চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের পাহাড়ি এলাকায় আট বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টা ও নৃশংসভাবে গলা কেটে হত্যার মামলায় একমাত্র আসামি বাবু শেখকে (৪৫) মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন আদালত।
আজ বৃহস্পতিবার বিকেলে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৪ চট্টগ্রামের বিচারক জান্নাতুল ফেরদৌস জনাকীর্ণ আদালতে এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন।
অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনা করে মাত্র ১২ কার্যদিবসের মধ্যে বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে এই দৃষ্টান্তমূলক রায় দেওয়া হলো।
আদালতের বেঞ্চ সহকারী আব্বাস হোসেন রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, রায় ঘোষণার সময় আসামি বাবু শেখ আদালতে হাজির ছিলেন।
রায় শোনার পর তিনি নির্বিকার ছিলেন। পরে আদালতের নির্দেশে কঠোর নিরাপত্তায় তাঁকে কারাগারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
বিরোধের জেরে অবুঝ শিশুকে টার্গেট
মামলার বিবরণ ও পুলিশ সূত্র জানায়, নিহত শিশুটি সীতাকুণ্ডের একটি স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। তার বাবা পেশায় একজন টমটমচালক।
ঘাতক বাবু শেখের বাড়ি গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার মধ্যম পুলুপাড়া এলাকায় হলেও তিনি সীতাকুণ্ডে শিশুটির পরিবারের পাশের ঘরেই ভাড়া থাকতেন।
তৎকালীন পুলিশ সুপার মোহাম্মদ নাজির আহমেদ খান ঘটনার পর এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছিলেন, শিশুটির বাবার সঙ্গে পূর্বশত্রুতার জেরে তাকে হত্যার নৃশংস পরিকল্পনা করেন বাবু শেখ।
পাহাড়ের সেই ভয়াল দুপুর
পরিকল্পনা অনুযায়ী, গত ১ মার্চ সকালে বাবু শেখ চকলেটের লোভ দেখিয়ে শিশুটিকে বাড়ি থেকে ফুসলিয়ে বের করে আনেন। প্রথমে বাসে করে কুমিরা থেকে সীতাকুণ্ডে যান এবং পরে হেঁটে বোটানিক্যাল গার্ডেন সংলগ্ন সীতাকুণ্ড ইকোপার্কের নির্জন পাহাড়ি এলাকায় নিয়ে যান।
সেখানে শিশুটিকে ধর্ষণের চেষ্টা চালান বাবু শেখ। এতে ব্যর্থ হয়ে নিজের সঙ্গে থাকা ছুরি দিয়ে শিশুটির গলা কেটে ফেলে রেখে পালিয়ে যান তিনি।
রক্তাক্ত শরীর নিয়ে বাঁচার আকুতি
মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও সেদিন বেঁচে থাকার আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল আট বছরের অবুঝ শিশুটি।
রক্তাক্ত ও গলা কাটা অবস্থায় জঙ্গল থেকে হেঁটে পাহাড়ের নিচে সড়ক সংস্কারকাজে নিয়োজিত শ্রমিকদের কাছে পৌঁছায় সে।
শ্রমিকেরা দ্রুত তাকে উদ্ধার করে প্রথমে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং পরে আশঙ্কাজনক অবস্থায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে ভর্তি করেন।
সেখানে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে পরদিন রাত দেড়টার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শিশুটি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে।
এই পৈশাচিক ঘটনার পর ৩ মার্চ দুপুরে সীতাকুণ্ডের কুমিরা এলাকা থেকে ঘাতক বাবু শেখকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ওই দিনই শিশুটির মা বাদী হয়ে সীতাকুণ্ড থানায় একটি মামলা দায়ের করেন।
১২ কার্যদিবসে দৃষ্টান্তমূলক বিচার
হৃদয়বিদারক এই ঘটনার পর পুলিশ অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে তদন্ত শেষ করে গত ১১ জুন আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করে।
এরপর ১৮ জুন আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরু করেন আদালত। ২১ জুন থেকে শুরু হয় রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষ্য গ্রহণ।
মাত্র ১২ কার্যদিবসের মধ্যে মোট ১৬ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য ও জেরা পর্যালোচনা শেষে আদালত গতকাল এই চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করেন।
নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের দ্রুততম সময়ে দেওয়া এই রায়কে দেশের বিচারিক ইতিহাসে একটি অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখছেন আইনজ্ঞরা।
নিহতের পরিবার এই রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে দ্রুত রায় কার্যকরের দাবি জানিয়েছে।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি

