টানা পাঁচটা দিন। প্রখর পাহাড়ি ঢল আর মেঘভাঙা বৃষ্টির তোড়ে যেন থমকে গিয়েছিল দেশের পর্যটন যোগাযোগের সবচেয়ে বড় ধমনী।
যে রেললাইনের ওপর দিয়ে প্রতিদিন হাজারো মানুষের স্বপ্ন, উচ্ছ্বাস আর জীবনের গল্প ছুটে যেত সাগরের টানে, তা রূপ নিয়েছিল এক শান্ত, জলমগ্ন বিষণ্নতায়।
অবশেষে সব শঙ্কা, অপেক্ষা আর দুর্ভোগের অবসান ঘটিয়ে দীর্ঘ পাঁচ দিন পর আবার হুইসেল বাজল। চাকা ঘুরল ট্রেনের। কক্সবাজারের সঙ্গে সারাদেশের রেল যোগাযোগ আবার সচল হয়েছে।
আজ রোববার দুপুরের পর যখন ঢাকা থেকে আসা ‘পর্যটক এক্সপ্রেস’ চট্টগ্রাম রেলস্টেশন থেকে কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা হলো, তখন ট্রেনের জানালায় বসা মানুষগুলোর চোখে ছিল স্বস্তি, আর প্ল্যাটফর্মে থাকা রেলকর্মীদের চোখে ছিল এক দীর্ঘ যুদ্ধের ক্লান্তি জয়ের আনন্দ।
গত মঙ্গলবার হঠাৎ করেই প্রকৃতি তার রুদ্ররূপ ধারণ করে। রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রাম নগরের সুন্নিয়া মাদ্রাসা থেকে শমসেরপাড়া পর্যন্ত প্রায় দেড় কিলোমিটার রেলপথ সম্পূর্ণ পানির নিচে তলিয়ে যায়।
বন্যার তীব্র স্রোতে লাইনের নিচের পাথরগুলো যেন খড়কুটোর মতো ভেসে গিয়েছিল। প্রকৃতির এই আকস্মিক থাবায় মাঝপথেই থমকে যায় ঢাকা থেকে আসা পর্যটক এক্সপ্রেস।
নিরাপত্তার স্বার্থে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ অনির্দিষ্টকালের জন্য ট্রেন চলাচল বন্ধ করতে বাধ্য হয়। আটকা পড়েন হাজারো পর্যটক, ব্যাহত হয় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা। জানালিহাট রেলস্টেশনে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে থাকে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটের ‘প্রবাল এক্সপ্রেস’।
আজ সকাল থেকেও চট্টগ্রামে নতুন করে ভারী বর্ষণ হচ্ছিল। আকাশজুড়ে মেঘের ঘনঘটা আর নতুন করে লাইন ডুবে যাওয়ার ভয়। এরই মধ্যে চলে ট্রেন চালুর চূড়ান্ত প্রস্তুতি।
রেলওয়ের প্রকৌশলীরা জানান, বানের পানিতে পাথর সরে গেলেও সৌভাগ্যবশত রেললাইন বাঁকা বা বড় কোনো ক্ষতি হয়নি। দিন-রাত এক করে পাথর পুনর্বিন্যাস আর ঝুঁকিপূর্ণ অংশ উঁচু করার কাজ শেষ করেন তারা।
দুপুরে নগরের ষোলশহর রেলস্টেশন পরিদর্শনে আসেন রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মো. সুবক্তগীন। সঙ্গে ছিলেন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
আবেগঘন কণ্ঠে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, চট্টগ্রামে এবার রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টি হয়েছে। ড্রেনেজ ব্যবস্থা সংস্কারের পরও গত মঙ্গলবার রেললাইনে পানি উঠে যায়।
পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ ছিল তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। তবে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে এ ব্যাপারে প্রতিক্ষণ তদারকি করা হয়েছে।
আজ দুপুরের আলো-আঁধারির মধ্যেই প্রথম স্বস্তির বার্তা নিয়ে আসে ‘প্রবাল এক্সপ্রেস’।
ষোলশহর রেলস্টেশনের স্টেশন মাস্টার মাইন উদ্দিন মামুন জানান, গত মঙ্গলবার থেকে জান আলী হাট স্টেশনে আটকে থাকা চট্টগ্রামগামী প্রবাল এক্সপ্রেসটি দুপুর ১২টা ৫০ মিনিটে ক্ষতিগ্রস্ত অংশ সফলভাবে ও নিরাপদে অতিক্রম করে চট্টগ্রাম স্টেশনে পৌঁছায়।
এর কিছুক্ষণ পরই আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তা (ডিটিও) ফারহান মাহমুদ জানান, ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা পর্যটক এক্সপ্রেসটি রোববার বেলা ১১টা ৫৪ মিনিটে চট্টগ্রাম স্টেশনে পৌঁছায়।
এরপর সব নিরাপত্তা নিশ্চিত করে দুপুর ১টা ৩৫ মিনিটে (মতান্তরে সোয়া ২টা) ট্রেনটি কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে রওনা হয়।
জান আলী হাট স্টেশনের স্টেশন মাস্টার নেজাম উদ্দিন নিশ্চিত করেন, দুপুর ২টার দিকে ট্রেনটি সুন্নিয়া মাদ্রাসা থেকে শমসের পাড়ার সেই জলমগ্ন ও ক্ষতিগ্রস্ত অংশটি অত্যন্ত সফলতার সাথে অতিক্রম করে।
জানালার বাইরে তখনও জমে থাকা বন্যার পানি আর বৃষ্টির রেশ, আর ভেতরে থাকা যাত্রীদের বুকে তখন সমুদ্র ছুঁতে যাওয়ার শিহরণ।
রেল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, লাইন এখন চলাচলের জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ। দেড় কিলোমিটারের যে অংশটি গত পাঁচ দিন ধরে কোটি মানুষের দুশ্চিন্তার কারণ ছিল, তা এখন আবার মুখরিত ট্রেনের কু-ঝিক-ঝিক শব্দে।
প্রকৃতির দুর্যোগ হয়তো সাময়িকভাবে রেলের চাকা থামিয়ে দিয়েছিল, কিন্তু মানুষের পারাপারের তাগিদ আর রেলওয়ের কর্মীদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কাছে শেষ পর্যন্ত হার মেনেছে বন্যা।
পাঁচ দিনের অবরুদ্ধ ট্র্যাজেডি পেছনে ফেলে পাহাড় আর জলরাশির বুক চিরে ট্রেনটি এখন এগিয়ে যাচ্ছে তার গন্তব্যে-সৈকত নগরী কক্সবাজারে।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি

