রাত তখন গভীর। যখন পুরো চট্টগ্রাম নগরী ঘুমের চাদরে ঢাকা, ঠিক তখনই কর্ণফুলীর পাড়ে নতুনব্রিজ শহীদ বশীরুজ্জামান গোলচত্বর এলাকায় চলল এক নীরব যুদ্ধ।
রোববার (১২ জুলাই) ভোর ৪টা ২৫ মিনিট। ভোরের আলো তখনও ফোটেনি। ঠিক তখনই বাকলিয়া থানা পুলিশের একটি চৌকস দল অবস্থান নেয় নতুনব্রিজ এলাকায়।
গোপন সংবাদের ভিত্তিতে শুরু হয় বিশেষ তল্লাশি। পুলিশের কাঁধে ঝুলছিল হেডকোয়ার্টারের নির্দেশনায় চালু থাকা ‘বডি ক্যামেরা’।
সেই ডিজিটাল লেন্সে তখন বন্দি হচ্ছিল সমাজের এক নির্মম সত্য, যা পরে আদালত আর আইনের খাতায় নথিবদ্ধ হবে।
বাকলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জাহেদুল কবিরের সার্বিক তত্ত্বাবধানে এবং এসআই মোবারক হোসেনের নেতৃত্বে পুলিশ যখন ইম্পেরিয়াল পরিবহনের একটি দূরপাল্লার বাস থামায়, তখন বাসের চালক, সুপারভাইজার আর ঘুমচোখা যাত্রীরা হয়তো ভাবতেও পারেননি তারা কী ভয়ানক এক ট্র্যাজেডির সাক্ষী হতে যাচ্ছেন।
তল্লাশির এক পর্যায়ে পুলিশের নজরে আসেন বাগেরহাটের মোড়েলগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম (৩৪)।
সাধারণ এক বাটন মোবাইল হাতে দাঁড়িয়ে থাকা এই যুবকের চোখের কোণে তখন হয়তো ভাসছিল অভাবের তাড়না, কিংবা রাতারাতি আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়ার মরিচীকা। কিন্তু তার সাথে থাকা একটি সাধারণ ‘বালিশ’ উল্টে দিতেই বেরিয়ে এলো এক কোটিরও বেশি মূল্যের অন্ধকার।
তুলা আর কাপড়ের তৈরি যে বালিশ মানুষের ক্লান্তি দূর করে শান্তিময় ঘুমের ঠিকানা দেয়, সেই বালিশের ভেতরেই লুকিয়ে রাখা ছিল ৩৩ হাজার ৮০০ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট!
যে ইয়াবা হাজারো তরুণের ঘুম কেড়ে নেয়, ধ্বংস করে দেয় হাজারো মায়ের বুক, উপহার দেয় লাখো পরিবারের সীমাহীন দুর্ভোগ ও কান্না।
অভিনব এই কৌশলের আড়ালে আসলে লুকিয়ে ছিল হাজারো পরিবারের ধ্বংসের নীলনকশা।
বাসের চালক, সুপারভাইজার ও সাধারণ যাত্রীদের উপস্থিতিতে যখন সাইফুলকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়, তখন তার কণ্ঠ কেঁপে উঠেছিল।
নিজের হেফাজতে থাকা এই বিপুল পরিমাণ ‘সাদা বিষ’ এবং তা বহনের কথা তিনি স্বীকার করেন।
তার এই স্বীকারোক্তির প্রতিটি মুহূর্ত, প্রতিটি অভিব্যক্তি ধরা পড়ছিল পুলিশের বডি ক্যামেরায়-যাতে এই অভিযানের স্বচ্ছতা নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুলতে না পারে, যাতে অপরাধীর অপরাধ আড়াল না হয়।
এক কোটি টাকারও বেশি মূল্যের এই ইয়াবার চালান হয়তো সাইফুলের হাত ধরে পৌঁছে যেত কোনো না কোনো গলিতে। কোনো এক মা হয়তো তার সন্তানকে হারাতেন, কোনো বোন হয়তো তার ভাইকে মাদকাসক্ত হতে দেখতেন।
সাইফুল নামের এই মাদক কারবারি হয়তো সাময়িক কিছু টাকার মুখ দেখতেন, কিন্তু তার পেছনে রেখে যেতেন এক চিরস্থায়ী মানবিক বিপর্যয় আর সামাজিক দুর্ভোগ।
বাকলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জাহেদুল কবির জানান, এ ঘটনায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮-এর সংশ্লিষ্ট ধারায় একটি নিয়মিত মামলা রুজু করা হয়েছে এবং আসামিকে যথাযথ প্রক্রিয়ায় আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে।
আইনের চোখে সাইফুল একজন অপরাধী, তার সাজা হবে। কিন্তু এই ঘটনার পেছনে যে গভীর সামাজিক ক্ষত আর অন্ধকার জগতের দুর্ভোগের চিত্র ফুটে উঠেছে, তা সমাজকে নতুন করে ভাবিয়ে তোলে।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি

