আকাশ ভাঙা বৃষ্টি আর করাল জোয়ারের যুগলবন্দিতে আরও একবার বুকসমান পানির নিচে তলিয়ে গেল দেশের প্রধান বন্দরনগরী।
গত কয়েক দিন ধরে চলা টানা ভারী বর্ষণ, ওপর থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল আর নিচে কর্ণফুলী নদীর উত্তাল জোয়ারের ত্র্যহস্পর্শে চট্টগ্রাম আজ এক জলবন্দি জনপদ।
তবে এবারের জলমগ্নতা প্রকৃতির রুদ্ররূপ নয়, এর পেছনে লুকিয়ে আছে নগরবাসীর পুঞ্জীভূত ক্ষোভ, দীর্ঘশ্বাস আর হাজার কোটি টাকার ব্যর্থ প্রকল্পের এক নির্মম আখ্যান।
বুধবার (৮ জুলাই) দুপুরের চেনা চট্টগ্রামকে চেনার কোনো উপায় ছিল না। বাণিজ্যনগরীর প্রাণকেন্দ্র থেকে শুরু করে অলিগলি। সবখানেই অথই জল।
পরিস্থিতি এতটাই বেগতিক যে, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ক্লাস-পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে, বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে চট্টগ্রামসহ তিন জেলার আজকের এইচএসসি পরীক্ষাও। বৃষ্টিতেই থমকে গেছে শিক্ষা, স্থবির হয়ে পড়েছে বাণিজ্য।
একপাশে পাহাড়ের কান্না, অন্যপাশে নগরের ক্ষোভ
চট্টগ্রামের এই ভৌগোলিক ক্ষত এখন দ্বিমুখী সংকটে রূপ নিয়েছে। একদিকে টানা বর্ষণে ভেতরের মাটি নরম হয়ে ক্ষয়ে পড়ছে পাহাড়গুলো। যেকোনো মুহূর্তে ধসে পড়ার আশঙ্কায় কাঁপছে পাহাড়ের পাদদেশে থাকা হাজারো বিপন্ন মানুষের প্রাণ।
জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং করে আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার আকুতি জানানো হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু ভিটেমাটি ছাড়ার আতঙ্ক আর মৃত্যুর ভয়ের দোলাচলে পাহাড়ি জনপদে এখন কান্নার হাতছানি।
অন্যদিকের চিত্রটি ক্ষোভের। চকবাজার, আগ্রাবাদ, বহদ্দারহাট, মুরাদপুর, চান্দগাঁও, হালিশহর কিংবা সিডিএ আবাসিক এলাকার বাসিন্দাদের ক্ষোভ এবার বাঁধ ভেঙেছে।
ঘরের ভেতর নোংরা পানি, খাটের ওপর সংসার, আর খাটের নিচে ভাসছে আসবাবপত্র। সড়কের ড্রেন আর রাস্তার পার্থক্য মুছে যাওয়ায় ম্যানহোলে পড়ে যাওয়ার উপক্রম তৈরি হয়েছে।
গণপরিবহনহীন সড়কে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকা অফিসগামী মানুষের চোখেমুখে এখন কেবলই নিয়তিকে মেনে নেওয়ার গ্লানি আর কর্তৃপক্ষের প্রতি তীব্র ধিক্কার।
চট্টগ্রামের মানুষের মনে এখন একটাই বড় প্রশ্ন-জলাবদ্ধতা নিরসনের নামে গত কয়েক বছরে যে হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ হলো, তা গেল কোথায়?
মেগা প্রকল্পের অধীনে খাল খনন, ড্রেন সংস্কার, খালের মুখে স্লুইসগেট ও ড্রেজিংয়ের যে বিশাল কর্মযজ্ঞ চলল, তার সুফল কই?
নগরের বিস্তীর্ণ এলাকা যখন সাগরের মতো ভাসছে, তখন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে এই বিশাল বাজেট ও পরিকল্পনাগুলো বাস্তবতার মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংকটের মূলে রয়েছে খালের মুখগুলো।
যে কারণে ব্যর্থ হচ্ছে মেগা প্রকল্প:
* খালের মুখে অপরিকল্পিত স্লুইসগেট ও ড্রেজিংয়ের অভাব
* সেবা সংস্থাগুলোর (চসিক, সিডিএ, ওয়াসা) মধ্যে চরম সমন্বয়হীনতা
* দখল হওয়া খালের পূর্ণাঙ্গ উদ্ধার ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাব
* আবর্জনা ফেলার কারণে ড্রেনেজ লাইনের স্থায়ী প্রতিবন্ধকতা
শুধু খাল খনন করলেই যে জোয়ারের পানি আটকানো যায় না, তার প্রমাণ এবার হাতেনাতে মিলল।
জোয়ারের সময় খালের মুখ দিয়ে উল্টো পানি ঢুকে নগরকে ভাসিয়ে দিচ্ছে, অথচ সেই পানি নেমে যাওয়ার মতো পাম্প হাউস বা ড্রেনেজ ব্যবস্থা এখনো পুরোপুরি কার্যকর করা যায়নি।
ফলে, হাজার কোটির প্রকল্পগুলো আজ নগরবাসীর কাছে কেবলই এক ‘কাগজের নৌকা’ ছাড়া আর কিছুই মনে হচ্ছে না।
বিপন্ন জীবন, মানবিক বিপর্যয়
এই মহাদুর্যোগে সবচেয়ে করুণ দশা নগরের খেটে খাওয়া নিম্ন আয়ের মানুষের। দিনমজুর, রিকশাচালক আর ক্ষুদ্র হকারদের দৈনিক আয় আজ শূন্যের কোঠায়।
নিচু এলাকার কাঁচা ও আধাপাকা ঘরগুলোতে নোংরা পানি ঢুকে নষ্ট হয়েছে জমানো চাল-ডাল আর প্রয়োজনীয় কাগজপত্র। এর চেয়েও বড় আতঙ্ক হয়ে দেখা দিয়েছে স্বাস্থ্যঝুঁকি।
ময়লা, নর্দমা আর কেমিক্যালের মিশ্রিত এই দূষিত পানির সংস্পর্শে আসায় শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে ডায়রিয়া ও চর্মরোগের মতো পানিবাহিত বালাই ছড়িয়ে পড়ার উপক্রম হয়েছে।
চট্টগ্রামের মানুষ বছরের পর বছর ধরে আশ্বাস শুনে আসছে। প্রতিটি বর্ষা আসার আগে বলা হয়, “এবার আর পানি জমবে না।“ কিন্তু প্রথম বড় বৃষ্টিতেই সেই আশার বেলুন ফুটো হয়ে যায়।
প্রকৃতির অতিবর্ষণকে হয়তো থামানো যাবে না, কিন্তু মানুষের তৈরি অব্যবস্থাপনা, খালের ওপর অবৈধ বহুতল ভবন আর ফাইলবন্দি সমন্বয়হীনতাকে থামানো অসম্ভব ছিল না।
আজকের এই জলমগ্ন চট্টগ্রাম কেবল প্রকৃতির শিকার নয়, বরং একটি পরিকল্পিত মহানগরের অপমৃত্যুর দলিল।
খালের মুখে জমে থাকা পলি আর আবর্জনার স্তূপের দিকে তাকিয়ে আজ প্রতিটি চাটগাঁইয়ো নাগরিক প্রশ্ন তুলছেন-এই দুর্ভোগের শেষ কোথায়?
কর্ণফুলীর জোয়ার আর আকাশের মেঘ কি আজীবন এভাবেই জবাবদিহিতাহীন হাজার কোটি টাকাকে খালের মুখে গিলে খাবে?
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি

