর নিজ এলাকায় স্বজনদের নামে মূল্যবান জমি কেনা হয়েছে বলেও দাবি করা হচ্ছে।

অভিযোগকারীদের মতে, সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের সংশ্লিষ্ট ই-নথি ব্যবস্থায় আব্দুল মালেক ও তাঁর স্ত্রীর জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য ব্যবহার করে অনুসন্ধান চালালে তাঁদের নামে নিবন্ধিত জমি ও অন্যান্য সম্পদের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে। সুত্র-এসসি

একই সঙ্গে স্বজনদের নামে কেনা সম্পত্তির অর্থের উৎসও অনুসন্ধানের দাবি উঠেছে। কারণ কোনো সরকারি কর্মকর্তার নিজের নামে নয়, আত্মীয়স্বজনের নামে সম্পদ কেনা হয়ে থাকলে সেটিও আর্থিক অনুসন্ধানের আওতায় আসতে পারে-যদি সম্পদটির প্রকৃত সুবিধাভোগী বা অর্থের উৎস নিয়ে প্রশ্ন থাকে।

তবে এ বিষয়ে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে সম্পদের মালিকানা ও অর্থের উৎস নির্ধারণ করাই হবে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পথ।

মাঠপর্যায়ের বনকর্মীদেরও অভিযোগ

আব্দুল মালেকের বিরুদ্ধে শুধু কাঠ ব্যবসায়ী বা স্থানীয় ব্যক্তিদের অভিযোগ নয়, মাঠপর্যায়ের বনকর্মীদের একটি অংশের মধ্যেও ক্ষোভ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

সূত্রের দাবি, তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে এবং প্রশাসনিক নিপীড়ন থেকে বাঁচতে মাঠপর্যায়ের শত শত সাধারণ বনকর্মী সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে লিখিত আবেদন করেছেন।

লামা সদর রেঞ্জে বদলি নিয়েও প্রশ্ন

সম্প্রতি লামা সদর রেঞ্জে দায়িত্ব পাওয়ার পর আব্দুল মালেককে ঘিরে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। একাধিক দায়িত্বশীল সূত্রের দাবি, বন অধিদপ্তরের রাঙ্গামাটি অঞ্চলের বন সংরক্ষক মোহাম্মদ আবদুল আউয়াল প্রভাব খাটিয়ে এবং অর্থের বিনিময়ে লামার বিভাগীয় বন কর্মকর্তার ওপর চাপ প্রয়োগ করে তাঁকে লামা সদর রেঞ্জে বদলি করিয়েছেন।

সূত্রগুলোর আরও দাবি, বন সংরক্ষক মোহাম্মদ আবদুল আউয়াল ও আব্দুল মালেকের মধ্যে ঘনিষ্ঠ আত্মীয়তার সম্পর্ক রয়েছে। এ কারণেই আব্দুল মালেক বারবার সুবিধাজনক কর্মস্থলে পদায়নের সুযোগ পাচ্ছেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো কার্যকর তদন্তের বাইরে থেকে যাচ্ছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।

‘বিসিএস বন কর্মকর্তা’ পরিচয় নিয়েও অভিযোগ

আব্দুল মালেক বন অধিদপ্তরের নন-ক্যাডার কর্মকর্তা হলেও নিজেকে ‘বিসিএস বন কর্মকর্তা’ হিসেবে পরিচয় দিয়ে প্রভাব বিস্তার করেছেন-এমন অভিযোগও রয়েছে। একজন সরকারি কর্মকর্তার পদ ও ক্যাডার পরিচয় নিয়ে ভুল তথ্য ব্যবহার করা হয়ে থাকলে তার প্রশাসনিক ও আইনগত গুরুত্ব রয়েছে। তাই আব্দুল মালেকের নিয়োগের ধরন, পদমর্যাদা এবং তাঁর ব্যবহৃত পরিচয় সম্পর্কে বন অধিদপ্তরের তদারকি প্রয়োজন বলে মনে করছেন অভিযোগকারীরা।

করাতকল, ফার্নিচার ও ঠিকাদারি কাজেও অভিযোগ

আব্দুল মালেকের বিরুদ্ধে করাতকল ও ফার্নিচারের দোকান নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম প্রবর্তক সংঘের বনাঞ্চলের জমি-সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে প্রভাব খাটানোর অভিযোগও করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

ঠিকাদারি কাজ নিয়েও উঠেছে গুরুতর অভিযোগ। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, কোটি কোটি টাকার কাজের ক্ষেত্রে ভুয়া কোটেশনের মাধ্যমে অর্থ লোপাটের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে।

আব্দুল মালেকের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং বন সংরক্ষকের কাছে একাধিক লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। কিন্তু অভিযোগকারীদের অভিযোগ, এসব অভিযোগের কার্যকর তদন্ত হয়নি।

একজন সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এতগুলো অভিযোগ উঠলে তদন্ত ছাড়া সেই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া সম্ভব নয়। তাই আব্দুল মালেকের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর পাশাপাশি তাঁর ও তাঁর স্ত্রীর নামে থাকা সম্পদ, ব্যাংক হিসাব, আয়কর রিটার্ন, জমি ও ফ্ল্যাটের দলিল, আত্মীয়স্বজনের নামে থাকা সন্দেহজনক সম্পদ এবং চাকরির সময়কার আর্থিক লেনদেন খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।

অভিযোগকারীদের কেউ কেউ আব্দুল মালেককে ক্ষমতার অপব্যবহারকারী ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তা হিসেবে অভিহিত করেছেন।

সংরক্ষিত বনাঞ্চল রক্ষা, কাঠ পাচার বন্ধ এবং সরকারি সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বন বিভাগের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। সেই বিভাগের একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যদি ঘুষ, চাঁদাবাজি, বন উজাড়ে সহযোগিতা, ক্ষমতার অপব্যবহার ও জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের মতো গুরুতর অভিযোগ ওঠে, তাহলে বিষয়টি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে দুদক, বন অধিদপ্তর, আয়কর বিভাগ, ভূমি রেজিস্ট্রি কর্তৃপক্ষ এবং প্রয়োজন হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার সমন্বিত অনুসন্ধান প্রয়োজন।

অভিযোগগুলোর বিষয়ে ফরেস্ট রেঞ্জার আব্দুল মালেক, বন সংরক্ষক মোহাম্মদ আবদুল আউয়াল এবং সংশ্লিষ্ট বন কর্মকর্তাদের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। তাঁদের বক্তব্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনে যথাযথভাবে যুক্ত করা হবে।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি