নদী মোহনার রিটেইনিং ওয়ালের ঠিক ওপর আছড়ে পড়েছে ৯ দশমিক ৫০ মিটার ড্রাফটের বিশাল এক কনটেইনার জাহাজ-‘এমভি সিএনসি ইউরেনাস’।
স্টিয়ারিং বিকল, নেই কোনো নিয়ন্ত্রণ! এমন এক ভয়াবহ মুহূর্তে যখন দেশের ৯২ শতাংশ বাণিজ্য পরিচালনাকারী চট্টগ্রাম বন্দরের সচলতা স্থবির হয়ে পড়ার মুখে, ঠিক তখনই রচিত হলো পেশাদারিত্ব, সাহস এবং সমন্বিত শক্তির এক অবিশ্বাস্য উদ্ধার রূপকথা।
ঘটনার শুরু সোমবার বেলা ২টা ১৫ মিনিটে। ২০১৭ সালে নির্মিত, ১৭০ মিটার দীর্ঘ মাল্টার পতাকাবাহী এই জাহাজটি চীনের শিকৌ বন্দর থেকে ১ হাজার ২৮২ টিইইউএস (২০ ফুট লম্বা) পণ্য এবং মাস্টারসহ ২৪ জন নাবিক নিয়ে ঢুকছিল কর্ণফুলী নদীর চ্যানেলে।
হঠাৎ যান্ত্রিক ত্রুটিতে স্টিয়ারিং বিকল হয়ে পড়ে যানটি। মুহূর্তেই ২ নম্বর লাল বয়ার সাথে সজোরে ধাক্কা খেয়ে জাহাজটি নদী মোহনার সংলগ্ন রিটেইনিং ওয়ালের ওপর আটকে (গ্রাউন্ডেড) যায়।
আন্তর্জাতিক জলসীমায় যা অত্যন্ত মারাত্মক দুর্ঘটনা হিসেবে গণ্য হয়।
সংকট ঘনীভূত হতেই চট্টগ্রামে কালক্ষেপণ না করে দ্রুত জরুরি বার্তা পাঠানো হয়।
মুহূর্তের মধ্যেই চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ নৌবাহিনী এবং বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড হাত মিলিয়ে শুরু করে দেশের অন্যতম বৃহৎ ও সুসংগঠিত ‘অপারেশন সিএনসি ইউরেনাস’।
দুর্ঘটনাস্থলে একযোগে গর্জে ওঠে ৭টি শক্তিশালী টাগবোট। চট্টগ্রাম বন্দরের বীর টাগ ‘কাণ্ডারী-২’, ‘কাণ্ডারী-৪’, ‘কাণ্ডারী-৬’ ও ‘কাণ্ডারী-১১’-এর সাথে যুক্ত হয় বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ‘শিবসা’, কোস্ট গার্ডের ‘প্রমত্ত’ এবং টানেলের একটি টাগবোট।
বন্দরের অভিজ্ঞ সিনিয়র পাইলটদের সূক্ষ্ম নির্দেশনায় এবং নৌ ও কোস্ট গার্ড সদস্যদের কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টনীতে শুরু হয় রাতের রুদ্ধশ্বাস উদ্ধারযুদ্ধ।
পানির নিচে তীব্র ঝুঁকি আর উত্তাল স্রোতকে উপেক্ষা করে উদ্ধারকারী দল রাতভর অবিরাম কৌশল চালিয়ে যায়। জাহাজ হালকা করার জন্য জরুরি ভিত্তিতে ড্রাফট কমানোর লক্ষ্যে কনটেইনার খালাসের বিকল্প পরিকল্পনাও সাজানো হয়েছিল।
কিন্তু বীর ক্রু ও পাইলটদের যৌথ সমন্বয়ের চূড়ান্ত সাফল্য আসে রাতের শেষ প্রহরে-অলৌকিক দক্ষতায় বিশাল জাহাজটিকে চড়া থেকে মুক্ত করে নিরাপদে বহির্নোঙরের ‘বি’ (ব্রাভো) অ্যাঙ্করেজে নিয়ে আসা হয়।
মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) বিষয়টি নিশ্চিত করে বন্দর সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম জানান, সুপরিকল্পিত ও রাতভর পরিচালনা করা এই অভিযানে জাহাজের ২৪ জন নাবিকের একজনও আহত হননি এবং মূল চ্যানেলটি পুরো সময়জুড়ে অলৌকিকভাবে নৌ চলাচলের জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ ছিল।
জাহাজটির স্থানীয় এজেন্ট এপিএল (বাংলাদেশ)-এর সহায়তায় পরিস্থিতি এখন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে। এই শ্বাসরুদ্ধকর বিজয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ অভিযানে অংশ নেওয়া সকল পাইলট, টাগ ক্রু, নৌ বিভাগ, নৌবাহিনী এবং কোস্ট গার্ডকে আন্তরিক অভিনন্দন জানিয়েছে।
আন্তর্জাতিকমানের অসাধারণ সিম্যানশিপ, ইস্পাতদৃঢ় নেতৃত্ব আর নির্ভুল সমন্বয়ের এই অভিযান কেবল ২৪ জন নাবিক ও কোটি টাকার বাণিজ্যকে রক্ষা করেনি, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে চট্টগ্রাম বন্দরের মর্যাদা ও জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার সক্ষমতাকে তুলে ধরেছে নতুন এক অনন্য উচ্চতায়।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি

