‘স্বেচ্ছায় সরে যান, নয়তো ব্যবস্থা’-খাল দখলদারদের শেষ সতর্কবার্তা মেয়রের

হালদা রক্ষায় খাল-ছড়া পুনরুদ্ধার

প্রকাশিত: ২৪ জুন, ২০২৬ ১৪:৩৬

প্রতিবার বর্ষা এলেই চট্টগ্রাম নগরীর বহু এলাকার মানুষের কাছে বৃষ্টি আশীর্বাদ নয়, আতঙ্কের নাম। কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই সড়ক ডুবে যায়, বাসাবাড়িতে পানি ঢোকে, থমকে যায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা।

বছরের পর বছর ধরে চলা এই দুর্ভোগের পেছনে বারবার উঠে এসেছে একই অভিযোগ—খাল ও ছড়ার দখল, দূষণ এবং নাব্যতা হারিয়ে ফেলা জলপথ।

এই বাস্তবতার মধ্যেই বুধবার সকালে দক্ষিণ পাহাড়তলী এলাকার ১ নম্বর ওয়ার্ডে ঢুলুনিয়া ঢালা ছড়া, খাগড়িয়া ছড়া এবং খোশাল শাহ ছড়ার পুনঃখনন কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন।

একই সঙ্গে তিনি সরেজমিনে এসব খাল-ছড়া পরিদর্শন করেন।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, সিটি কর্পোরেশনের কর্মকর্তাসহ এলাকার বাসিন্দারা উপস্থিত ছিলেন।

পরিদর্শনকালে মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

তিনি বলেন, খাল ও ছড়াগুলো কেবল জলপ্রবাহের পথ নয়, এগুলো নগরবাসীর সম্পদ।

কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে দখল ও দূষণের কারণে এসব জলাধার তাদের স্বাভাবিক কার্যকারিতা হারিয়েছে। ফলে জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।

খাল-ছড়া দখল করে রাখা ব্যক্তিদের উদ্দেশে তিনি স্পষ্ট বার্তা দিয়ে বলেন, যারা অবৈধভাবে স্থাপনা নির্মাণ করেছেন, তাদের স্বেচ্ছায় সরে যেতে হবে। অন্যথায় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা সমস্যার বড় একটি কারণ হলো প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার ওপর ক্রমাগত মানবিক হস্তক্ষেপ।

খালের জায়গা সংকুচিত হওয়া, অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ এবং বর্জ্য ফেলার কারণে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

মেয়র বলেন, অনেক স্থানে খালের ওপর স্থাপিত স্ল্যাব ও বিভিন্ন অবকাঠামো পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও রক্ষণাবেক্ষণ সম্ভব হচ্ছে না।

তিনি জানান, এসব প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করে পুরো খাল ব্যবস্থাকে কার্যকর ও সচল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ওয়ার্ডভিত্তিক জলাবদ্ধতার কারণ শনাক্ত করে পরিকল্পিতভাবে কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু খনন করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না; খালগুলোর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং দখলমুক্ত রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। তিনি বলেন, নগরীর ৪০টি খালের উন্নয়ন পরিকল্পনা (ডিপিপি) প্রণয়নের কাজ চলছে।

এই পরিকল্পনার আওতায় খাগড়িয়া ছড়া, খোশাল শাহ ছড়াসহ গুরুত্বপূর্ণ জলাধারগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হবে। খালগুলোর গভীরতা বৃদ্ধি, রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণ, অবৈধ দখল উচ্ছেদ এবং আধুনিক ওয়াকওয়ে নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়িত হলে শুধু জলাবদ্ধতা কমবে না, নগর পরিবেশেরও উন্নয়ন ঘটবে। একই সঙ্গে খালগুলোকে কেন্দ্র করে নগরবাসীর জন্য নতুন উন্মুক্ত স্থান তৈরি হতে পারে।

মেয়র তাঁর বক্তব্যে হালদা নদীর প্রসঙ্গও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, হালদা নদীকে রক্ষা করতে হলে এর সঙ্গে সংযুক্ত খাল-ছড়াগুলোর স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে।

দীর্ঘদিনের অবহেলায় অনেক খাল ও ছড়া নাব্যতা হারিয়েছে। ফলে শুধু নগরীর পানি নিষ্কাশন নয়, বৃহত্তর জলপ্রবাহ ব্যবস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

তিনি বলেন, ধাপে ধাপে এসব জলপথ পুনরুদ্ধার করে নগরবাসীকে জলাবদ্ধতার দুর্ভোগ থেকে মুক্তি দিতে চায় সিটি কর্পোরেশন।

মাঠপর্যায়ের প্রকল্পগুলোর ক্ষেত্রে প্রায়ই কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। সেই বাস্তবতা মাথায় রেখেই স্থানীয় বাসিন্দাদের সক্রিয় অংশগ্রহণের আহ্বান জানান মেয়র।

তিনি বলেন, চলমান খনন ও সংস্কার কাজের গুণগত মান তদারকিতে এলাকাবাসীর সহযোগিতা প্রয়োজন। কাজের মান নিশ্চিত করেই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন ইখতিয়ার উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাবৃন্দ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।

চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা সমাধান রাতারাতি সম্ভব নয়। তবে খাল-ছড়ার স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা, দখলমুক্ত করা এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটতে পারে।

এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—যাদের কারণে বছরের পর বছর খাল সংকুচিত হয়েছে, তারা কি সত্যিই স্বেচ্ছায় সরে যাবেন? আর ঘোষিত পরিকল্পনাগুলো কি কাগজের সীমা পেরিয়ে বাস্তবে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে পারবে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই নির্ধারণ করবে, আগামী বর্ষায় চট্টগ্রামের মানুষ জলাবদ্ধতার পুরোনো দুর্ভোগ দেখবে, নাকি দেখতে পাবে পুনরুদ্ধার হওয়া একটি সচল নগরীর নতুন চিত্র।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি