একবিংশ শতাব্দীর এই ডিজিটাল যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যখন মানুষের যোগাযোগের সবচেয়ে বড় মাধ্যম, ঠিক তখনই একে প্রতিহিংসার হাতিয়ার বানিয়ে এক নারীর জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলার এক চরম নির্মম চিত্র উঠে এসেছে চট্টগ্রামে।
বৈবাহিক জীবনের টানাপোড়েন থেকে শুরু হওয়া একটি ট্র্যাজেডি, বিচ্ছেদের পরও রূপ নিয়েছে এক ভয়ংকর সাইবার অপরাধে।
অবশেষে, সাবেক স্ত্রীর ব্যক্তিগত ও আপত্তিকর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া এবং ভুয়া ফেসবুক আইডি খুলে মানহানিকর তথ্য প্রচারের অভিযোগে নাঈম উদ্দিন (৩৮) নামের এক যুবককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
অভিযুক্ত নাঈম উদ্দিন কর্ণফুলী থানাধীন দৌলতপুর ফুলতল এলাকার ১ নম্বর ওয়ার্ডের মৃত বশির আহমদের ছেলে।
ভুক্তভোগীর পারিবারিক সূত্র ও মামলার বিবরণী থেকে জানা যায়, তাদের বৈবাহিক জীবন সুখের ছিল না। বিয়ের পর থেকেই স্ত্রীর ওপর চলত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন।
মাঝেমধ্যেই যৌতুকের দাবিতে চাপ দেওয়া হতো তাকে। একপর্যায়ে বিষয়টিকে কেন্দ্র করে আদালতের দ্বারস্থ হন ভুক্তভোগী নারী। মামলা হওয়ার পর নাঈম স্ত্রীকে তালাক দেন এবং পরবর্তীতে দ্বিতীয় বিয়েও করেন।
বিচ্ছেদের পরও থামেনি প্রতিহিংসার আগুন
স্বাভাবিক নিয়ম অনুযায়ী বিচ্ছেদের পর একে অপরের জীবনের অধ্যায় শেষ হওয়ার কথা থাকলেও, নাঈমের প্রতিহিংসা শেষ হয়নি। দ্বিতীয় বিয়ের পরও তিনি প্রথম স্ত্রীর প্রতি তীব্র ক্ষোভ ও আক্রোশ পুষে রাখেন। সেই আক্রোশ থেকেই শুরু হয় এক চরম কুরুচিপূর্ণ খেলা।
পুলিশ জানায়, নাঈম দীর্ঘদিন ধরে তার সাবেক স্ত্রীর নামে ভুয়া ফেসবুক আইডি খুলে একের পর এক মানহানিকর ও আপত্তিকর পোস্ট করতে থাকেন।
শুধু তা-ই নয়, বৈবাহিক জীবনে ধারণ করা ভুক্তভোগীর কিছু ব্যক্তিগত ও আপত্তিকর ভিডিও হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে ভুক্তভোগীর আত্মীয়-স্বজনদের কাছে পাঠিয়ে তাকে সামাজিকভাবে পঙ্গু করার এবং তীব্র মানসিক হয়রানির অপচেষ্টা চালান।
একটি মেয়ের আত্মসম্মান ও সামাজিক মর্যাদাকে ধূলিসাৎ করতে ডিজিটাল মাধ্যমকে কতটা নিকৃষ্টভাবে ব্যবহার করা যায়, নাঈম উদ্দিনের এই আচরণ তারই এক জ্বলন্ত ও দুঃখজনক উদাহরণ।
দিনের পর দিন এমন অবর্ণনীয় মানসিক ও সামাজিক নির্যাতন সহ্য করার পর, অবশেষে ন্যায়বিচারের আশায় ভুক্তভোগী নারী আদালতের শরণাপন্ন হন।
তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালতের সুনির্দিষ্ট নির্দেশে গত ৬ জুলাই কর্ণফুলী থানায় পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলাটি এজাহার হিসেবে রেকর্ড করা হয়।
মামলা নথিভুক্ত হওয়ার পর নড়েচড়ে বসে পুলিশ প্রশাসন। শনিবার (১১ জুলাই) সন্ধ্যায় কর্ণফুলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ইখতিয়ার উদ্দিনের নেতৃত্বে একদল চৌকস পুলিশ সদস্য কর্ণফুলী থানাধীন দৌলতপুর ফাজিল খাঁর হাট এলাকায় এক ঝটিকা অভিযান চালায়। সেখান থেকেই গ্রেপ্তার করা হয় পলাতক আসামি নাঈম উদ্দিনকে।
এ বিষয়ে কর্ণফুলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ইখতিয়ার উদ্দিন বলেন, পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনের মামলায় অভিযুক্ত আসামি নাঈম উদ্দিনকে শনিবার সন্ধ্যায় সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
আজ রোববার (১২ জুলাই) তাকে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে প্রেরণ করা হয়েছে। ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে নারীদের সম্মানহানি বা কোনো ধরনের সাইবার অপরাধের বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান জিরো টলারেন্স।
বিচ্ছেদ কিংবা পারিবারিক বিরোধের জেরে নারীদের ব্যক্তিগত মুহূর্তের ছবি বা ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়ার এই নোংরা প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে।
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি এই ধরণের মানসিকতা রুখতে পারিবারিক ও সামাজিক শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই।
ভুক্তভোগী নারী এবং সচেতন সমাজ এখন এই কাপুরুষোচিত অপরাধের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অপেক্ষায় প্রহর গুনছে।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি

