ত্রিপলের ছাউনি দেওয়া ছোট্ট একটি ঘর। মেঝের ওপর সারিবদ্ধভাবে শুইয়ে রাখা হয়েছে চারজন নারী ও শিশুর নিথর মরদেহ। শরীরগুলো ঢাকা কম্বল আর চেনা গামছায়।
বাইরে তখনো ঝরছে শ্রাবণের অবিরল ধারা। ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে এক নারী ডুকরে কাঁদছিলেন। বিলাপ করতে করতে তিনি বলছিলেন, “রাতে ঘুমিয়ে ছিল একসঙ্গে। সে ঘুম আর ভাঙল না তাদের।”
এই অভাগা পরিবারটি মাত্র দেড় বছর আগে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মির গুলি আর বোমার হাত থেকে জীবন বাঁচাতে নাফ নদী পার হয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছিল।
জীবন বাঁচানোর সেই লড়াই শেষ হলো উখিয়ার বালুখালী আশ্রয়শিবিরের সি-১১ ব্লকের এক টুকরো পাহাড়ের নিচে।
গতকাল রোববার দিবাগত রাত একটা থেকে তিনটার মধ্যে উখিয়ার বালুখালী, কুতুপালং ও জামশিয়া আশ্রয়শিবিরের আকাশ ভেঙে নেমে আসে বৃষ্টি।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় কক্সবাজারে ২৬৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
এই প্রবল বর্ষণে পাহাড়ের মাটি আলগা হয়ে ৪টি স্থানে পৃথকভাবে ধসে পড়ে রোহিঙ্গাদের বসতি। আর তাতেই চাপা পড়ে প্রাণ হারান ৯ জন অসহায় মানুষ।
সবশেষ ঘটনাটি ঘটে আজ সোমবার কক্সবাজার পৌরসভার ছাত্তারের ঘোনা এলাকায়। ভোর চারটার দিকে পাহাড়ের একটি অংশ ঘরে ধসে পড়লে নিহত হয় আলী আকবর (৪৫)।
স্থানীয় বাসিন্দা নজরুল ইসলাম জানান, পাহাড়ধসের পর আলী আকবরসহ তাঁর পরিবারের তিন সদস্য মাটির নিচে চাপা পড়েন।
আশপাশের লোকজন তাঁদের উদ্ধার করে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক আলী আকবরকে মৃত ঘোষণা করেন। অপর দুজনকে হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
এর আগে বালুখালী শিবিরে নিহত একই পরিবারের চারজন হলেন-রোহিঙ্গা আবদুর রাজ্জাকের দুই মেয়ে উন্মে হাবিবা (২৭) ও তানজিনা আক্তার (১৩) এবং উন্মে হাবিবার দুই অবুঝ শিশুসন্তান মো. রিহান (৫) ও হারুনুর রশিদ (৩)। ঘটনার পর থেকে বাড়ির পুরুষ সদস্য আবদুর রাজ্জাকসহ অন্যদের কোনো খোঁজ মিলছে না।
রোহিঙ্গা নেতা কামাল আহমদ চোখ মুছতে মুছতে বলেন, “দখলদারদের নিপীড়ন সহ্য করে মিয়ানমারের সিকদারপাড়া থেকে পালিয়ে এসেছিল এই পরিবারটি।
সরকারিভাবে কোনো ঘর বরাদ্দ না পেয়ে পাহাড়ের ঝুঁকিপূর্ণ ঢালেই ত্রিপল দিয়ে মাথা গোঁজার ঠাঁই করেছিল দুই মেয়ে। জীবন বাঁচাতে পালিয়ে এসেও শেষ রক্ষা হলো না ওদের।”
দুর্যোগের এই কালো রাত কেবল বালুখালীতেই আঘাত হানেনি। রাত দেড়টার দিকে জামতলি আশ্রয়শিবিরের (ক্যাম্প-১৫) ডি-৬ ব্লকে পাহাড়ের বিশাল খণ্ড ধসে পড়ে পিষে দেয় কামাল হোসাইনের (৪৪) ঘরটি।
স্থানীয় রোহিঙ্গারা মাটি সরিয়ে কামাল হোসাইন, তাঁর স্ত্রী হুমায়রা বেগম (৩৯) এবং ৪ বছরের শিশুসন্তান মোহাম্মদ আনাসের মরদেহ উদ্ধার করে। পরিবারের আরও দুই সদস্য গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছেন।
এর ঠিক কিছু সময় পর, রাত দুইটার দিকে কুতুপালং আশ্রয়শিবিরের (ক্যাম্প-৭) ডি-৭ ব্লকে পাহাড়ধসে প্রাণ হারায় মো. একরাম নামের মাত্র ৭ বছর বয়সী এক শিশু। সে ওই ক্যাম্পের রশিদ উল্লাহর ছেলে।
আশ্রয়শিবিরের বাইরেও কক্সবাজার শহরের পাহাড়তলীর ছাত্তারঘোনা এলাকায় এক ব্যক্তি পাহাড়ধসে মারা গেছেন।
উখিয়া ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা ডলার ত্রিপুরা জানিয়েছেন, গভীর রাতে ঘুমে অচেতন থাকায় মানুষগুলো সরার সুযোগটুকুও পায়নি। ম
ধুরছড়া আশ্রয়শিবিরের রোহিঙ্গা নেতা ছৈয়দ নুর বলেন, “টানা বৃষ্টিতে পাহাড়ে বড় বড় ফাটল ধরেছে। বৃষ্টির পানি সেই ফাটলে ঢুকে হুড়মুড় করে মাটি ধসে পড়ছে “
উখিয়া ও টেকনাফের শিবিরগুলোতে বর্তমানে প্রায় দুই লাখেরও বেশি নতুন রোহিঙ্গা ঘর না পেয়ে চরম ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের ঢালে বাঁশ আর ত্রিপল দিয়ে গাদাগাদি করে বসবাস করছেন।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (অতিরিক্ত সচিব) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান এই ঘটনাকে অত্যন্ত মর্মান্তিক বলে উল্লেখ করেছেন।
তিনি জানান, ইতিমধ্যে অতি ঝুঁকিতে থাকা প্রায় এক হাজার রোহিঙ্গাকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং প্রাণহানি ঠেকাতে প্রচারণা চালানো হচ্ছে।
তবে আবহাওয়া অফিসের পূর্বাভাস বলছে, আগামী দুদিন আরও ভারী বর্ষণ হতে পারে। ফলে পাহাড়ের কোলে বাস করা এই বিপন্ন মানুষগুলোর জন্য প্রতিটি বৃষ্টির ফোঁটা এখন আতঙ্কের একেকটি বুলেট হয়ে দেখা দিয়েছে।
ঘরের ভেতর বৃষ্টির শব্দ পেলেই এখন রোহিঙ্গারা আঁতকে উঠছেন। এই বুঝি ধসে পড়ল মাথার ওপরের পাহাড়টা!
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি

