মানস চৌধুরী: দেশের অর্থনীতির প্রধান প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর এই গুরুত্বপূর্ণ সংস্থায় এক অভূতপূর্ব এবং চোখ কপালে তোলার মতো পরিসংখ্যান সামনে এসেছে।
বন্দর কর্তৃপক্ষের নিজস্ব এক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বিগত সাড়ে তিন বছরের খতিয়ানকে মাত্র দুই বছরেই ছাড়িয়ে গেছে নিয়োগ ও পদোন্নতির গতি।
আর এই পরিসংখ্যান দেশের সচেতন মহল এবং বিশেষজ্ঞদের মনে একই সাথে কৌতূহল এবং তীক্ষ্ণ প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
উলট-পালট করা সেই গাণিতিক খতিয়ান
বন্দর কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য বলছে, ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের জুলাই পর্যন্ত দীর্ঘ সাড়ে তিন বছরে বন্দরে সরাসরি নিয়োগ পেয়েছিলেন মাত্র ১৪৪ জন এবং পদোন্নতি পেয়েছিলেন ৭৯৯ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী।
অথচ, ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত মাত্র এই দুই বছরেই সরাসরি নিয়োগ দেওয়া হয়েছে ২০৮ জনকে এবং পদোন্নতি পেয়েছেন ১ হাজার ৪৬৪ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী!
একটু গভীরভাবে হিসাব করলে যে তথ্যটি যে কাউকেই চমকে দেবে তা হলো: ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত। গত সাড়ে পাঁচ বছরে বন্দরে মোট যত সরাসরি নিয়োগ হয়েছে, তার প্রায় ৫৯ শতাংশই সম্পন্ন হয়েছে জুলাই আন্দোলন-পরবর্তী এই মাত্র দুই বছরে।
আরও অবিশ্বাস্য শোনায় পদোন্নতির হিসাবটি-সাড়ে পাঁচ বছরের মোট পদোন্নতির প্রায় ৬৫ শতাংশই দেওয়া হয়েছে এই দুই বছরের সংক্ষিপ্ত সময়ে।
সাড়ে পাঁচ বছরের তুলনামূলক চিত্র
(জানুয়ারি ২০২১ - জুলাই ২০২৬)|সময়কাল | সরাসরি নিয়োগ | পদোন্নতি | | সাড়ে ৩ বছর (জানুয়ারি '২১ - জুলাই '২৪) | ১৪৪ জন | ৭৯৯ জন | | মাত্র ২ বছর (আগস্ট '২৪ - জুলাই '২৬) (জুলাই আন্দোলন-পরবর্তী)
২০৮ জন (৫৯%)| ১,৪৬৪ জন (৬৫%) |
কর্তৃপক্ষের যুক্তি: দক্ষতা ও সুশাসনের নতুন অধ্যায়
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের দাবি, এই বিপুল সংখ্যার পেছনে কোনো অনিয়ম নেই, বরং এটি স্থবিরতা কাটানোর একটি প্রয়াস। তাদের মতে, দক্ষ ও যোগ্য জনবলই একটি আধুনিক বন্দরের প্রধান শক্তি।
দীর্ঘদিনের জট খুলে স্বচ্ছ ও মেধাভিত্তিক নিয়োগ এবং যোগ্যতার ভিত্তিতে পদোন্নতির মাধ্যমেই কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মোদ্যম ফিরিয়ে আনা হয়েছে।
সংস্থাটি জানায়, রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর বন্দরের কার্যক্রমে গতিশীলতা আনা, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মনোবল বৃদ্ধি, দক্ষতা উন্নয়ন এবং কল্যাণ নিশ্চিত করতেই এই বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ভবিষ্যতেও সুশাসন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও মেধাভিত্তিক মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার ধারা অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তারা।
নেপথ্যের প্রশ্ন: সংস্কার নাকি অন্য কিছু?
কর্তৃপক্ষের এই ‘গতিশীলতা’র যুক্তি আপাতদৃষ্টিতে ইতিবাচক মনে হলেও, স্বাধীন বিশ্লেষকদের মনে কিছু গুরুতর প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে।
সাড়ে তিন বছরের স্বাভাবিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় যা সম্ভব হয়নি, তা মাত্র দুই বছরে, তাও আবার রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের ঠিক পরপরই কীভাবে এত বিপুল সংখ্যায় সম্পন্ন হলো?
১. এত বিপুল সংখ্যক পদোন্নতির জন্য কি পূর্বতন পদগুলো শূন্য ছিল, নাকি রাতারাতি নতুন পদ সৃষ্টি করে এই ১,৪৬৪ জনকে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে?
২. যদি পূর্বের সাড়ে তিন বছরে যোগ্য প্রার্থীরা বঞ্চিত হয়ে থাকেন, তবে সেই বঞ্চনার সঠিক অডিট বা তদন্ত কি সম্পন্ন হয়েছিল?
৩. এই বিশাল নিয়োগ ও পদোন্নতির প্রক্রিয়ায় কি কোনো তাড়াহুড়ো বা বিশেষ কোটার অদৃশ্য প্রভাব ছিল, যা সুশাসনের সংজ্ঞাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলে?
একটি সংস্থায় দীর্ঘদিনের জট ভাঙা প্রশংসনীয়, তবে তা যদি অতি-উৎসাহ বা কোনো বিশেষ পট পরিবর্তনের ঢেউয়ে তড়িঘড়ি করে করা হয়, তবে তা প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে।
চট্টগ্রাম বন্দরের মতো একটি সংবেদনশীল জাতীয় কেপিআই (KPI) প্রতিষ্ঠানে মেধার মূল্যায়ন যেমন জরুরি, তেমনি প্রতিটি নিয়োগ ও পদোন্নতি শতভাগ বিতর্কের ঊর্ধ্বে থাকাও সমভাবে বাধ্যতামূলক।
এই নজিরবিহীন পরিসংখ্যানের পেছনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এবং জনমনে তৈরি হওয়া যৌক্তিক খটকা দূর করতে একটি উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত বা পর্যালোচনা এখন সময়ের দাবি।
অন্যথায়, ‘সুশাসন ও জবাবদিহিতা’র স্লোগানটি কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ থেকে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি

