দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দরের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগকে ঘিরে একের পর এক প্রশ্ন উঠছে।
প্রথম শ্রেণীর ইনল্যান্ড মাস্টার পদে চলমান নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সনদের বৈধতা, তথ্য গোপনের অভিযোগ, যাচাই প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাতের বিষয় সামনে আসায় পুরো নিয়োগ কার্যক্রম নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, নিয়োগপ্রত্যাশী দুই প্রার্থী-মো. তৌহিদুল ইসলাম ও ইমাম হোসেন, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের হারবার মাস্টার জহিরুল ইসলামের নিকটাত্মীয়।
একই সঙ্গে নিয়োগের জন্য জমা দেওয়া সনদ ও যোগ্যতা যাচাইয়ের দায়িত্বও ছিল বন্দরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ওপর।
ফলে প্রশ্ন উঠেছে, যে প্রক্রিয়ায় আত্মীয় প্রার্থী রয়েছেন, সেই প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা কতটুকু নিশ্চিত করা হয়েছে?
নিয়োগসংক্রান্ত নথিপত্র, অভিযোগপত্র এবং সংশ্লিষ্ট সূত্রে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রথম শ্রেণীর ইনল্যান্ড মাস্টার পদে নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর চলতি বছরের ৮ এপ্রিল লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল।
কিন্তু পরীক্ষার মাত্র দুই দিন আগে, ৬ এপ্রিল, তা স্থগিত করা হয়। এরপর নিয়োগ কার্যক্রম নতুনভাবে এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
কেন পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছিল এবং পরবর্তী প্রক্রিয়ায় কী পরিবর্তন আনা হয়েছে-সে বিষয়ে এখনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
তথ্য চাইতে গিয়ে তথ্যহীনতা:
অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের লস্কর পদে কর্মরত মো. তৌহিদুল ইসলামের ৩য় শ্রেণীর ইনল্যান্ড মাস্টার যোগ্যতা সনদের তথ্য জানতে তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯-এর আওতায় নৌপরিবহন অধিদপ্তরে আবেদন করা হয়।
তাদের দাবি, সনদ ইস্যু ও যোগ্যতা অর্জনের প্রক্রিয়া সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টাকালে বিভিন্ন অসঙ্গতির বিষয় তাদের নজরে আসে। এ কারণে তারা নৌপরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছেও লিখিত আবেদন করেন।
তবে অভিযোগকারীদের ভাষ্যমতে, তথ্য অধিকার আইনের আওতায় একাধিক আবেদন ও আপিল করেও তারা প্রত্যাশিত তথ্য পাননি।
তাদের প্রশ্ন, একটি সরকারি সনদের তথ্য যদি নিয়মিত প্রক্রিয়ায় পাওয়া না যায়, তাহলে সেই সনদ নিয়ে ওঠা সন্দেহ দূর হবে কীভাবে?
তৌহিদুল ইসলামকে ঘিরে কী প্রশ্ন?
অভিযোগকারীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মো. তৌহিদুল ইসলাম বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষে লস্কর পদে কর্মরত। তার ৩য় শ্রেণীর ইনল্যান্ড মাস্টার সনদের বৈধতা এবং সনদ অর্জনের প্রক্রিয়া নিয়ে তারা প্রশ্ন তুলেছেন।
এ ছাড়া অভিযোগ রয়েছে, বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রশাসন বিভাগ থেকে তাকে ইনল্যান্ড মাস্টার পদে নিয়োগসংক্রান্ত একটি চিঠি দেওয়া হয়েছিল। তবে এ বিষয়ে বন্দর কর্তৃপক্ষের কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
যদিও অভিযোগ অস্বীকার করে মো. তৌহিদুল ইসলাম বলেন, “আমি সকল নিয়মকানুন মেনে আবেদন করেছি। আমার সব সনদপত্র সঠিক আছে। বন্দর কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই করেই আমার আবেদন গ্রহণ করেছে।”
ইমাম হোসেনের সনদ নিয়েও বিতর্ক:
বর্তমানে ২য় শ্রেণীর ইনল্যান্ড মাস্টার পদে কর্মরত ইমাম হোসেনের ১ম শ্রেণীর ইনল্যান্ড মাস্টার যোগ্যতা সনদ এবং সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা।
তাদের দাবি, মালয়েশিয়া থেকে প্রাপ্ত সার্টিফিকেট অব রেকগনিশন (COR) এবং সংশ্লিষ্ট যোগ্যতার নথিপত্র স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। এ বিষয়ে তারা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন বলেও দাবি করেন।
তবে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ইমাম হোসেন কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
তিনি বলেন, “আমি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাই না। আপনাকে কোনো তথ্যও দিতে পারব না।”
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন: যাচাইকারীর আত্মীয়ই কি প্রার্থী?
পুরো ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটি মৌলিক প্রশ্ন-যে নিয়োগে একজন প্রভাবশালী কর্মকর্তার নিকটাত্মীয় প্রার্থী, সেই নিয়োগে যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া কতটা নিরপেক্ষ ছিল?
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, ১ম শ্রেণীর ইনল্যান্ড মাস্টার নিয়োগে প্রার্থীদের সনদ, যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা যাচাইয়ের দায়িত্ব বন্দরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ওপর ন্যস্ত ছিল।
কিন্তু একই প্রতিষ্ঠানের একজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তার আত্মীয়রা যখন প্রতিযোগিতায় অংশ নেন, তখন স্বার্থের সংঘাত এড়াতে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি না, সেটি স্পষ্ট নয়।
তাদের দাবি, এ পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের যাচাই প্রক্রিয়া থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু বাস্তবে তা হয়েছে কি না, তার কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
ফলে প্রশ্ন উঠছে—যাচাই প্রক্রিয়াটি কি সত্যিই স্বাধীন ছিল, নাকি পুরো প্রক্রিয়াকে ঘিরে অদৃশ্য কোনো প্রভাব কাজ করেছে?
নৌনিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে ঝুঁকি:
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইনল্যান্ড মাস্টার পদটি নৌযান পরিচালনা, নৌনিরাপত্তা এবং বন্দর ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত একটি দায়িত্বশীল পদ।
এ ধরনের পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে সনদের সত্যতা, অভিজ্ঞতার যথার্থতা এবং প্রার্থীর যোগ্যতা নিয়ে সামান্যতম প্রশ্নও গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন।
কারণ কোনো অনিয়ম বা অযোগ্যতা শেষ পর্যন্ত জনস্বার্থ ও নৌনিরাপত্তার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
সংশ্লিষ্টদের নীরবতা আরও বাড়াচ্ছে প্রশ্ন:
অভিযোগের বিষয়ে জানতে নৌপরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের একান্ত সচিব এস. এম. আশিকুল আলমের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের পরিচালক (প্রশাসন)-এর সঙ্গেও যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সংযোগ পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে তার বক্তব্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনে তা সংযুক্ত করা হবে।
তথ্য অধিকার আইনের আবেদন ও অভিযোগের বিষয়ে জানতে চট্টগ্রাম বন্দরের চিফ পারসোনেল অফিসার নাসির উদ্দিনের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
একইভাবে অভিযোগের বিষয়ে হারবার মাস্টার জহিরুল ইসলামের বক্তব্য জানতে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
তদন্ত ছাড়া মিলবে না উত্তর :
বর্তমানে যে প্রশ্নগুলো ঘুরপাক খাচ্ছে সেগুলোর উত্তর এখনো অমীমাংসিত—সনদগুলো বৈধ কি না, তথ্য অধিকার আইনের আবেদনে তথ্য দিতে অনীহার কারণ কী, নিয়োগ যাচাই প্রক্রিয়ায় স্বার্থের সংঘাত ছিল কি না, আর পুরো প্রক্রিয়ায় কার স্বার্থ রক্ষা করা হয়েছে?
অভিযোগকারীরা বলছেন, এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করার দায়িত্ব এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।
তাদের মতে, অভিযোগগুলো সত্য বা মিথ্যা—যাই হোক না কেন, একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্তই পারে বিতর্কের অবসান ঘটাতে।
কারণ দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বন্দরগুলোর একটিতে নৌনিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট পদে নিয়োগ নিয়ে যখন প্রশ্ন ওঠে, তখন সেটি আর শুধু একটি চাকরির বিষয় থাকে না; সেটি হয়ে ওঠে জনস্বার্থ, জবাবদিহি ও রাষ্ট্রীয় স্বচ্ছতার প্রশ্ন।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি

