ফ্রান্সকে আটকাবে কে? বিশ্বকাপের শুরু থেকেই ফুটবল বিশ্বে বাতাসে ভাসছিল এই একটিই প্রশ্ন। একের পর এক প্রতিপক্ষকে দাপটের সঙ্গে উড়িয়ে দিয়ে কিলিয়ান এমবাপ্পে আর উসমান দেম্বেলেরা নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন আসরের এক নম্বর ফেবারিট হিসেবে।
মনে হচ্ছিল, বিশ্বমঞ্চের সোনালি ট্রফিটা বুঝি ফরাসিদের জন্যই তোলা আছে। কিন্তু ডালাসের প্রথম সেমিফাইনালে এসে বদলে গেল সব সমীকরণ।
দাপুটে ফুটবল খেলা ফ্রান্সকে ২-০ গোলে হারিয়ে দীর্ঘ ১৬ বছর পর বিশ্বকাপের ফাইনালে পা রাখল স্পেন। ফরাসিদের রীতিমতো নিষ্প্রভ করে শিরোপা পুনরুদ্ধারের স্বপ্নে এখন আর মাত্র এক ধাপ দূরে ‘লা রোহা’রা।
এমন মহাকাব্যিক জয়ের পর মাঠের খেলা ছাপিয়ে ফুটবল রোমান্টিকদের আলোচনায় স্পেনের বিস্ময়বালক লামিনে ইয়ামাল।
ম্যাচ শেষ হতেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দুই হাত তোলা একটি ছবি পোস্ট করেন এই স্প্যানিশ তরুণ।
ক্যাপশনে কোনো দীর্ঘ বাক্য নেই, লেখা কেবল একটি শব্দ-‘আলহামদুলিল্লাহ’। মুহূর্তের মধ্যেই ইয়ামালের সেই পোস্ট লুফে নেয় নেটদুনিয়া, যা এখন নেটপাড়ায় রীতিমতো ভাইরাল।
সোনালি প্রজন্মের ছায়া ও নতুন সূর্য ২০১০ সালে জাভি হার্নান্দেজ, আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা, সার্জিও রামোস, জেরার্ড পিকে আর ইকার ক্যাসিয়াসদের সেই সোনালি প্রজন্ম স্পেনকে এনে দিয়েছিল তাদের প্রথম ও একমাত্র বিশ্বকাপ। এরপর কেটে গেছে দীর্ঘ দেড় দশক। টানা তিন আসরে সেমিফাইনালের মুখও দেখেনি তারা।
অবশেষে ১৬ বছরের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে আবার বিশ্বকাপের ফাইনালে লা রোহা। ফুটবলপ্রেমীদের মনে এখন একটাই প্রশ্ন-এবার কি তবে এই নতুন প্রজন্মের হাত ধরেই দ্বিতীয়বার বিশ্বজয়ের উৎসবে মাতবে স্পেন?
ম্যাচের শুরু থেকেই কিলিয়ান এমবাপ্পেদের বিরুদ্ধে অত্যন্ত পরিকল্পিত ও আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে থাকে দে লা ফুয়েন্তের শিষ্যরা। ম্যাচের ২২ মিনিটেই কাঙ্ক্ষিত সুযোগটি আসে স্পেনের সামনে।
ফরাসি পেনাল্টি বক্সে ফাউলের শিকার হন ইয়ামাল। বল ক্লিয়ার করতে গিয়ে তাঁর পায়ে জোরে আঘাত করে বসেন ফরাসি ডিফেন্ডার লুকাস দিনিয়ে। রেফারি কোনো দ্বিধা না রেখে পেনাল্টির বাঁশি বাজান।
স্পট কিক থেকে ঠাণ্ডা মাথায় গোল করতে কোনো ভুল করেননি মিকেল ওইয়ারসাবাল। ফ্রান্সের গোলরক্ষক মাইক মাইনিয়ঁ সঠিক দিকে ঝাঁপ দিলেও ওইয়ারসাবালের জোরালো শটের গতিপথ রুখতে পারেননি। ১-০ গোলে এগিয়ে গিয়ে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেয় স্পেন।
পিছিয়ে পড়ে ম্যাচে ফিরতে মরিয়া হয়ে ওঠে দিদিয়ের দেশমের দল। প্রথমার্ধে ফরাসিরা স্পেনের রক্ষণভাগে কয়েকবার ভীতি ছড়ালেও সমতাসূচক গোলের দেখা পায়নি। উল্টো বিরতির পর ফরাসি শিবিরে আসে দ্বিতীয় ধাক্কা।
৫৮ মিনিটে স্পেনের ব্যবধান দ্বিগুণ করেন পেদ্রো পোরো। দানি ওলমোর সঙ্গে চমৎকার ও গতিময় ‘ওয়ান-টু পাস’ খেলে ফরাসি বক্সে ঢুকে পড়েন তিনি।
এরপর নিপুণ এক শটে মাইনিয়ঁকে পরাস্ত করে স্কোরলাইন ২-০ করেন পোরো।
এর ঠিক ছয় মিনিট পর ফ্রান্সের জালে আরও একবার বল জড়িয়েছিলেন ইয়ামাল। তবে অফসাইডের কারণে রেফারি সেই গোলটি বাতিল করলে ব্যবধান আর বাড়েনি।
ছন্দহীন ফ্রান্স, অপ্রতিরোধ্য স্পেন দুই গোল হজম করার পর ম্যাচে ফিরতে মরিয়া চেষ্টা চালায় ফ্রান্স। কিন্তু সময় যত গড়িয়েছে, ফরাসিদের ফুটবল ততটাই এলোমেলো হয়ে পড়েছে।
আক্রমণভাগের দুর্বল ফিনিশিং, অগোছালো মধ্যমাঠ আর নড়বড়ে রক্ষণভাগ-সব মিলিয়ে সেমিফাইনালের মঞ্চে চেনা ফ্রান্সকে খুঁজেই পাওয়া যায়নি।
শেষ মুহূর্তে মেজাজ হারিয়ে ছন্দহীন ফুটবল খেলে নিজেদের শেষ সম্ভাবনাটুকুও নষ্ট করে দেশমের দল।
অন্যদিকে, নিখুঁত পাসিং আর ঠান্ডা মাথায় ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে জয় নিশ্চিত করে মাঠ ছাড়ে স্পেন।
দুই দশক পর মধুর প্রতিশোধ ও পরিসংখ্যানের দাপট বিশ্বকাপের মঞ্চে এটি ছিল দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর মাত্র দ্বিতীয় সাক্ষাৎ। এর আগে ২০০৬ সালের জার্মানি বিশ্বকাপে শেষ ষোলোর লড়াইয়ে মুখোমুখি হয়েছিল দুই দল।
সেবার পিছিয়ে পড়েও জিনেদিন জিদানের ফ্রান্স ৩-১ গোলে হারিয়েছিল স্পেনকে। দুই দশক পর বিশ্বমঞ্চের সেই হারের মধুর প্রতিশোধ যেন এবার ডালাসের মাঠেই নিল স্পেন।
ইতিহাসও অবশ্য স্পেনের পক্ষেই কথা বলছিল। বড় টুর্নামেন্টের সেমিফাইনালে স্পেনের হারের নজির নেই বললেই চলে।
আগের সাতটি সেমিফাইনালের মধ্যে তারা বিদায় নিয়েছিল কেবল একবার-২০২০ ইউরোতে। বাকি ছয়বারই ফাইনালে উঠেছিল লা রোহা। এবারও সেই সোনালি ঐতিহ্যের ব্যতিক্রম হয়নি।
১৬ বছরের অপেক্ষা শেষ। বিশ্বজয়ের চূড়ান্ত লড়াইয়ে স্পেনের প্রতিপক্ষ কে হচ্ছে, তা জানতে ফুটবল বিশ্বকে অপেক্ষা করতে হবে আর ২৪ ঘণ্টারও কম সময়।
তবে সেমিফাইনালে ফ্রান্সকে যেভাবে তারা রুখে দিয়েছে, তাতে ফাইনালের প্রতিপক্ষের জন্য বড় এক হুঙ্কারই দিয়ে রাখল লুই দে লা ফুয়েন্তের শিষ্যরা-স্পেন প্রস্তুত, আরও একবার ফুটবল বিশ্বকে শাসন করার জন্য।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি

